
রাজধানীর রামপুরায় আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান পলাশ ওরফে ‘কাইল্লা পলাশ’ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে উঠে এসেছে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডের এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার ও খুনের পরিকল্পনার চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। আসামিরা জানিয়েছে, দুবাইয়ে বসে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদ মন্টির উপস্থিতিতে হওয়া এক ‘গোপন বৈঠকে’ পলাশকে হত্যার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পলাশকে ‘পথের কাঁটা’ মনে করেই তাকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। আন্ডারওয়ার্ল্ডের পরিভাষায় যা ছিল মূলত একটি ‘ডেথ মিটিং’।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত ১২ জুন জুমার নামাজ শেষে বাসায় ফেরার পথে রামপুরায় পলাশকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২০ জুন গভীর রাতে হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় জড়িত মোটরসাইকেলচালক মো. ইমাম হোসেনকে হাতিরঝিল থানা পুলিশ এবং নজরদারির দায়িত্বে থাকা মো. মারুফ সুলতান ওরফে ফেরদৌসকে র্যাব-৩ গ্রেপ্তার করে। বর্তমানে মামলাটি ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে।
ডিবির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার এইচ. এম আজিমুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, পলাশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদে পলাশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে। এ ঘটনার বিষয়ে তারা গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও দিয়েছে। সেসব তথ্য নিয়ে কাজ করছে ডিবি।
ডিবির এই কর্মকর্তা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তারা স্বেচ্ছায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখানেও তারা গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে তথ্য দিয়েছেন। হত্যার কারণ কি ছিল এবং কেন এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাও আদালতের জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছেন। তবে মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও মূল রহস্য উদঘাটনের এই মুহূর্তে সব তথ্য প্রকাশের সুযোগ নেই।
ডিএমপির এক সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) নাম না প্রকাশ করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, পলাশকে গুলির ঘটনায় গ্রেপ্তার দুই আসামিকে কড়া নিরাপত্তা ও গোপনীয়ভাবে আদালতে নেওয়া হয়। পরে তারা ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দি দেয়। আদালতে হত্যার দায় স্বীকারের পাশাপাশি পুরো অপারেশনের নেপথ্যের ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরেছেন এই দুজন।
তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ঢাকার রামপুরা, বাড্ডা ও হাতিরঝিল এলাকায় আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, টেন্ডার, ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসাসহ দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের দ্বন্দ্বই শেষ পর্যন্ত পলাশ হত্যার পেছনের বড় কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
দুবাইয়ে ছক, ঢাকায় বাস্তবায়ন
আসামিদের জবানবন্দির বরাত দিয়ে গোয়েন্দারা জানায়, দীর্ঘ কারাবাসের পর পলাশ জামিনে মুক্ত হয়ে আবারও রামপুরা, বাড্ডা ও হাতিরঝিল এলাকায় নিজের প্রভাব ফিরে পেতে তৎপর হন। এলাকার চাঁদাবাজি, টেন্ডার, ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় অপরাধচক্রের মধ্যে নতুন করে অস্থিরতা শুরু হয়। বিশেষ করে দুবাইয়ে অবস্থানরত শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানের অনুসারীরা পলাশকে তাদের আধিপত্যের জন্য বড় হুমকি মনে করত।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, দুবাইয়ে জিসানের সঙ্গে ঢাকার তিনজন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও একটি রাজনৈতিক দলের নেতা কয়েক দফা বৈঠক করেন। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়— কে শুটার হবে, কে রেকি করবে এবং ঘটনার পর কীভাবে হামলাকারীরা নিরাপদে পালিয়ে যাবে।
মসজিদ থেকে বের হতেই মাথায় গুলি
