নিয়ম মানেননি এজাজ, ডিএনসিসির ২৫ দরপত্র বাতিল

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে ১৫৬ কোটি টাকার ৫৯টি দরপত্র আহ্বানের অভিযোগ উঠেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নিয়োগ পাওয়া প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের বিরুদ্ধে।
তার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় এরই মধ্যে ২৫টি দরপত্র বাতিল করা হয়েছে। দায়িত্ব ছাড়ার আগে বিপত্তির আশঙ্কায় এজাজ নিজেও ৫টি দরপত্র বাতিল করেছিলেন। নতুন প্রশাসকের আমলে নতুন করে যাচাই-বাছাই শুরু হয়েছে অভিযোগ ওঠা বাকি দরপত্র নিয়েও।
এজাজের মদদে দরপত্র ডাকেন নির্বাহী প্রকৌশলী
ডিএনসিসি সূত্র জানায়, চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) প্রশাসক এজাজের নির্দেশে ৫৯টি দরপত্র আহ্বান করা হয়। আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদন ছাড়াই প্রশাসকের মদদে ১৫৬ কোটি টাকার এসব দরপত্র আহ্বান করেন ডিএনসিসির অঞ্চল-৫–এর ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী (বর্তমানে বহিষ্কৃত) মো. মিজানুর রহমান। প্রশাসকের ছাত্রছায়া পেয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠা এ প্রকৌশলী নিয়ম না মেনে আহ্বান করা দরপত্র অনুমোদনের জন্য করপোরেশনের ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের চাপ প্রয়োগ করতেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের আহ্বান করা ৫৯ দরপত্রের অধিকাংশেই আর্থিক ও কারিগরি কমিটির অনুমোদন ছিল না। এ নিয়ে প্রকাশ্যে কেউ আপত্তি না জানালেও ডিএনসির কর্মকর্তাদের মধ্যে এ নিয়ে সমালোচনার সৃষ্টি হয়। এমন প্রেক্ষাপটে পরবর্তী জটিলতা এড়াতে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে এসব দরপত্রে বৈধতা দেওয়ার তোড়জোড় শুরু করেন প্রশাসক এজাজ। কিন্তু তাতে ব্যর্থ হয়ে গা বাঁচাতে তড়িঘড়ি করে এজাজ নিজের চুক্তির মেয়াদের শেষ সপ্তাহে পাঁচটি দরপত্র বাতিল ঘোষণা করেন। পরবর্তী সময়ে নতুন প্রশাসক আরও ২৫টি দরপত্র বাতিল করেন।
এ বিষয়ে ডিএনসিসির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আরিফুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘বাতিল হওয়া দরপত্রগুলোতে প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদনের অভাব ছিল। তবে ৫৯টি দরপত্রের মধ্যে মাত্র কয়েকটির প্রশাসনিক, আর্থিক ও কারিগরি অনুমোদন ছিল, বাকিগুলোর কোনো অনুমোদন ছিল না। দরপত্রগুলো বর্তমানে দাপ্তরিক তদন্তের অধীনে রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘কোনো প্রকৌশলী দরপত্র করতে চাইলে প্রথমে আর্থিক অনুমোদন নেবে দপ্তর থেকে, তারপর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী থেকে প্রধান প্রকৌশলী; সবার থেকে কারিগরি অনুমোদন নেবে। কিন্তু এসব দরপত্রে এ ধরনের কোনো নিয়মই মানা হয়নি। আমরা জানিও না যে এসব দরপত্র হয়েছে।’
ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমানের কার্যক্রম নিয়ে আরিফুর রহমান বলেন, ‘একজন প্রকৌশলী অনুমোদন ছাড়াই দরপত্র আহ্বান করতে পারেন এবং সেটি লাইভ থাকাকালীন বাতিল করতে পারেন। কিন্তু একবার দরপত্র উন্মুক্ত হয়ে গেলে সেটি বাতিল করতে হলে ক্রয়কারী সংস্থার প্রধানের অনুমোদনের প্রয়োজন হয়। তবে এক্ষেত্রেও তিনি নিয়ম মানেননি।’
