logo

খুলনায় ভারতীয় ‘পেনগান’ কেড়েছে ব্যবসায়ীর প্রাণ, জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা

খুলনায় ভারতীয় ‘পেনগান’ কেড়েছে ব্যবসায়ীর প্রাণ, জননিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা
পেনগান খুলে দেখানোর দৃশ্য (বাঁয়ে) ও পেনগান (ডানে)। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দেখে মনে হবে পিতলের তৈরি সৌখিন একটি কলম। অধিকাংশ সাধারণ কলমের মতোই সাড়ে ৫ ইঞ্চি দৈর্ঘ্য। বহন করা যায় খুব সহজে। শার্ট-প্যান্ট কিংবা পাঞ্জাবির পকেটে রাখা যাবে অনায়াসে। বহন করা যাবে ডায়েরি-প্যাডের ভাঁজেও। কেউ কিছু সন্দেহও করতে পারবে না। কিন্তু কলমসদৃশ বস্তুটির ভেতরে কালি নেই, রয়েছে সাক্ষাৎ মৃত্যু পরোয়ানা! কারণ কলমের মতো দেখতে হলেও এটি কলম নয়, ভয়ংকর এক মারণাস্ত্র।

পিতলের ক্যাপ আর স্টিলের বডির বস্তুটি মূলত সক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র। কলমের খোলসের ভেতরে রয়েছে বিশেষভাবে তৈরি বডি (ব্যারেল) ও ফায়ারিং পিন। স্প্রিং মেকানিজমের মাধ্যমে পিস্তলের মতো কাজ করে এটি। ব্যবহার করা হয় ৭ দশমিক ৬৫ কেএফ ব্র্যান্ডের বু‌লেট। একবারে একটি বুলেট ব্যবহার করা যায়। সেটি নিক্ষেপের সময় কোনো শব্দ হয় না। কলমের পিন চাপলেই নিঃশব্দে নীরব ঘাতকের মতো ছুটে আসে বুলেট, যা হতে পারে প্রাণঘাতী।

কলমের মতো হওয়ায় এ অস্ত্রের নাম হয়েছে ‘পেনগান‘! অস্ত্রটি ব্যবহার করাও খুবই সহজ। কলমের মতো খোলা যায় মাঝখান থেকে। এরপর ওপরের অংশে লোড করা হয় বুলেট। তারপর স্প্রিংযুক্ত লিভার টেনে ছেড়ে দিলেই ফায়ারিং পিন গিয়ে সজোরে আঘাত করে বুলেটের পেছনে। সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসে গুলি। 

পেনগান খুলে দেখানোর দৃশ্য

নাটক-সিনেমায় এমন কলমের দেখা হয়তো পেয়েছেন অনেকে- কিন্তু বাস্তবেই এ অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছে খুলনায়। গেল বছর জেলার ফুলতলা উপজেলায় খুন হন সুমন মোল্লা নামে এক ঘের ব্যবসায়ী। সেই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে গিয়েই ভয়ংকর পেনগানের তথ্য বেরিয়ে আসে। পরবর্তীতে ঘাতকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় একটি ধানক্ষেত থেকে পেনগানটি জব্দ করা হয়। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন, অস্ত্রটি ভারতে তৈরি করা। 

ধান ক্ষেতে পড়ে থাকা পেনগান

যেভাবে মিলল পেনগানের সন্ধান 

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২২ এপ্রিল ফুলতলার জামিরা বাজার থেকে বাড়ি ফিরছিলেন সুমন মোল্লা। পিপরাইল দাসপাড়া কালভার্টের কাছে তার গতি রোধ করে সন্ত্রাসীরা। তদন্তে উঠে আসে, সন্ত্রাসীরা ধ্বস্তাস্তি করতে করতেই সুমনের মুখের মধ্যে পেনগান ঢুকিয়ে লিভারে টান দিতেই বেরিয়ে আসে গুলি। মুহূর্তেই সুমনের মুখ ও গলার অংশ ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় সুমনের। 

পেনগানের গুলিতে নিহত সুমন মোল্লা

ঘটনার পরদিন (২৩ এপ্রিল) মোমিদ গাজী নামে  চিহ্নিত এক সন্ত্রাসীকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন সুমন মোল্লার বাবা রকিবুদ্দিন গাজী (মামলা নং-১৪, তারিখ ২৩ এপ্রিল ২০২৫)। মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখসহ আরও ৫-৬ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। এর ১০ দিন পর যশোর থেকে মোমিদ গাজীকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। রিমান্ডে পেনগানের তথ্য দেয় মোমিন। 

সুমন মোল্লা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ফুলতলা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো শরিফুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘মামলাটি আগে অন্য কর্মকর্তার কাছে ছিল। আমি গত মাসেই দায়িত্ব পেয়েছি। মামলার এক ও চার নম্বর আসামি কারাগারে। আগামী ১৭ ফেব্রুয়া‌রি নতুন করে তাদের রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য আছে। তাদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারলে অভিনব এই অস্ত্রের ব্যাপারে আরও তথ্য বের করা যাবে।‘

মামলা সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হওয়া যায়, এ ধরনের অস্ত্র বাংলাদেশে কোথাও তৈরি হয় না। তবে ভারতে এমন অস্ত্র ব্যবহারের উদাহরণ রয়েছে। সুমন হত্যা মামলায় জব্দ হওয়া অস্ত্রটি ভারত থেকে এসেছে বলে নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তকারীরা। 

এ বিষয়ে খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল হক এশিয়া পোস্টকে ব‌লেন, মামলা‌টির গুরুত্ব‌ বি‌বেচনায় ইন্স‌পেক্টর পদমর্যাদার একজন‌কে তদ‌ন্তের ভার দেওয়া হ‌য়ে‌ছে। এজাহারভুক্ত আসামিদের প্রায় সবাইকে গ্রেপ্তার ক‌রে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হ‌য়ে‌ছে। পেনগান‌টি নিয়ে কাজ চলমান র‌য়ে‌ছে। খুব শিগগিরই অস্ত্রটির ব‌্যা‌লি‌স্টিক রি‌পোর্ট হা‌তে পৌঁছাবে। তখন এই অস্ত্রের বিষ‌য়ে আরও বিস্তা‌রিত জান‌া‌নো যা‌বে।

খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল হক

জননিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ  

এদিকে পেনগানের মতো অচেনা এবং গোপন প্রাণঘাতী অস্ত্র সন্ত্রাসীদের হাতে চলে আসার বিষয়টি জননিরাপত্তার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।  এ বিষয়ে অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক এশিয়া পোস্টকে বলেন, কলমসদৃশ অস্ত্র ভয়াবহতা বাড়াবে। বাংলাদেশে এ ধরনের অস্ত্র তৈরি কিংবা ব্যবহার হওয়ার কথা নয়। এ ধরনের অস্ত্রগুলো টার্গেট কিলিং ও পরিকল্পিতভাবে ব্যবহার করা হয়। কন্ট্রাক্ট কিলিংয়ের জন্য এ ধরনের অস্ত্র অনেক সময় ভাড়া দেওয়া হয় বলে শুনেছি। এগুলো ব্যাপক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে ভয়াবহ অবস্থা দাঁড়াবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর  উচিত তদন্তের মাধ্যমে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা। 

অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল‍্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক