বিএনপিতে মেয়র প্রার্থী হিসেবে সোহেল-তাবিথ এগিয়ে

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন শেষ না হতেই শুরু হয়ে গেছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকেন্দ্রিক তোড়জোড়। বিশেষ করে সিটি করপোরেশন নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোতে চলছে নানা সমীকরণ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে কাকে প্রার্থী করা হবে, তা নিয়ে প্রকাশ্যে এবং দলীয় ফোরামে নানামুখী বিশ্লেষণ করছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
অন্যদিকে বিএনপি এ বিষয়ে দলের নেতাকর্মীদের এখনও কোনো নির্দেশনা না দিলেও ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটিতে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে তৎপরতা শুরু করেছেন একাধিক নেতা।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, সিটি নির্বাচনের তপশিল ঘোষণার পর দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দলীয় অবদান ও আনুগত্যের পাশাপাশি নাগরিক সেবা কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতা, নগরবাসীর মাঝে গ্রহণযোগ্যতা এবং মাঠের রাজনৈতিক অবস্থানসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হবে।
দলীয় সূত্র বলছে, ঢাকা দক্ষিণের মেয়র প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালাম থেকে শুরু করে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও ঢাকা মহানগরের একাধিক নেতা। এ ছাড়া সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে ঢাকা দক্ষিণে বিএনপির প্রার্থী ইশরাক হোসেন এবারও মেয়র পদে লড়বেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে দলীয় সূত্র বলছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে আলোচিত প্রার্থীদের মধ্যে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল।
অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে এবারও আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন আগে দুইবার দলের মনোনয়ন পাওয়া তাবিথ আউয়াল। তবে মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে এবার ঢাকা উত্তরে শক্ত অবস্থানে রয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের কাছে পরাজিত বিএনপির ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুম এবং জামায়াত আমিরের আসনে বিএনপির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন। তাদের মধ্যে মিল্টন গেল সপ্তাহে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক পদে নিয়োগ পেয়েছেন।
দক্ষিণে আলোচনায় সোহেল
ডিএসসিসি নির্বাচনে সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল। দীর্ঘ সময় ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা এ নেতার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে ছয় শতাধিক মামলা হয়েছে। আন্দোলনমুখর সময়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলেরও নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, বিগত দিনে যেসব নেতারা আন্দোলন-সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছেন, তাদের নানাভাবে মূল্যায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাদের মধ্যে অনেকে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। সোহেল সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর ত্যাগী নেতাদের অনেককে মন্ত্রিপরিষদ, উপদেষ্টা পরিষদসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সেখানেও ঠাঁই হয়নি সোহেলের। তবে অপ্রাপ্তির আক্ষেপে নিজেকে আড়াল না করে হাসিমুখে দলীয় সকল নির্দেশনা ও কর্মসূচি বাস্তবায়নে তৎপর রয়েছেন হাবিব উন নবী সোহেল। বিষয়টি নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে চলছে নানা আলোচনা।
নেতাকর্মীরা বলছেন, হাবিন উন নবী সোহেলকে মূল্যায়ন এখন সময়ের দাবি। সেই প্রেক্ষিতেই সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে সোহেল মনোনয়ন পেতে পারেন বলে আলোচনা জোরাল হয়ে উঠেছে।
তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিব উন নবী খান সোহেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দল যাকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে, তিনিই নির্বাচন করবেন। দল চাইলে আমি অংশগ্রহণ করব।’
দক্ষিণ সিটিতে মেয়র পদে হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন বর্তমান প্রশাসক ও বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আবদুস সালাম। তিনিও এর আগে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির নেতৃত্ব দিয়েছেন। গত নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন এই বীর মুক্তিযোদ্ধা। মনোনয়ন পেলে মেয়র পদে নির্বাচন করতে আগ্রহী তিনি নিজেও।
এশিয়া পোস্টকে আব্দুস সালাম বলেন, ‘দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি নির্বাচন করব। অতীতে ভারপ্রাপ্ত মেয়র হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, নাগরিক সেবায় সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে চাই।’
ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে এবারও আলোচনায় রয়েছেন ইশরাক হোসেন। ২০২০ সালে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঢাকা দক্ষিণে মেয়র পদে প্রার্থী হয়ে পরাজিত হন তিনি। তবে ২০২৫ সালে এসে আদালত সেই নির্বাচনের ফল বাতিল করে ইশরাককে বিজয়ী ঘোষণা করেন। যদিও অন্তর্বর্তী সরকার এ রায়ের পরও ইশরাককে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়নি।
এবার সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ইশরাক। তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় মুক্তিযুদ্ধ প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও নিয়োগ পেয়েছেন অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিএনপির দাপুটে নেতা সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক। কিন্তু সিটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা শুরুর পর ফেসবুক পোস্টে ঘোষণা দিয়ে ইশরাক জানান, ঢাকা দক্ষিণে তিনি মেয়র পদে প্রার্থী হবেন।
ইশরাকের এ ঘোষণা নিয়ে বিএনপিতে চলছে নানা গুঞ্জন। দলের সিগনাল পেয়ে তিনি এমন ঘোষণা দিয়েছেন, নাকি নিজের মর্জিতে—সে তথ্য এখনও অজানা। তবে সদ্য মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়া ইশরাক মেয়র পদে বিবেচনায় থাকবেন কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এর বাইরে ঢাকা দক্ষিণ বিএনপির সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিনও মেয়র পদপ্রার্থী তালিকায় রয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৪ আসনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েও জামায়াতের প্রার্থীর কাছে মাত্র ৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন তিনি।
উত্তরে এবারও তাবিথ!