বাতিল হয়েছে যেসব দরপত্র
এজাজের সময়ে আহ্বান করা দরপত্রগুলোর মধ্যে যে ৩০টি বাতিল হয়েছে তার তালিকা হাতে পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। প্রকল্পগুলো হলো—ডিএনসিসির ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের মেরামত, ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল হালিম কমিউনিটি সেন্টারের সংস্কার, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের নবীনগর হাউজিংয়ের রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নের একাধিক, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের আগারগাঁও এলাকায় গাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটে ভবনের পাশের খালের ওপর আর্চ সেতু, ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের বায়তুল আমান হাউজিং সোসাইটির সড়কের ও ড্রেনের সংস্কারের একাধিক কাজ, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের ঢাকা উদ্যানের পাশের বিভিন্ন সড়ক, ফুটপাত ও ড্রেন সংস্কারে একাধিক কাজ, ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের মোহাম্মদীয়া হাউজিং লিমিটেড এলাকার সড়ক ও ড্রেনের উন্নয়ন, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের শ্যামলী ২, ৩, ৪ নম্বর সড়ক ও ড্রেনের উন্নয়নে একাধিক কাজ, ২৮ নম্বর ওয়ার্ডের পূর্ব আগারগাঁও এলাকার ভূঁইয়া গলির সড়ক সংস্কার, বনলতা হাউজিং এলাকার সড়ক ও ড্রেন সংস্কার, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ভবনের পাশের আর্চ সেতুর সংস্কার এবং ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের আগারগাঁও মেট্রো স্টেশন থেকে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর পর্যন্ত এলাকার রোড মিডিয়ান, ফুটপাতের উন্নয়নকাজ।
দায় এড়াচ্ছেন এজাজ
ডিএনসিসির সিনিয়র প্রকৌশলীরা জানান, অঞ্চল-৫ এর অধীনে প্রায় ১৫৬ কোটি টাকার ৫৯টি দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। এর মধ্যে প্রশাসনিক ও আর্থিক প্রয়োজনীয় অনুমোদন না থাকায় ৩০টি বাতিল করা হয়েছে। এসব দরপত্রে ব্যয়ের পরিমাণ বাড়িয়ে দেখানো হয়েছিল; যাতে করপোরেশনের আর্থিক ও প্রশাসনিক কমিটির যাচাই-বাছাই করা হয়নি; তাদের অনুমোদনও নেই। বিশেষ বাজেট সাধারণত ২০-৩০ কোটি টাকার জরুরি মেরামতের জন্য ব্যবহৃত হয়, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া প্রায় ১৬০ কোটি টাকার প্রকল্পের জন্য নয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের ছত্রছায়ায় এই প্রকৌশলী এসব দরপত্র অনুমোদনের জন্য সবাইকে চাপ দিয়েছেন।
প্রকৌশলীদের দাবি, জাতীয় নির্বাচনের আগে প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার মাত্র এক সপ্তাহ আগে আর্থিক ও কারগরি কমিটির কোনো সাড়া না পেয়ে তড়িঘড়ি করে নিজের দায় এড়ানোর জন্য তিনি ৫৯টি দরপত্রের মধ্যে মাত্র পাঁচটি বাতিল করেছেন। পরে নতুন প্রশাসক এসে আরও ২৫টি দরপত্র বাতিল করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, অনেক দরপত্র হাউজিং প্রকল্পের এলাকাভুক্ত ছিল, যা রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ীদের স্বার্থ হাসিলের বিষয়টি সামনে নিয়ে আসে। প্রকল্পগুলো জনস্বার্থে নাকি ব্যক্তিগত ডেভেলপারদের সুবিধার জন্য নেওয়া হয়েছিল, তা এখন খতিয়ে দেখছে কর্তৃপক্ষ।
