মানুষের আস্থায় ব্যবসায়ে সম্পৃক্ততা বাড়ছে আলেমদের

দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে সম্পৃক্ততা বেড়েছে আলেমদের। অনলাইন ও অফলাইনে প্রতিষ্ঠান গড়েছেন অনেকে। ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসেও কাজ করছেন বহু হাফেজ, মুফতি ও কওমি ঘরানার তরুণরা।
মূলত খাঁটি পণ্যের জন্য মানুষের আগ্রহ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে আলেম ব্যবসায়ীদের প্রতি আস্থাশীল অনেকে। তাদের ধারণা, আলেম বা দ্বীনদার একজন ব্যবসায়ী তার পণ্যের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত সৎ হবেন। ফলে মধু, খেজুর, সরিষার তেলসহ নানা পণ্যের ব্যবসায়ে ভালো করছেন আলেম ও দ্বীনদার উদ্যোক্তারা।
ফেসবুকে বিভিন্ন পেজ থেকে যারা কেনাকাটা করেন তাদের বড় অংশের কাছে পরিচিত নাম ঘরের বাজার। এর প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা জামশেদ মজুমদার। প্রতিষ্ঠানটি মধু, খেজুর, সরিষার তেল ও বাদামসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করে।
প্রথমে শুধু অনলাইনে কার্যক্রম শুরু করলেও বর্তমানে রাজধানীর কয়েকটি মেট্রো স্টেশনে ঘরের বাজারের আউটলেট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির উদ্যোক্তা জামশেদ মজুমদারের নানা বিজ্ঞাপনও আলোচিত।
ঘরের বাজারের একটি ব্র্যান্ড খেজুরির এক ভিডিও প্রমোশনে সৌদি আরবের একটি বাগানে ফলভর্তি খেজুর গাছে উঠতে দেখা যায় জামশেদ মজুমদারকে। এ সময় তিনি ওই বাগানের খেজুরের নানা গুণাগুণ বর্ণনা করে সেগুলো গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা জানান।

শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও নিজেদের দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন আলেমরা। তাদের একজন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাওলানা মাহমুদুল হাসান চৌধুরী। কাতারে প্রবাসী বাংলাদেশিদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং তথ্যপ্রযুক্তিতে তাদের পারদর্শী করে গড়ে তুলতে নানা উদ্যোগ নিয়েছেন এই আলেম।
কাতারে নুজুম গ্রুপ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা মাহমুদুল হাসান চৌধুরী। এই গ্রুপের কয়েকটি শাখা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে নুজুম লিমুজুন, নুজুম তাকদির লিমুজুন, নুজুম কন্সট্রাকশন, নুজুম ট্রাভেলস ও নুজুম আইটি। বর্তমানে কোম্পানির মূলধন কয়েক কোটি টাকা। কাজ করছেন ৬০০-এরও বেশি মানুষ।
তৎপর আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন
দেশে মানবকল্যাণে নিবেদিত একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশন। বন্যা থেকে শুরু করে যে কোনো দুর্যোগে সাধারণ মানুষের পাশে এগিয়ে আসে সংস্থাটি। আস-সুন্নাহ ফাউন্ডেশনের বর্তমান চেয়ারম্যান ইসলামিক স্কলার শায়খ আহমাদুল্লাহ। ফাউন্ডেশনের অধীনে আস-সুন্নাহ স্কিল ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউট গড়ে তুলেছেন তিনি।
প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে প্রায় ১৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে ২ হাজার ১৭৯ জনকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা পরবর্তী এক বছরে সম্মিলিতভাবে প্রায় ৪২ কোটি টাকা আয় করেছেন। তাদের মধ্যে অনেক আলেম উদ্যোক্তা রয়েছেন।
ইনস্টিটিউটের ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান ফারিদ খান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অদক্ষ ও বেকার তরুণ-তরুণীদের আধুনিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে গড়ে তোলাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে তাদের আর্থিক স্বনির্ভরতা নিশ্চিত করি। সুবিধাবঞ্চিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য স্কলারশিপ ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করি।’
