গুদামে পড়ে নষ্ট হচ্ছে শত কোটি টাকার স্মার্ট মিটার

বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা আনা এবং দক্ষতা বাড়াতে ২০১৮ সালে স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার প্রকল্পে হাত দেয় তৎকালীন সরকার। কিন্তু বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানির (ডিপিডিসি) নানাবিধ অদক্ষতা এবং অসচ্ছতার কারণে প্রকল্পটি এখন ঝুঁকির মুখে। প্রকল্পের আওতায় পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম ছাড়া আমদানি করা চার লাখের বেশি স্মার্ট মিটার দীর্ঘদিন ধরে গুদামে পড়ে থাকায় এ ঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে।
সরকারি নথিতে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে স্থাপন করা না গেলে এসব মিটার বিকল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে বিফলে যাবে শত শত কোটি টাকার সরকারি বিনিয়োগ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় ‘৮ লাখ ৫০ হাজার স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন (বিশেষ সংশোধিত)’ প্রকল্পটি ২০১৮ সালের আগস্টে একনেকের অনুমোদন পায়। প্রায় ৬৫৮ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত। কিন্তু সেই মেয়াদ আরও অনেক আগে পেরিয়ে গেলেও প্রকল্পের বড় অংশ এখনো অসম্পন্ন। এরই মধ্যে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৩৪ কোটির বেশি টাকায়। কাজ শেষ করতে আবারও এক বছর মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ ও ডিপিডিসি।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ ৬০ হাজার স্মার্ট মিটার আমদানি করা হলেও ভোক্তা পর্যায়ে স্থাপন হয়েছে আড়াই লাখের মতো। বাকি ৪ লাখের বেশি মিটার দীর্ঘদিন ধরে গুদামে পড়ে আছে। বিদ্যুৎ বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রকল্পের মেয়াদ ফের না বাড়লে এসব মিটার বসানো যাবে না। দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
শুরু থেকেই বিপত্তি, অদক্ষতার ছাপ
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে জানান, কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই একের পর ঝামেলার সম্মুখীন হয়েছেন তারা। প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার পর প্রথম ধাপের টার্নকি চুক্তি (প্যাকেজ-১) স্বাক্ষর করতেই লেগেছে প্রায় দুই বছর। আবার শুরুতে একবার দরপত্র ডেকে তা বাতিল করে পুনরায় আহ্বান করতে গিয়েও প্রকল্প অনেকটা পিছিয়েছে। এরপর বিশ্বজুড়ে শুরু হয় কোভিড-১৯ মহামারি। বৈশ্বিক সংকটে ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশের কাঁচামাল সরবরাহ ব্যাহত হয়, ফলে স্মার্ট মিটার ও নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি উৎপাদন ও সরবরাহে বড় বিলম্ব ঘটে।
২০২২ সালের এপ্রিলে প্যাকেজ-২ ও প্যাকেজ-৩ চুক্তি স্বাক্ষর হলেও বাস্তবে বড় পরিসরে মিটার স্থাপন শুরু হয় ২০২৩-২৪ অর্থবছরে। তবে স্মার্ট মিটারের সঙ্গে যুক্ত বিলিং সিস্টেম (এমডিএম) যথাযথভাবে অপটিমাইজ না করেই মিটার স্থাপন শুরু হয়। অর্থাৎ মূল যন্ত্রগুলো কেনা হলেও সেগুলো চালাতে প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনা হয়নি; যা প্রকল্প পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি ও অপ্রস্তুতির উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে, মাঠে মিটার স্থাপনের জন্য সহায়ক যন্ত্রপাতি—যেমন আরএফ নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস কার্ড (এনআইস) নামে যন্ত্রাংশ প্রয়োজন; কিন্তু তা এখনো চাহিদা অনুযায়ী আমদানি হয়নি। স্মার্ট মিটারের সঙ্গে যুক্ত বিলিং সিস্টেম অপটিমাইজ না থাকায় প্রায় পাঁচ মাস মিটার স্থাপন বন্ধ রাখা হয়।
এতে শুরু হয় আরও বড় জটিলতা। পূর্ণাঙ্গভাবে স্থাপন না করায় মিটার প্রি-পেমেন্ট মোডে কাজ করেনি। এতে গ্রাহকদের বিল বকেয়া জমতে থাকে। সেই বকেয়া বিলের হিসাব সামাল দিতে গিয়ে সাময়িকভাবে নতুন মিটার বসানো বন্ধ রাখা ছাড়া উপায় ছিল না বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের হাতে।
প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, মাঠপর্যায়ের বাস্তবতাও প্রকল্পের গতি কমিয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি ভবনের ছাদে এবং বৈদ্যুতিক খুঁটিতে আরএফ নেটওয়ার্ক যন্ত্রপাতি বসাতে গিয়ে সাইট অধিগ্রহণে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয়। অনেক এলাকায় স্থানীয়দের অনাগ্রহ ও বাধার মুখে পড়তে হয়েছে ঠিকাদারদের। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মাঠপর্যায়ের কাজ আরও মন্থর হয়ে পড়ে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, এমন পরিস্থিতির জন্যও বিকল্প পরিকল্পনা বা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এরই মধ্যে বৈদেশিক মুদ্রা সংকট প্রকল্পে নতুন চাপ সৃষ্টি করে। বিল প্রত্যয়ন হওয়ার পরও ডলার সংকটের কারণে ঠিকাদারদের অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হয়। এতে সরবরাহ ও স্থাপন কাজ আরও মন্থর হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সময়মতো অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারাও প্রকল্প ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার অংশ। বর্তমানে আড়াই লাখের বেশি আরএফ নেটওয়ার্ক ইন্টারফেস কার্ড (এনআইসি) এখনো আমদানি বাকি রয়েছে, যা ছাড়া অবশিষ্ট মিটার বসানো সম্ভব নয়।
