logo
Advertisement

খুলনা ওয়াসার প্রকল্পে ভুল নকশায় ব্যয় বাড়ছে ২৭০ কোটি টাকা

• ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকার প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা

• শুধু গৃহ সংযোগেই ব্যয় বাড়ছে ১৭০ কোটি ৪২ লাখ টাকা

• মেয়াদ বাড়ছে আরও দেড় বছর, শেষ হবে ২০২৭ সালের জুনে

এশিয়া পোস্ট স্পেশাল
খুলনা ওয়াসার প্রকল্পে ভুল নকশায় ব্যয় বাড়ছে ২৭০ কোটি টাকা
কোলাজ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ভুল নকশা আর অপরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়নের খেসারত দিতে হচ্ছে খুলনা মহানগরীর পয়ঃনিষ্কাশন প্রকল্পে। মূল ব্যয় ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ২ হাজার ৬০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ ব্যয় বাড়ছে ২৭০ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদও দেড় বছর বাড়িয়ে ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত করা হচ্ছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে খুলনা ওয়াসা। নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ করতে না পারায় নতুন করে দেড় বছর সময় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। ভুল পরিকল্পনা, নকশা পরিবর্তন আর দীর্ঘসূত্রতার কারণে এই বাড়তি ব্যয় ও সময়ের প্রয়োজন পড়ছে।

মেয়াদ শেষে সংশোধনী প্রস্তাব

খুলনা মহানগরীর পয়ঃনিষ্কাশন আধুনিকায়নে ২০২০ সালে শুরু হয় ‘খুলনা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প’। তখন ব্যয় ধরা হয় ২ হাজার ৩৩৪ কোটি টাকা। বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু ভুল পরিকল্পনার কারণে বাস্তবায়নের মাঝপথে নানা জটিলতা দেখা দেয়। ফলে মেয়াদ শেষে কাজ হয়েছে মাত্র ৭০ শতাংশ। বিপরীতে অর্থ ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রকল্প সংশোধনের উদ্যোগ নেয় খুলনা ওয়াসা। নকশা পরিবর্তন, কাজের পরিধি বৃদ্ধি, বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং ডলারের দর বৃদ্ধির খেসারত হিসেবে অনুমোদনের পাঁচ বছর পর এই উদ্যোগ নিতে হয় সংস্থাটিকে।

একনেকে অনুমোদন পেলে ২৭০ কোটি টাকা বাড়তি ব্যয়ে শেষ হবে প্রকল্পের কাজ। অর্থাৎ ভুল পরিকল্পনা আর অদূরদর্শী সিদ্ধান্তের খেসারত দিয়ে খুলনাবাসীকে আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন সেবা পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও প্রায় দেড় বছর।

প্রায় ১০ লাখ মানুষকে আধুনিক পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় এনে পরিবেশ দূষণ প্রশমন ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার লক্ষ্যে শুরু হয়েছিল এই প্রকল্প। উদ্দেশ্য ছিল একটি আধুনিক স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক স্থাপন। এর মাধ্যমে নিরাপদ ও পরিবেশসম্মত পয়ঃনিষ্কাশন নিশ্চিত করা, এ ক্ষেত্রে খুলনা ওয়াসার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো এবং এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি করা।

বাস্তবায়ন পর্যায়ে এসে দেখা যায়, প্রাথমিক সমীক্ষার অদূরদর্শিতা, গৃহসংযোগের কারিগরি জটিলতা এড়িয়ে যাওয়া এবং রাস্তা খননের ভুল হিসাব-নিকাশের কারণে মূল উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে না।

