logo
Advertisement

মির্জা ফখরুলকে চিকিৎসার জন্য শেখ হাসিনার ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার দাবিটি ভুয়া

এশিয়া পোস্ট ডেস্ক
মির্জা ফখরুলকে চিকিৎসার জন্য শেখ হাসিনার ৫০ লাখ টাকা দেওয়ার দাবিটি ভুয়া
প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে মির্জা ফখরুলের সহায়তা নেওয়ার দাবিতে ভাইরাল চেকটি ভুয়া। ছবি : ফেসবুক পোস্ট

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আওয়ামীপন্থী কিছু একাউন্ট থেকে একটি ব্যাংক চেকের ছবি পোস্ট করে দাবি করা হচ্ছে, স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে বিদেশে চিকিৎসার জন্য ত্রাণ তহবিল থেকে মির্জা ফখরুলকে পঞ্চাশ লাখ টাকা দিয়ে সাহায্য করা হয়েছিল। এতে নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগমের ছবির সঙ্গে একটি ব্যাংক চেকের ছবি পোস্ট করে আলোচিত দাবিটি প্রচার করা হচ্ছে।

Advertisement

তবে যাচাইয়ে জানা গেছে, আর্থিক সাহায্যের চেক দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত ছবিটি সম্পাদিত। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত আইনজীবীদের জন্য বরাদ্দকৃত প্রণোদনা তহবিল থেকে ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে দেওয়া সোনালী ব্যাংকের একটি চেক সম্পাদনা করে আলোচ্য চেকটি তৈরি করা হয়েছে।

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া চেকটি রিভার্স ইমেজ সার্চ করলে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ওয়েবসাইটে প্রচারিত চেকটির সঙ্গে প্রায়ই মিলে যায় এমন একটি পোস্ট পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে "ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে ছয় কোটি সত্তর লক্ষ পনের হাজার আটশত পঁচাত্তর টাকার আইনজীবী প্রণোদনার চেক প্রদানের মাধ্যমে বার কাউন্সিল হতে প্রণোদনা অর্থ বিতরণ শুরু হল" শিরোনামে মূল পোস্টটি পাওয়া যায়।

এ ছাড়াও, ‘লইয়ার্সক্লাব বাংলাদেশ’ নামে আইন বিষয়ক একটি অনলাইন পোর্টালেও এ সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। এতে ২০২২ সালের ২৪ মে "৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা প্রণোদনা পেল ঢাকা বারের আইনজীবীরা" শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয় যেখানে চেকটি সংযুক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে জানানো হয়, "করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত আইনজীবীদের সাহায্যার্থে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষ থেকে বার কাউন্সিলের আইনজীবী প্রণোদনা তহবিলে দেওয়া ২০ কোটি টাকা আইনজীবীদের মধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে। ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে ছয় কোটি সত্তর লক্ষ পনের হাজার আটশত পঁচাত্তর টাকার আইনজীবী প্রণোদনার চেক প্রদানের মাধ্যমে সোমবার (২৩ মে) বার কাউন্সিল হতে প্রণোদনার অর্থ বিতরণ শুরু হয়।"

যাচাইয়ে, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ওয়েবসাইট ও লইয়ার্সক্লাব বাংলাদেশের প্রতিবেদনে সংযুক্ত চেক এবং ফেসবুকে ভাইরাল চেক দুটির মধ্যে অন্তত তিনটি স্থানে হুবহু মিল রয়েছে। এরমধ্যে চেকটির উপরে ডানপাশে উল্লেখিত চেক নম্বর (১), দুটি স্বাক্ষর (২) এবং চেকের নিচে ‘ম্যাগনেটিক ইংক ক্যারেক্টার রিকগনিশন’ বা MICR কোড (৩) যেখানে বিশেষায়িত প্রযুক্তিতে চেক নম্বর, রাউটিং নম্বর ও সংশ্লিষ্ট একাউন্ট নম্বর পাশাপাশি একটু স্পেস দিয়ে উল্লেখ থাকে। তা হুবহু মিল রয়েছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল থেকে ঢাকা আইনজীবী সমিতিকে দেয়া চেকটির অন্তত নয়টি স্থানে সম্পাদনা করে ফেসবুকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে ভাইরাল চেকটি তৈরি করা হয়েছে। এরমধ্যে সোনালী ব্যাংকের উক্ত চেকটির শাখার নাম (১), ইস্যু তারিখ (২), রাউটিং নম্বর (৩), প্রাপকের নাম (৪), টাকার পরিমাণ কথায় (৫), টাকার পরিমাণ অংকে (৬), একাউন্টের নাম (৭), একাউন্ট নম্বর (৮) ও দুটি স্বাক্ষরের নীচে দেওয়া সীল (৯), এই নয়টি স্থানে এডিট করে পরিবর্তন করা হয়েছে।

এছাড়াও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত পোস্টের চেকটির মধ্যে কয়েকটি অসঙ্গতিও ধরা পড়েছে। সাধারণত ব্যাংকের চেকে চেক নম্বর, রাউটিং নম্বর ও একাউন্ট নম্বর ভিন্ন ভিন্ন স্থানে উল্লেখ থাকে এবং চেকের নিচে ম্যাগনেটিক ইংক ক্যারেক্টার রিকগনিশন বা MICR কোডে বিশেষায়িত প্রযুক্তিতে এই তিনটি নম্বর পাশাপাশি একটু স্পেস দিয়ে পুনরায় উল্লেখ থাকে।

তবে, ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া চেকটিতে দেখা যাচ্ছে, কেবল চেক নম্বরটি (নীল রংয়ে ব্লক করা) MICR কোডে মিল রয়েছে। এছাড়া, রাউটিং নম্বর ও একাউন্ট নম্বর দুটি ভিন্ন। অন্যদিকে, চেকে প্রদর্শিত তথ্য অনুযায়ী চেকটি সোনালী ব্যাংকের তেজগাঁও ব্রাঞ্চের। কিন্তু কি-ওয়ার্ড সার্চ করে সোনালী ব্যাংকের 'তেজগাঁও ব্রাঞ্চ' নামের কোনো ব্রাঞ্চের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। তবে 'তেজগাঁও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ব্রাঞ্চ' নামে সোনালী ব্যাংকের একটি ব্রাঞ্চ রয়েছে।

এছাড়াও, ব্যাংকবিডি ওয়েবসাইটে দেয়া তথ্য অনুযায়ী ব্রাঞ্চটির (তেজগাঁও ইন্ডাস্ট্রিয়াল এরিয়া ব্রাঞ্চ) রাউটিং নম্বর 200264512 যদিও চেকের মধ্যে রাউটিং নম্বর উল্লেখ করা 200276678। এছাড়া, ভাইরাল চেকে উল্লেখিত এই রাউটিং নম্বরের সাথে মিল রয়েছে এমন সোনালী ব্যাংকের কোনো ব্রাঞ্চ খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এর আগে, ২০২৪ সালের ২৪ আগস্ট চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যান মির্জা ফখরুল। বিদেশ যাওয়ার পরপরই তিনি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণতহবিল থেকে ৫০ লাখ টাকা অনুদান নিয়েছেন দাবিতে আলোচিত সে ব্যাংক চেক তখনই অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে সেসময়ই এর প্রতিক্রিয়ায় তৎকালীন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘এটা নোংরামি ছাড়া আর কিছু নয়। বিরোধী রাজনীতিবিদদের চরিত্র হননের জঘন্য খেলায় মেতেছে সরকার। তিনি প্রশ্ন রাখেন, এই নোংরামির শেষ কোথায়?’ সরকারের আর্থিক সহয়তা নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘তিনি বাপের জমি বিক্রি করে চিকিৎসা ও রাজনীতি করেন। তাঁকে কেনা সম্ভব নয়।’

অর্থাৎ, স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালে বিদেশে চিকিৎসার জন্য ত্রাণ তহবিল থেকে মির্জা ফখরুলকে পঞ্চাশ লাখ টাকা দিয়ে সাহায্য করা হয়েছিল দাবিতে প্রচারিত চেক এবং সরকারি সহায়তা নেওয়ার দাবি উভয়ই ভুয়া।

বিষয় :