তবে সাবেক প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এশিয়া পোস্টের কাছে অনুমোদন ছাড়া দরপত্র আহ্বান ও বাতিলের বিষয়টি অস্বীকার করেন। তিনি অভিযোগকারীদের বোঝার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। এজাজ বলেন, ‘দরপত্র আহ্বানের আগে প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্টদের নিয়ে আর্থিক ও কারগরি কমিটি যাচাই-বাছাই করলে প্রশাসক দরপত্র অনুমোদন করেন। আমার কাজ শুধু দরপত্র অনুমোদন করা ছিল। বাকি কাজ ছিল কমিটির। এতে যারা আমার সংশ্লিষ্টতা তুলছেন তারা হয়তো মিথ্যা বলছেন অথবা না বুঝে বলছেন।’
প্রতিমন্ত্রীর নালিশে ফেঁসেছেন প্রকৌশলী মিজান
বড় অঙ্কের দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই নিম্নমানের কাজ নিয়ে বেকায়দায় পড়েছেন ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান। গত বুধবার (২৬ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও ঢাকা-১৩ আসনের সংসদ সদস্য ববি হাজ্জাজ মোহাম্মদপুরে ডিএনসি অঞ্চল-৫-এর আওতাধীন একটি সড়ক প্রকল্পে গিয়ে ফাটল ও ধস দেখতে পান। বিষয়টি নিয়ে তিনি অভিযোগ দেওয়ার পর কর্তব্যে অবহেলা, অসদাচরণ ও অদক্ষতার অভিযোগে মিজানুর রহমানকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।
দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জানতে মিজানুর রহমানকে একাধিকবার কল ও হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দেওয়া হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। দপ্তরে গিয়েও তার খোঁজ মেলেনি।
এ বিষয়ে ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঢাকা-১৩ এর সংসদ সদস্যের অভিযোগের ভিত্তিতে নিম্নমানের কাজের জন্য মিজানুর রহমানকে এর মধ্যে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার প্রক্রিয়া চলছে। তার বিরুদ্ধে সব ধরনের অভিযোগ তদন্ত করা হবে। এর সঙ্গে কারা সংশ্লিষ্ট সেটিও দেখা হবে।
যা বলছেন নতুন প্রশাসক
প্রশাসক এবং প্রকৌশলীর যোগসাজশে দরপত্রে অনিয়মের বিষয়ে এশিয়া পোস্ট কথা বলেছে ডিএনসিসির নতুন প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের সঙ্গে। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন।
সোমবার (২ মার্চ) নিজ দপ্তরে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে প্রকৌশলী মিজানুরের বিষয়ে শফিকুল ইসলাম মিল্টন বলেন, ‘ইতোমধ্যে নিম্নমানের কাজের সম্পৃক্ততার কারণে আমরা তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করেছি। এখন আমরা এই বিষয়টি প্রশাসনিক তদন্ত করব, তার বিরুদ্ধে আরও কী কী বিষয় আছে। একটা সিটি করপোরেশনের মতো দায়িত্বশীল জায়গায় যদি এতটুকু দুর্নীতি বা তৎপরতা বেশি হয়ে যায়, যে প্রতিষ্ঠানটি নষ্ট হয়ে যায়—আমরা এই বিষয়টিকে তদন্তের মাধ্যমে দেখে তারপর পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’
প্রকৌশলীর অনিয়মের সঙ্গে সাবেক প্রশাসক এজাজের সম্পৃক্ততা খতিয়ে দেখা হবে কিনা জানতে চাইলে ডিএনসিসির নতুন প্রশাসক বলেন, ‘আমি শুনেছি, আপনারাও শুনেছেন। এই বিষয়ে আমি কথা না বলে অফিশিয়ালি কোনো অন্যায় আছে কি না, সে বিষয়ে আমি দেখব।’