কাজ থমকে গেলেও ব্যয় থেমে নেই
ডিপিডিসির এই প্রকল্প নিয়ে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ দেখা গিয়েছে অর্থ ব্যয়ের দ্রুত গতি নিয়ে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য এবং নথিপত্র থেকে দেখা যাচ্ছে, মাঠপর্যায়ে বিপুল পরিমাণ কাজ বাকি থাকলেও প্রকল্পের আর্থিক অগ্রগতি প্রায় ৭০ শতাংশে পৌঁছে গেছে। পরিকল্পনা, সমন্বয় ও তদারকিতে ব্যর্থ হলেও অর্থ ব্যয়ের গতি থামেনি। প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই বলছেন, কাজ অসম্পন্ন রেখে প্রকল্প শেষ হলে সরকারি বিনিয়োগের সুষ্ঠু ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে এবং প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রকল্পের স্টিয়ারিং কমিটির সভায় প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগের সচিবের সভাপতিত্বে স্টিয়ারিং কমিটির সভায় বলা হয়, প্রকল্পটির আওতায় ৬ লাখ ৫০ হাজার মিটার আমদানি করা হয়েছে এবং এখন পর্যন্ত ২ লাখ ৪৫ হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি করা না হলে মজুদকৃত ৪ লাখ ৫ হাজার মিটার স্থাপন করা সম্ভব হবে না, এমনকি সেগুলো মিটার বিকল হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। অবশিষ্ট ৪ লাখ ৫ হাজার স্মার্ট মিটার স্থাপনের জন্য অন্তত ১ বছর মেয়াদ বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।
এ কারণে স্টিয়ারিং কমিটির সভা সিদ্ধান্ত হয়, আপাতত ব্যয় না বাড়িয়ে প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হবে। পরে ডলার বিনিময় হার বৃদ্ধিজনিত ব্যয় এবং কিছু চুক্তিমূল্য সমন্বয়ের জন্য আবার ডিপিপি সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেই হিসেবে ডিপিডিসির আওতাধীন এলাকায় আট লক্ষ পঞ্চাশ হাজার স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটার স্থাপন (বিশেষ সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পটির মেয়াদ আরও ১ বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় জেনে স্মার্ট মিটারের প্রকল্প পরিচালক শেখ মো. জিয়াউল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমি এখন ঢাকার বাইরে। আমার মা হাসপাতালে ভর্তি, সেখানে আছি। তাছাড়া এমডি ছাড়া সরাসরি কোনো মিডিয়ায় আমরা কোনো বক্তব্য দিতে পারি না। আপনি এমডির সঙ্গে যোগাযোগ করুন, তিনি আপনাকে বক্তব্য দেবেন। প্রয়োজনে এ বিষয়ে তিনি আমার কাছ থেকে জেনে নেবেন।
কথার এ পর্যায়ে অভিযোগের বিষয়টি তিনি জানতে চান। বিষয়টি জেনে তিনি বলেন, সরকার মনে করেছে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে সময় বাড়ানো দরকার, তাই সময় বাড়ানো হয়েছে। এটা তেমন কোনো সমস্যা নয়। ২০১৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত কোভিড ছিল। মিটার আসা শুরু করেছে ২০২২-২৩ সালে। এরপর এখন ২০২৫-২৬ চলছে, তেমন কোনো দেরি হয়নি। বাকি বিষয়ে আপনি এমডির সঙ্গে কথা বলুন।
বিশেষজ্ঞরাও সুফল নিয়ে শঙ্কায়
বিদ্যুৎ খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বারবার মেয়াদ বাড়ানো হলেও যদি মাঠপর্যায়ের বাস্তব সমস্যাগুলোর সমাধান না হয়, তাহলে গুদামে পড়ে থাকা এই লাখ লাখ স্মার্ট মিটারই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় বোঝা হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, পূর্ণাঙ্গ সিস্টেম প্রস্তুত না রেখেই মাঠপর্যায়ে যাওয়া ছিল প্রকল্প কর্তৃপক্ষের গুরুতর পেশাগত ব্যর্থতা। সরকারের উচ্চাভিলাষী স্মার্ট মিটার প্রকল্প এখন এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দৌড়াতে হচ্ছে। না হলে কোটি কোটি টাকার মিটার বসানো তো দূরের কথা, অচল সম্পদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিই সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হয়ে দেখা দেবে।
এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটা একটি ভয়াভয় দুর্নীতি। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডে (আরইবি) এমন দুর্নীতি ধরা পড়েছে। কয়েকটি কোম্পানি এসবের সুফলভোগী। এতে বড় ধরনের মাফিয়াচক্র জড়িত। এর সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে দুদকে মামলার মাধ্যমে শাস্তির আওতায় আনা দরকার। এটি একটি জাতীয় ক্ষতি। এ ক্ষতি তাদেরই পূরণ করতে হবে।