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে মোটরসাইকেলচালক ইমাম হোসেন জানায়, পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ১২ জুন জুমার নামাজের পর তারা রামপুরার বিটিভি ভবনের উল্টো পাশে অবস্থান নেয়। পলাশ মসজিদ থেকে বের হওয়া মাত্রই ওত পেতে থাকা মূল শুটার তাকে লক্ষ্য করে মাথায় দুই রাউন্ড গুলি চালায়। এরপরই শুটারকে নিজের মোটরসাইকেলে তুলে দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায় ইমাম। পুলিশ ইতোমধ্যে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত সেই মোটরসাইকেলটি জব্দ করেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ইমামের এই বক্তব্যের সঙ্গে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজের মিল পাওয়া গেছে। হামলার পর যে মোটরসাইকেলে শুটারকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, সেটি ইতোমধ্যে জব্দ করেছে পুলিশ। তদন্তকারীদের ধারণা, পুরো হত্যাকাণ্ডটি ছিল অত্যন্ত হিসাব কষে করা একটি টার্গেট অপারেশন, যেখানে শুটার, ব্যাকআপ টিম, নজরদারি দল ও পালানোর রুট— সবকিছু আগেই ঠিক করা ছিল।
আন্ডারওয়ার্ল্ডের ভেতরের দ্বন্দ্ব
র্যাব-৩ এর হাতে গ্রেপ্তার অপর আসামি মো. মারুফ সুলতান ওরফে ফেরদৌস আদালতকে জানিয়েছেন, পলাশ হত্যার পেছনে মূল দ্বন্দ্ব ছিল এলাকার নিয়ন্ত্রণ ও অর্থনৈতিক আধিপত্য। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রামপুরা, বাড্ডা ও হাতিরঝিলের অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি ইন্টারনেট ও ডিশ ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া নিয়েও বিরোধ চরমে ওঠে। কারামুক্তির পর পলাশ পুরোনো নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের চেষ্টা করলে জিসানের অনুসারীদের সঙ্গে তার বিরোধ সরাসরি সংঘাতে রূপ নেয়।
ফেরদৌস জবানবন্দিতে দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সেখানে উপস্থিত থেকে নজরদারি, অবস্থান নিশ্চিতকরণ ও ব্যাকআপ টিমের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে পালন করেন। আর জিসানের নির্দেশেই পলাশকে ‘চিরতরে সরিয়ে’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়।
তদন্তকারীদের মতে, ফেরদৌসের জবানবন্দিতে পলাশ হত্যাকাণ্ড কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিশোধ নয়, বরং আন্ডারওয়ার্ল্ডের ক্ষমতার ভারসাম্য পাল্টে দেওয়ার জন্য হত্যার উদ্দেশ্যে একটি সুপরিকল্পিত হামলা চালানো হয়।
ডিবির হাতে নজরদারি থেকে শুটার পর্যন্ত পুরো ছক
মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন জানিয়েছেন, জিজ্ঞাসাবাদে দুই আসামি ঘটনার ৯০ ভাগ তথ্য দিয়েছেন। ডিবির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এ ঘটনায় শুটারদের ভূমিকা, পরিকল্পনাকারী, তথ্যদাতা, নজরদারি দল ও হামলার পর পালানোর রুট ঠিক করে দেওয়া ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছে। কে পলাশের গতিবিধি নজরদারিতে রেখেছিল, কে তার অবস্থান নিশ্চিত করেছিল, কে শুটারদের মোতায়েন করেছিল ও কারা নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার দায়িত্বে ছিল, আসামিদের কাছ থেকে পাওয়া এসব তথ্য নিয়ে কাজ করছে গোয়েন্দারা।
তদন্তসংশ্লিষ্ট আরেকটি সূত্র জানায়, জবানবন্দিতে উঠে আসা তথ্য যাচাই করতে সিসিটিভি ফুটেজ, মোবাইল কল রেকর্ড, লোকেশন ডাটা ও মাঠপর্যায়ের গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। হত্যার পরিবল্পনাকারীদের প্রধান জিসানের স্থানীয় সহযোগী, পলাতক শুটার এবং লজিস্টিক সাপোর্টদাতাদের চিহ্নিত করতে একাধিক টিম কাজ করছে। এমনকি, শুধু গুলি চালানো ব্যক্তি নয়, যারা পেছন থেকে পুরো অপারেশন সাজিয়েছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে ডিবি।
আট দিন পর পলাশের মৃত্যু
গত ১২ জুন রামপুরায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন পলাশ। টানা আট দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২০ জুন গভীর রাতে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় পলাশের স্ত্রী মাহমুদা খানম বাদী হয়ে ১১ জনের নাম উল্লেখ করে হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন।
হাতিরঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আসাদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, পলাশ হত্যার ঘটনায় দুই আসামির মধ্যে মোটরসাইকেলচালককে আমরা গ্রেপ্তার করছিলাম। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সংগ্রহ করা হত্যাকাণ্ডের তথ্যসহ মামলার সকল তথ্য ও প্রমাণ ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ডিবি এখন তদন্ত করছে।