ইসলামী ঐতিহ্য ও ব্যবসা
আট থেকে ১০ বছর আগেও মাদ্রাসা পড়ুয়াদের অন্য পেশায় তেমন দেখা যেত না। তাদের কর্মসংস্থানের বড় অংশজুড়ে ছিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতা, মসজিদে ইমামতি বা ধর্মীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের চাকরি। কিন্তু দিন বদলেছে। এখন মসজিদ-মাদ্রাসার পাশাপাশি আরও নানা খাতে নিজেদের কাজের পরিধি বাড়িয়েছেন আলেমরা।
তাদের কেউ এখন ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কেউ নানা রকম পণ্যের ব্যবসায়ী। কেউ অনলাইনে ব্যবসা করছেন, কেউ ডিজিটাল মার্কেটপ্লেসে কাজ করছেন। কেউ আবাসন আবার কেউ পর্যটন খাতের সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে অনলাইনে হোমমেড পণ্যের ব্যবসা, বই প্রকাশ ও কাপড়ের ব্যবসায় আলেমদের সম্পৃক্ততা বেশি।

ব্যবসা-বাণিজ্যে আলেমদের সম্পৃক্ততাকে ঐতিহ্যের অংশ মনে করেন শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক মুসা আল হাফিজ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সাহাবিদের অনেকে প্রতিষ্ঠিত ও সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। অতীতের বড় বড় আলেমরা ব্যবসা করেছেন। আলেমরা ব্যবসায় সম্পৃক্ত হওয়া প্রশংসনীয় বিষয়। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা এবং তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষ তাদের ব্যবসার প্রতি উৎসাহিত করছে। অনেকের সামনে সম্ভাবনা হাজির করেছে।’
করোনার ধাক্কা ও ব্যবসায়িক উদ্যোগ
করোনাভাইরাসের প্রকোপে ২০২০ সালে দেশের অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ে। এর প্রভাব পড়ে মাদ্রাসাগুলোতেও। অধিকাংশ প্রাইভেট মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে যায়। অনেক কওমি মাদ্রাসায় লম্বা সময়ের জন্য ছুটি দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। বেতন আটকে যায় বহু প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের। ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন অনেকে।
এই ধকল কাটিয়ে উঠতে পরে ব্যবসামুখী হন আলেমদের একটি অংশ। বিশেষ করে অনলাইনভিত্তিক নানা উদ্যোগে জড়িয়ে পড়েন অনেকে। মূল্যস্ফীতির এই সময়ে মাদ্রাসায় কম বেতন ও বেতন বকেয়া থাকার বিষয়টিও তাদের পেশাগত বৈচিত্র্যের প্রতি উৎসাহিত করে।
গবেষক মুসা আল হাফিজ বলেন, ‘এখন কেউ কেউ মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পেশাকে নিশ্চিয়তা হিসেবে দেখছেন না। তারা বিকল্প হিসেবে ব্যবসা বেছে নিয়েছেন। স্বল্প বেতনের বিষয়টি অতীতেও ছিল। তখনকার আলেমরা মাদ্রাসায় পড়ানোর পাশাপাশি নানা ধরনের কাজ করেছেন।’
বর্তমানে প্রতি বছর ২০ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) পরীক্ষা দেন। তাদের একটা বড় অংশ পরে আর মসজিদ-মাদ্রাসায় চাকরির বদলে ভিন্ন পেশায় যুক্ত হচ্ছেন। কেউবা পাড়ি জমাচ্ছেন বিদেশে।
ব্যবসায় আলেমদের সম্পৃক্ততাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন কওমি মুরুব্বিরা। বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের (বেফাক) মহাসচিব ও আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিআতিল কওমিয়ার স্থায়ী কমিটির সদস্য মাওলানা মুহাম্মাদ মাহফুজুল হক। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ইসলামের প্রয়োজনে যেসব জায়গায় ভূমিকা রাখা দরকার, সেসবের তুলনায় কওমি মাদ্রাসা থেকে শিক্ষা সমাপনকারীর সংখ্যা এক সময় কম ছিল। ফলে তারা সেখানেই সম্পৃক্ত হতো। অন্যদিকে মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। কওমি মাদ্রাসার প্রতি মানুষের ব্যাপক আগ্রহের কারণে এখন শিক্ষা সমাপনকারীর সংখ্যা বেড়েছে। তাদের বিভিন্ন জায়গায় মনোযোগ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। তাই তারা ব্যবসা-বাণিজ্যসহ নানা পেশায় ভূমিকা রাখছে।’
