মালয়েশিয়া থেকে চাঁদা চান দিলীপ দাদা, না দিলেই গুলি ঢাকায়

আমরাও দিলীপ দাদার নাম শুনেছি। তবে এই দিলীপ দাদা কে তা নিয়ে তদন্ত চলছে। তার প্রকৃত নাম কী সেটাও জানার চেষ্টা চলছে। এশিয়া পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানালেন ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) একজন কর্মকর্তা, যিনি সম্পৃক্ত আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আজিজুর রহমান মোসাব্বির হত্যা মামলার তদন্তে।
চলতি বছরের ৭ জানুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম তেজতুরী পাড়ায় প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় মোসাব্বিরকে। এ হত্যাকাণ্ডের এক সপ্তাহের মধ্যে প্রধান শুটার বিল্লালসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। জিজ্ঞাসাবাদে তাদের দেওয়া তথ্যে উঠে আসে দিলীপ ওরফে বিনাশ ওরফে বিমল নামে এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর নাম। ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে তিনি ‘দিলীপ দাদা’ নামে পরিচিত। গ্রেপ্তারকৃতদের দাবি, মালয়েশিয়া থেকে ১৫ লাখ টাকায় মোসাব্বিরকে হত্যার নির্দেশ দেন দিলীপ। কারওয়ান বাজারকেন্দ্রিক চাঁদাবাজি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে মোসাব্বিরকে হত্যা করান তিনি।
তদন্তে নাম উঠে এলেও দিলীপ দাদাকে নিয়ে ধোঁয়াশা কাটছে না। কে এই দিলীপ, কী তার আসল নাম, দেখতে কেমন, থাকেন কোথায়—এখনও এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পায়নি পুলিশ। অথচ খোঁজ নিতে গিয়ে জানা গেল, দিলীপের বিষয়ে কেউ বিস্তারিত কিছু না জানলেও তার নামে কাঁপছে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ড! এই শহরের বড় একটি অংশের চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এখন দিলীপের নেতৃত্বাধীন ‘দাদা গ্রুপের’ হাতে। কেবল ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই নয়, এই গ্রুপের সদস্যরা কমিশন আদায় করছেন বিভিন্ন এলাকার চাঁদাবাজদের কাছ থেকেও।
চাঁদাবাজিতে দাদা গ্রুপের দাপট
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ারা মোড় থেকে বসুন্ধরা সিটি শপিংমলের উল্টোদিকে ফুটপাত দিয়ে পান্থপথ সিগন্যালের দিকে এগোলে চোখে পড়বে জমজমাট এক জুতার মার্কেট। ফুটপাত দখল করে বসানো হয়েছে অন্তত ২২টি দোকান। ৫ আগস্টের আগে কলাবাগান থানা যুবলীগের নেতাকর্মীরা এ মার্কেট বসিয়ে চাঁদা তুলতেন।
পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা সেই ভাসমান মার্কেটের দখল নিয়েছেন। তাদের ইন্ধনে সার্ক ফোয়ারা থেকে পান্থপথ সিগন্যাল পর্যন্ত ফুটপাতে জুতার মার্কেট, ফার্নিচার মার্কেট, চায়ের দোকানসহ বিভিন্ন স্থাপনা বসিয়ে চলছে চাঁদাবাজি।
কয়েকটি জুতার দোকানের মালিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ফুটপাতের একেকটি দোকান থেকে প্রতি মাসে ভাড়া বাবদ ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা নেওয়া হয়। কলাবাগান থানা ও ওয়ার্ড বিএনপির নামে এ চাঁদা তুলছে কয়েকটি গ্রুপ। ভাসমান প্রতিটি দোকান কারও না কারও অধীনে চলছে।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই ফুটপাত ঘিরে প্রতি মাসে প্রায় অর্ধকোটি টাকার চাঁদাবাজি চলছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী ৫ আগস্টের পর থেকে চারটি গ্রুপ এ চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে ‘দাদা গ্রুপ’ নামে নতুন একটি চক্র মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তারা পান্থপথের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলা গ্রুপের কাছে কমিশন দাবি করতে থাকে।
অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে ওই এলাকায় চাঁদাবাজিতে জড়িত কয়েকজনের সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তারা জানান, মালয়েশিয়া থেকে ফোন দিয়ে একজন ব্যক্তি নিজেকে কখনও ‘দিলীপ দাদা’ আবার কখনও ‘বিমল দাদা’ পরিচয় দেন। তিনি চাঁদার টাকার কমিশন দাবি করেন। কথা না শুনলে তার গ্রুপের লোকজনের মাধ্যমে গুলি চালানোর হুমকিও দেন। এমনই এক বিবাদের জেরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা মোসাব্বিরকে হত্যা করা হয়। পুলিশের তদন্তেও উঠে এসেছে এমন তথ্য। চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের জেরেই মোসাব্বিরকে হত্যার নির্দেশ দেন দিলীপ।
