logo

দাব্বাতুল আরদ, দাজ্জাল, ডেমন ফেস নাকি প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে বিভ্রান্তি

দাব্বাতুল আরদ, দাজ্জাল, ডেমন ফেস নাকি প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে বিভ্রান্তি

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এবং টিকটকে সম্প্রতি দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির দক্ষিণাঞ্চলের কিছু স্যাটেলাইট ছবি ছড়িয়ে পড়ছে। যেখানে ছবিগুলোকে ‘ভয়ংকর মুখ’, ‘ডেমন ফেস’,‘দাজ্জাল’ এমনকি ‘দাব্বাতুল আরদ’ (কুরআনের সুরা আন-নামল ৮২ নম্বর আয়াতে উল্লেখিত কিয়ামতের নিদর্শন) হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। 

এ সম্পর্কিত পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। 

তবে এশিয়া পোস্টের যাচাইয়ে দাবিগুলোর সত্যতা পাওয়া যায়নি। বরং পৃথিবীর প্রান্তিক অঞ্চলে হওয়ায় স্যাটেলাইট ছবি ধারণে প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে এমন বিভ্রম ঘটে।

প্রচারিত ছবিগুলোতে চিলির দক্ষিণাঞ্চলের বরফাচ্ছাদিত কিছু অংশ দেখানো হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে শহিদুল ইসলাম মাহফুজ নামে একটি প্রোফাইল থেকে দাবিটি সম্প্রতি পোস্ট করা হয়েছে। সর্বশেষ এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পোস্টটিতে ৩ হাজারের কাছাকাছি প্রতিক্রিয়া আসতে দেখা গেছে। পোস্টটিতে ৫ শতাধিক মন্তব্য পড়েছে যেখানে দাবিটি বিশ্বাস করে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন নেটিজেনদের অনেকে। এ ছাড়া বিভিন্ন পেজ এবং গ্রুপে একই ধরনের দাবিতে শতাধিক পোস্ট শেয়ার করা হয়েছে। 

প্রচারিত ছবিগুলো রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে গুগল আর্থে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ চিলির দক্ষিণ অঞ্চলে প্রশান্ত মহাসাগরের তীরে একটা উপত্যকায় নিয়ে যায়। গুগল ম্যাপে এই ঠিকানায় : “55°32'40"S 69°15'58"W” সার্চ করলে স্থানটির স্যাটেলাইট ভিউ দেখা যায়। জায়গাটির আশপাশে জুম ইন করলে এতে পাথুরে ভূমি এবং বরফের গঠনগুলো মানুষের মুখ, কংকাল বা ভয়ংকর আকৃতির অথবা বিভিন্ন অবয়ব দেখা যায়। 

তবে যাচাইয়ে ঘটনাটির বেশ কয়েকটি প্রযুক্তিগত ত্রুটি, মনস্তাত্ত্বিক বিভ্রম এবং প্রাকৃতিক কারণ জানা যায়। তবে ধর্মীয় ক্ষেত্রে যেমন : কোরআনের সুরা আন-নামল (২৭:৮২) এ ’দাব্বাতুল আরদ’ এর বিষয় উল্লেখ আছে, যা কিয়ামতের একটা আলামত হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে উল্লিখিত স্থানটির পাথুরে ভূমির বিন্যাসের সঙ্গে এর প্রমাণিত সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। 

প্রাকৃতিক কারণ: মূলত এলাকাটি দক্ষিণ আমেরিকার ২ দেশজুড়ে বিস্তৃত প্যাটাগোনিয়ার দূরবর্তী একটি পাহাড়ি অঞ্চল। ভূপ্রাকৃতিক কারণে সেখানে জমে থাকা বরফ এবং ভূমির পাথুরে গঠন প্রাকৃতিকভাবে এমন অদ্ভুত আকৃতি ধারণ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এবং ছায়ার খেলায় এগুলো আমাদের কল্পনায় মুখের মতো অথবা বিভিন্ন আকৃতি তৈরি করে। বিজ্ঞান এই ঘটনাকে "প্যারিডোলিয়া" (Pareidolia) হিসেবে ব্যাখ্যা করে। এটি এমন একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়া, যেখানে আমাদের মস্তিষ্ক বিচ্ছিন্ন অবয়বেও মুখ দেখে নিতে পারে। যেমন: চাঁদে মানুষের মুখ  বা মঙ্গল গ্রহ থেকে তোলা ছবিতে ‘ফেস অন মার্স’। 

২০২৪ সালে প্রকাশিত “seeing Faces in Things: A Model and Dataset for Pareidolia" শিরোনামের গবেষণাটিতে "Pareidolia-এর মডেল এবং ডেটাসেট নিয়ে গবেষণা দেখায় কীভাবে মানুষের মস্তিষ্ক বিচ্ছিন্ন ছবিতেও মুখ দেখে। লিংকন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. রবিন ক্রেমারের ব্যাখ্যাটি দেখুন এখানে। 

প্রযুক্তিগত কারণ: গুগল ম্যাপে যে ভিউ দেখানো হয় তার স্যাটেলাইট ছবিগুলো গুগল বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করে এবং জোড়া লাগিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র উপস্থাপন করে। ভৌগোলিকভাবে চিলির এই অঞ্চলটি মেঘাচ্ছন্ন এবং দূরবর্তী হওয়ায় ছবিতে অসম্পূর্ণতা থাকে। গুগলের অ্যালগরিদম তখন নিকটবর্তী অংশকে মিরর (প্রতিবিম্ব) করে একটি সিমেট্রিক্যাল (প্রতিসম) প্যাটার্ন তৈরি করে। তবে জুম ইন/প্যান করলে বরফ খন্ডগুলো আরও স্পষ্ট হয়। তবে অন্য ম্যাপিং সার্ভিস যেমন: অ্যাপল ম্যাপসে বা মাইক্রোসফটের বিং ম্যাপসে এমন দেখায় না। গুগলের এ সম্পর্কিত আরও কিছু ত্রুটির ঘটনা দেখুন এই ভিডিওতে। 

অর্থাৎ, প্রচারিত ছবিতে চিলির উল্লিখিত স্থানটি পাথুরে ভূমি এবং বরফখণ্ডে সন্নিবেশিত পৃথিবীর প্রান্তিক একটা অঞ্চল। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সেখানকার বরফ গলছে। পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরবর্তী হওয়ায় গুগল ম্যাপের প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং আমাদের মস্তিষ্কের বিচ্ছিন্ন অবয়বেও মুখ দেখার বিশেষ ক্ষমতার কারণে হয় এমন বিভ্রম তৈরি হয়।