আলেমদের নিয়ে কাজ করছে কওমি উদ্যোক্তা
আলেম ও কওমি মাদ্রাসার তরুণদের ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম কওমি উদ্যোক্তা। তাদের নিবন্ধিত তালিকায় বর্তমানে প্রায় ৩০ হাজার আলেম উদ্যোক্তার নাম আছে। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
করোনার মধ্যে ২০২০ সালের জুলাইয়ে ফেসবুকে ‘কওমি উদ্যোক্তা’ নামের গ্রুপ খোলেন দুই তরুণ রোকন রাইয়ান ও মুমিনুল ইসলাম। অল্প সময়ের মধ্যে তাদের সদস্য সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যায়। তাদের বেশিরভাগই আলেম বা মাদ্রাসা পড়ুয়া। এখানে যুক্ত হওয়া সদস্যদের অনেকেই অর্গানিক ফুড, কাপড় ও হোমমেড পণ্য নিয়ে কাজ করেন।
রোকন রাইয়ান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘পণ্য কেনাবেচায় ভেজালের বিষয়টি পুরোনো। অনলাইনে আরও বেশি ভেজাল ও প্রতারণার সুযোগ থাকে। তাই অনলাইনে ক্রেতারা বিশ্বস্ত মানুষকে প্রাধান্য দিচ্ছে। আলেমদের প্রতি মানুষের বিশ্বাসের জায়গায়টা বেশ ভালো। ফলে কেনাকাটার ক্ষেত্রে মানুষ আলেম ব্যবসায়ীকে প্রাধান্য দেন, তাদের কাছ থেকে কেনাকাটা করেন।’
কওমি উদ্যোক্তা সদস্যদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে। পণ্য বেচাকেনায় তাদের সহযোগিতা করে। গ্রুপটির মাধ্যমে এ পর্যন্ত ৩০ হাজার আলেম উদ্যোক্তা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
রোকন রাইয়ান বলেন, ‘করোনার সময় থেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে আলেমদের সম্পৃক্ততা বাড়তে শুরু করে। কওমি উদ্যোক্তার নিবন্ধিত তালিকায় প্রায় ৩০ হাজার আলেম উদ্যোক্তার নাম আছে। এ ছাড়া দেশে আরও বহু আলেম ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা আছে। এ সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।’
আলেমদের মধ্যে রোকন রাইয়ানই প্রথম অপেক্ষাকৃত বড় পরিসরে ট্যুর গাইডের কাজ শুরু করেন। পর্যটকদের জন্য তৈরি করেন সহযাত্রী নামের প্ল্যাটফর্ম। পাঁচ বছরে প্রায় ৪ লাখ পর্যটককে দেশ-বিদেশে ঘুরিয়ে দেখেছেন। আবাসন খাতে তৈরি করেছেন আশারা বিল্ডার্স নামের প্রতিষ্ঠান।
কওমি উদ্যোক্তার সহ-প্রতিষ্ঠাতা হাফেজ মুমিনুল ইসলাম গড়ে তুলেছেন ডিজিটাল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান সোশ্যাল গিক। স্কিল ডেভেলপমেন্ট, মার্কেটিং, কনসালটেনসি, ওয়েবসাইট ও কনটেন্ট তৈরির মতো নানা বিষয়ে কাজ করে প্রতিষ্ঠানটি।
গত ছয় বছরে ৫ হাজারের বেশি উদ্যোক্তাকে কোর্স ও ওয়ার্কশপ করিয়েছে সোশ্যাল গিক। ৩০০-এরও বেশি ব্র্যান্ডকে সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দিতে সহায়তা করেছেন মুমিনুল।
মুমিনুল ছাড়াও আরও অনেক কওমি তরুণ ডিজিটাল মার্কেটে কাজ করছেন। কেউ দেশে বসে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে ফ্রিল্যান্সিং করছেন। ওয়েবসাইট ডিজাইন, আইটি সেক্টর, কম্পিউটার মেরামত, মোবাইল মেকানিজমের কাজ করছেন অনেকে।
মুমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ডিজিটাল মার্কেটে আলেমদের জন্য বড় সম্ভাবনা রয়েছে। তাদের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতাকে ডিজিটাল স্কিলের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে তারা শিক্ষা, কনটেন্ট ক্রিয়েশন, কাউন্সেলিং, ইন্টারপ্রেনরশিপ এবং বিভিন্ন অনলাইন উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।’