এ হত্যাকাণ্ডের পর আন্ডারওয়ার্ল্ডে ব্যাপকভাবে আলোচনায় উঠে এসেছে ‘দাদা গ্রুপের’ নাম। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, মোসাব্বির নিহত হওয়ার পর পান্থপথকেন্দ্রিক চাঁদাবাজিতে দাদা গ্রুপের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হয়েছে। কিন্তু এখানেই থেমে থাকেননি দিলীপ। এবার কাওরান বাজার, ফার্মগেট, ইন্দিরা রোড, গ্রিন রোড, এলিফ্যান্ট রোড, হাতিরপুল, নিউমার্কেট, সাতমসজিদ রোড, তেজগাঁও, শ্যামলী রিং রোড, কলাবাগান ও রাসেল স্কয়ার এলাকার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, পরিবহন কাউন্টার, ফুটপাতের ভাসমান দোকান এবং ফুটপাতের অস্থায়ী মার্কেট থেকেও চাঁদার ভাগ দাবি করছেন তিনি।
ফোন আসে মালয়েশিয়া থেকে, চাঁদা না দিলে গুলি চলে ঢাকায়
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ভুক্তভোগী এশিয়া পোস্টকে বলেন, মালয়েশিয়ার নম্বর থেকে কল দিয়ে একজন নিজেকে দিলীপ দাদা নামে পরিচয় দিয়ে চাঁদা দাবি করেন। দাবি অনুযায়ী চাঁদা না দিলে গুলি করে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ‘দাদা গ্রুপের’ লোকজন সক্রিয়। দিলীপের ফোনের নির্দেশনা না মানলে ঢাকায় অবস্থানকারী তার গ্রুপের সদস্যরা হামলা চালান। পেশাদার সন্ত্রাসী ছাড়াও ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ আমলের চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত অনেকে রয়েছেন এই গ্রুপে।
স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়, মোসাব্বিরকে হত্যার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত থাকায় কিছুদিন নীরব থাকলেও নির্বাচনের পর ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন দাদা গ্রুপের লোকজন। গত ২২ ফেব্রুয়ারি পান্থপথের জুতার মার্কেটের সামনে শফিকুর রহমান (৫৫) নামে বিএনপির একজন স্থানীয় নেতাকে গুলি করার অভিযোগ উঠেছে তাদের নামে।
পান্থপথের ভাসমান জুতার মার্কেটের দোকানদাররা জানান, ১৬ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সহসাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান নিজেও একজন জুতা ব্যবসায়ী। ২২ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি ফুটপাতের জুতার মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় স্থানীয় চিহ্নিত সন্ত্রাসী সুমন আরও ৫-৬ জন সহযোগী নিয়ে সেখানে আসেন এবং অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যেই শফিকুরকে ধাওয়া করেন। প্রাণ বাঁচাতে চিৎকার করে দৌড় দেন শফিকুর। এ সময় সন্ত্রাসীরা তিন রাউন্ড গুলি ছোড়ে। একটি গুলি তার বাঁ হাতে বিদ্ধ হয়।
দোকানিরা আরও জানান, হামলাকারী সুমন ৫ আগস্টের আগে যুবলীগ নেতাদের সঙ্গে ভাড়াটে সন্ত্রাসী হিসেবে কাজ করতেন। ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টে আবারও এলাকায় ফিরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন।
এ ঘটনায় শফিকুর রহমান বাদী হয়ে কলাবাগান থানায় মামলা করেছেন। মামলার অভিযোগে তিনি বলেছেন, গত কয়েক মাস ধরে বিদেশি নম্বর থেকে কল দিয়ে ‘দিলীপ দাদা’ নামে একজন ব্যবসা থেকে চাঁদা দাবি করছিলেন। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় তার ক্যাডাররা গুলি চালিয়েছে বলে দাবি করেন শফিকুর।
ধোঁয়াশা কাটছে না পুলিশের
কারওয়ান বাজার ও পান্থপথকেন্দ্রিক দুটি ঘটনায় নাম আসার পর দুই মাসেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দিলীপ ওরফে বিমলকে এখনও চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ। দিলীপের প্রকৃত নাম, পরিচয় এবং তার পূর্বকারে অপরাধের বিষয়েও কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
শফিকুরের মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে কলাবাগান থানার ওসি ফজলে আশিক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি এই ‘দিলীপ দাদা’ দেশের বাইরে অবস্থান করে চাঁদা দাবি করছে। তবে তিনি কোন দেশে অবস্থান করছেন তা এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’
এদিকে মোসাব্বির হত্যা মামলা তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির কয়েকজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে জানান, দিলীপের প্রকৃত নাম-পরিচয় জানার চেষ্টা চলছে। তাকে এখনও চিহ্নিত করা না গেলেও ঢাকায় তার একজন ‘আশ্রয়দাতা’ রয়েছেন বলে জানা গেছে, যাকে আন্ডারওয়ার্ল্ডে মুরুব্বি নামে ডাকা হয়। যদিও এই মুরুব্বির পরিচয় এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তারপরও দ্রুততম সময়ের মধ্যে দিলীপকে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার ব্যাপারে আশাবাদী ডিবির কর্মকর্তারা।