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়র পদপ্রার্থী হিসেবে অন্যদের চেয়ে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি তাবিথ আউয়াল। এর আগে টানা দুটি সিটি নির্বাচনে তাকে মেয়র প্রার্থী করেছিল বিএনপি। এবার মনোনয়ন পেলে আগের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠে ভালো ফলাফল নিয়ে আসবেন তাবিথ—এমনটাই বলছেন তার অনুসারীরা।
এদিকে তাবিথ আউয়ালের বাবা বিশিষ্ট শিল্পপতি আবদুল আউয়াল মিন্টু এবারের নির্বাচনে ফেনী-৩ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে প্রথমবারের মতো মন্ত্রীও হয়েছেন। তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় তিনি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। একই পরিবার থেকে দুজনকে গুরুত্বপূর্ণ দুটি পদে সুযোগ পাবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে অনেকের।
এ বিষয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে আলাপকালে তাবিথ আউয়াল জানান, দলীয় মনোনয়ন পেলে তিনি নির্বাচন করবেন এবং ঢাকার জন্য নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগ্রহ রয়েছে তার।
তাবিথ আউয়াল ছাড়াও ঢাকা উত্তরের মেয়র পদে আলোচনা রয়েছেন বিএনপির ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুম এবং যুবদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক (ডিএনসিসির বর্তমান প্রশাসক) শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
যেসব প্রার্থী চান দলের নেতাকর্মীরা
বিএনপির ঢাকা মহানগরের নেতাকর্মীরা বলছেন, দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় এবং এলাকায় গ্রহণযোগ্য প্রার্থীদের মেয়র পদে মনোনয়ন দেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে রাজধানীবাসীর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ও ত্যাগী নেতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের একাধিক নেতা।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দক্ষিণে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং উত্তরে তাবিথ আওয়ালের নামই সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘দলীয় ফোরামে এখনও সিটি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়নি। তপশিল ঘোষণার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলীয় ফোরামে আলোচনা করে প্রার্থী নির্ধারণ করবেন। অতীতের ত্যাগ এবং এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে যার নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে—এমন যোগ্য প্রার্থীদেরই বেছে নেওয়া হবে।’
ঢাকায় সিটি নির্বাচন কবে, কীভাবে
ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের জন্য এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি। বেশির ভাগ সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের সময় সমাগত। তবে বিএনপি সরকার গঠনের পরপর ছয় সিটিতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ায় নির্বাচন সহসা হচ্ছে না বলেও মনে করছেন অনেকে।
তবে বিএনপি মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে বলেন, সিটি করপোরেশনগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পর্যায়ক্রমে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ ক্ষেত্রে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত সংসদে নেওয়া হবে।
সুনির্দিষ্টভাবে দিনকাল ঘোষণা না করলেও রোববার (১ মার্চ) এক অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাসউদ জানিয়েছেন, বছরজুড়ে বা বছরের বেশির ভাগ সময়জুড়ে বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিনি মনে করেন, রমজানের পরপরই স্থানীয় সরকারের সিটি করপোরেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে কি না জানতে চাইলে ইসি মাসউদ জানান, স্থানীয় সরকার পর্যায়ে দলীয় প্রতীক থাকবে কি না, সে বিষয়ে সংসদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকবেন তারা।