পরিকল্পনার ত্রুটি

মূল প্রকল্পে গৃহ সংযোগের জন্য বরাদ্দ ছিল মাত্র ৬০ কোটি টাকা। তখন পরিকল্পনা ছিল, ওয়াসা কেবল গ্রাহকের বাড়ির সীমানাপ্রাচীর পর্যন্ত সংযোগ দেবে। কিন্তু প্রধান স্যুয়ারেজ পাইপলাইনগুলো মাটির ৯ থেকে ১০ ফুট বা তারও বেশি গভীরে বসানোয় বাড়িওয়ালাদের পক্ষে নিজ খরচে লেভেল ঠিক রেখে সেপটিক ট্যাংক থেকে ম্যানহোল পর্যন্ত সংযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই পরিস্থিতিতে প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ভেস্তে যাওয়ার ঝুঁকি দেখা দেয়। ফলে গ্রাহকের বাড়ির ভেতরের প্লাম্বিং ও ইনস্পেকশন পিটের কাজ ওয়াসার নিজ দায়িত্বে করার সুপারিশ করা হয়।

এই নকশাগত ত্রুটি সারাতে সংযোগের লক্ষ্যমাত্রা ৩০ হাজার থেকে কমিয়ে ২৭ হাজারে নামানো হলেও গৃহ সংযোগ খাতে খরচ বেড়ে যায় ১৭০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ফলে শুধু এ খাতেই মোট বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৩০ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

সড়ক খননে দ্বিগুণ খরচ

রাস্তা কাটাকাটি ও পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রেও অদূরদর্শিতার প্রমাণ মিলেছে। মূল ডিপিপিতে রাস্তা খননের গড় প্রস্থ ১ মিটার ধরে ৫২ কিলোমিটারের জন্য বরাদ্দ রাখা হয় ৭৮ কোটি টাকা। কিন্তু বাস্তবে পাইপ বসাতে গিয়ে খননের গড় প্রস্থ দাঁড়ায় ২ মিটার।

শুরুতে খুলনা সিটি করপোরেশন রাস্তা কাটার ক্ষতিপূরণ বাবদ ৬৪১ কোটি টাকা দাবি করলেও ওয়াসা নিজেই রাস্তা মেরামতের দায়িত্ব নেয়। পাইপলাইনের দৈর্ঘ্য বাড়িয়ে ২৫৫ কিলোমিটার করা এবং খননের প্রস্থ দ্বিগুণ হওয়ায় রাস্তা মেরামত খাতে অতিরিক্ত ২০৪ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ২৮২ কোটি টাকা চাওয়া হয়।

নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় প্রকল্পের মূলধনী খাতে খরচ বেড়েছে অতিরিক্ত হারে। পাইপলাইন নেটওয়ার্ক ও শোধনাগার নির্মাণেও ব্যয় বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

খুলনা মহানগরীকে ১০টি পয়েন্টে ভাগ করে অগ্রাধিকারভিত্তিতে ছয়টি এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা দেওয়ার কথা। তবে মূল প্রাক্কলনে ভুল ও কাজে দীর্ঘসূত্রতার কারণে প্রায় প্রতিটি খাতেই বাড়ছে খরচের বোঝা।

টাকার অবমূল্যায়ন ও অন্যান্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধি

প্রকল্পের রূপরেখা তৈরির সময় ২০২০ সালে ডলারের বিনিময় হার ছিল ৮৫ টাকা, যা সংশোধিত ডিপিপি তৈরির সময় গিয়ে ঠেকেছে ১২২ টাকায়। উন্নয়ন সহযোগী এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণের পরিমাণ ১৬০ মিলিয়ন ডলার এখনও অপরিবর্তিত রয়েছে। তবে টাকায় রূপান্তরের সময় শুধু মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণেই অতিরিক্ত লাগছে ১৪৮ কোটি ৫৬ লাখ ৭১ হাজার টাকা। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে এই অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন হতো না। অর্থাৎ বাস্তবায়ন অদক্ষতার কারণে রাষ্ট্রকে এই বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

স্যুয়ারেজ পাইপলাইন নেটওয়ার্ক নির্মাণ ১৭৩ কিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে ২৫৫ কিলোমিটার করায় এ খাতে খরচ বাড়ছে ২৫০ কোটি টাকা। ২৮ এমএলডি ও ৫২ এমএলডি ক্ষমতার দুটি পয়ঃশোধনাগার নির্মাণে খরচ বাড়ছে ১১২ কোটি টাকা।

