জাইমা রহমানের ভুয়া ভিডিও ছেড়ে প্রতারণা, হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা

ফাহমিদা আক্তার (ছদ্মনাম) একসময় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন। জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে চাকরি ছেড়ে স্থায়ীভাবে গ্রামের বাড়ি রংপুরে চলে গেছেন এই নারী। এখন নিজের চিকিৎসা খরচ চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তিনি। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী কন্যা জাইমা রহমানের ঈদ উপলক্ষে কেনাকাটার জন্য অসহায় পরিবারের সদস্যদের আর্থিক সাহায্য দেওয়ার একটি ভিডিও তার সামনে আসে। ভিডিওর কমেন্টে বিকাশ নম্বর দিলেই আর্থিক সাহায্য পাওয়ার কথা থাকলেও সাহায্য পাওয়ার বদলে নিজের বিকাশে থাকা সাড়ে ৫ হাজারের বেশি টাকা খুইয়েছেন এই নারী।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানের ডিপফেক ভিডিও প্রচার করে এভাবেই অনলাইন প্রতারণা চলছে। ভিডিও শেয়ার করে লাইক-কমেন্ট করলেই পুরস্কার, ফ্যামিলি কার্ডের নিবন্ধন, পরিবারের সদস্যদের জন্মদিন কিংবা ঈদ উপলক্ষে গরিব পরিবারকে আর্থিক সাহায্যের নামে ফাঁদে ফেলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একাধিক চক্র।
এ ধরনের কিছু ভিডিও দেখুন এখানে, এখানে, এখানে এবং এখানে। তবে এশিয়া পোস্ট ফ্যাক্ট চেকিং টিমের যাচাইয়ে দেখা গেছে ভিডিওগুলো এআইর সহায়তায় তৈরি ডিপফেক। ভিডিওগুলো আসল মনে করে হাজার হাজার নেটিজেন নিজেদের বিকাশ, নগদ নম্বর কমেন্ট করে পরবর্তীতে নিজেরাই প্রতারিত হওয়ার অভিযোগ পেয়েছে এশিয়া পোস্ট।
এ সম্পর্কিত কি-ওয়ার্ড সার্চ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক এবং টিকটকে জাইমা রহমানের নামে অসংখ্য প্রোফাইল এবং পেজ পাওয়া যায়। বেশির ভাগ প্রোফালই রাজনৈতিক অপতথ্য ছড়ানোর কাজে ব্যবহার হলেও আর্থিক প্রতারণার সঙ্গে যুক্ত অন্তত এক ডজনের বেশি প্রোফাইল শনাক্ত করতে পেরেছে এশিয়া পোস্ট।
যাচাইয়ে দেখা গেছে, ফেসবুকে জাইমা রহমানের ভ্যারিফায়েড প্রোফাইলটি ইংরেজি নামে খোলা হয়েছে। কিন্তু নামের বাংলায় বিভিন্ন ধরনের বানানে এবং আগে-পিছে অন্যান্য উপাধি যুক্ত করে পরিচালিত হচ্ছে এসব প্রোফাইল। এ ধরনের একটি পেজ জাইমা রহমান। ২৮ মার্চ বিকেল ৪টায় এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পেজটিতে ৫ লক্ষাধিক ফলোয়ার থাকতে দেখা গেছে। পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, পেজটি থেকে গত ২ মাসে ৩৬৪টির বেশি এ ধরনের আর্থিক প্রতারণামূলক ভিডিও পোস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে বেশকিছু ভিডিও ২৫ থেকে ৫১ লক্ষাধিক বার ভিউ হওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার নেটিজেনকে সেখানে বিকাশ-নগদ নম্বর কমেন্ট করতে দেখা গেছে।
অনুসন্ধানে প্রতিবেদক দৈবচয়ন ভিত্তিতে ১০ পুরুষ এবং ১০ নারী মন্তব্যকারীকে ফোন করে আর্থিক সাহায্য বা পুরস্কার পাওয়ার বিষয়ে জানতে চায়। এর মধ্যে ৪ পুরুষ জানিয়েছেন নম্বর কমেন্ট করার কয়েক সপ্তাহ পেরিয়ে গেলেও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। ২ জন জানিয়েছেন তাদের কাছ থেকে নিবন্ধনের জন্য জাতীয় পরিচয়পত্র এবং অন্যান্য কাগজপত্রের পাশাপাশি ৩০০ টাকা চাওয়া হয়েছে। একজন জানিয়েছেন তার স্ত্রী ৬ শতাধিক টাকা পাঠিয়েছেন নিবন্ধনের জন্য।
অন্যদিকে, নম্বর মন্তব্য করা নারীদের ফোন করা হলে ৫ জন নারীই সর্বোচ্চ ৫ হাজার ৫৭৫ টাকা থেকে সর্বনিম্ন ৩০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন। বাকি ৫ জনের মধ্যে ২ জন এখনও পর্যন্ত যোগাযোগ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন এবং ৩ জনের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
তবে প্রচারিত ভিডিওগুলোর মধ্য থেকে কয়েকটি এআই কন্টেন্ট শনাক্তকরণ সাইট যেমন—হাইভমডারেশন, সাইট ইঞ্জিন এবং ডিপওয়্যারে আপলোড করে সবই এআই হিসেবে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
অন্যদিকে পেজটির ট্রান্সপারেন্সি যাচাইয়ে জানা গেছে, পেজটি চলতি বছরের জানুয়ারির ১৮ তারিখে সংগীত শিল্পী বা ব্যান্ড ক্যাটাগরিতে খোলা হয়েছে। বাংলাদেশের ভেতর থেকেই একাধিক অ্যাডমিনের সহায়তায় পরিচালিত হচ্ছে পেজটি।