৭৭ কিলোমিটারের সার্ভিস লাইন বাড়িয়ে ৮১ কিলোমিটার করায় খরচ বাড়ছে প্রায় ৩৫ কোটি টাকা। আটটি পাম্পিং স্টেশনের জায়গায় ছয়টি পুনর্নির্ধারণ করা হলেও খরচ বাড়ছে ৩৭ কোটি টাকা। পয়ঃনিষ্কাশন সরঞ্জাম কেনায় বরাদ্দ ৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৩ কোটি টাকা।

প্রকল্পের মেয়াদ দেড় বছর বাড়ানোর প্রস্তাব করায় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তাদের পেছনেও খরচ বাড়ছে। ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড সুপারভিশন কনসালটেন্সি খাতে বাড়ছে ৫ কোটি টাকা। ইনস্টিটিউশনাল অ্যান্ড ডিজাইন কনসালটেন্সি খাতে বাড়ছে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি টাকা। প্রকল্প কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা বাড়ছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। নির্মাণকালীন সুদ বাড়ছে ৩৫ কোটি টাকা।

প্রাথমিক হিসাবে বিভিন্ন খাতে মোট ব্যয় প্রায় ৮০৫ কোটি টাকা বেড়েছে। তবে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাত বাদ দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে কিছু কাজের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। এসব কারণে ৫৩৫ কোটি টাকা সমন্বয় দেখানো হয়েছে। কিছু খাতে খরচ কমানো ও কাজের পরিধি সমন্বয়ের ফলে চূড়ান্তভাবে ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে ২৭০ কোটি টাকা।

প্রকল্প সংশোধনের কারণ হিসেবে খুলনা ওয়াসা বলছে, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি ও কাজের পরিধি বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া কোভিড-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে নির্মাণসামগ্রীর দাম ২০ থেকে ২৫ শতাংশ বেড়ে যাওয়ায় বিভিন্ন খাতে ব্যয় বেড়েছে। বিপরীতে কিছু খাতের কাজ কমানো হয়েছে এবং কিছু খাত একেবারে বাদ দেওয়া হয়েছে। সবকিছু সমন্বয় করেই প্রকল্প সংশোধনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

অনুমোদন প্রক্রিয়া

২০২৫ সালের ৯ নভেম্বর খুলনা ওয়াসার ‘খুলনা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প’ শীর্ষক প্রকল্পের সংশোধনী প্রস্তাব (আরডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। এরপর ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় কয়েকটি সিদ্ধান্ত পরিপালন সাপেক্ষে সংশোধিত প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়। তার ভিত্তিতে বিভিন্ন সংশোধনী শেষে গত ২৬ জুলাই পুনর্গঠিত আরডিপিপি চূড়ান্তভাবে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্পটি আগামী একনেক সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

একনেকে অনুমোদনের সুপারিশে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে যথাযথ পরিশোধন ব্যবস্থাসহ একটি আধুনিক স্যুয়ারেজ নেটওয়ার্ক তৈরি হবে। এতে নগরীর পরিবেশ দূষণ প্রতিরোধ ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা করা সম্ভব হবে।

নকশার ত্রুটি স্বীকার প্রকল্প পরিচালকের

প্রকল্পের প্রাথমিক নকশায় ভুল ও অদূরদর্শিতার কথা স্বীকার করেছেন খুলনা ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খান সেলিম আহমেদ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রকল্প শুরুর সময় ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) প্রণয়নকারীরা বিষয়টি সঠিকভাবে অনুধাবন করতে পারেননি। তারা ভেবেছিলেন গ্যাস বা পানির মতো স্যুয়ারেজ লাইনও বাড়ির সামনে গেলে বাকিটা গ্রাহকরা নিজ উদ্যোগে টেনে নিয়ে যাবেন। কিন্তু স্যুয়ারেজ ব্যবস্থার বিষয়টি আলাদা। এটা এভাবে কাজ করে না। এই বিষয়টি সামনে আসার পর প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।’

প্রস্তাবিত বর্ধিত সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শতভাগ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী খান সেলিম আহমেদ। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের মূল কাজগুলো ইতোমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে মূলত বাসা-বাড়িতে সংযোগ দেওয়ার কাজ বাকি। আশা করি, প্রস্তাবিত বর্ধিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে পারব।’