logo
Advertisement

ফুটপাত থেকে ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে ২ দিন পর ‘অস্ত্র-গুলিসহ’ আটক দেখাল পুলিশ

• মিরপুর ১ নম্বর থেকে সাদা পোশাকে তুলে নেওয়া হয় ব্যবসায়ী শামীম খানকে

• এজাহারে দেখানো হয়, বেড়িবাঁধ এলাকা থেকে অস্ত্রসহ হাতেনাতে আটক

• পুলিশের এজাহারের সঙ্গে মিলছে না সিসি ক্যামেরার ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য

ফুটপাত থেকে ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে ২ দিন পর ‘অস্ত্র-গুলিসহ’ আটক দেখাল পুলিশ
ব্যবসায়ী শামীম খান (বাঁয়ে)। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে ঘিরে ধরার দৃশ্য, ইনসেটে তুলে নেওয়ার মুহূর্ত। ছবি: এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের ইউসিবি ব্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন বালু ব্যবসায়ী মো. শামীম খান। গত ২৬ আগস্ট রাত ৮টা ২৩ মিনিটে সাদা পোশাকে সেখান থেকে মোটরসাইকেলে তুলে নেওয়া হয় তাকে। তবে পুলিশের এজাহারে দেখানো হয়, এর দুদিন পর ২৮ আগস্ট ভোরে অস্ত্রসহ আটক করা হয়েছে শামীম খানকে।

Advertisement

শাহ আলী থানায় দায়ের করা মামলার বাদী ডিবির (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) এসআই এ কে এম নিয়াজউদ্দিন মোল্লা। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেছেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ২৮ আগস্ট ভোর ৫টা ১০ মিনিটে শাহ আলী থানার দিয়াবাড়ী বেড়িবাঁধের বাঁশপট্টি এলাকা থেকে শামীম খানকে আটক করা হয়। এ সময় তার কাছ থেকে একটি পিস্তল, দুই রাউন্ড গুলি ও একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়।

কিন্তু এশিয়া পোস্টের হাতে আসা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের দেওয়া তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। এ ছাড়া মাঝের দুই দিন শামীম খান কোথায় ছিলেন, তার কোনো ব্যাখ্যা এজাহারে নেই।

শামীম খানকে আটক দেখানোর পর তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড আবেদনের পাশাপাশি জামিন না দিয়ে জেলহাজতে পাঠানোরও আবেদন করে পুলিশ। ২৯ আগস্ট তাকে জেলহাজতে পাঠানো হয়। ৩ সেপ্টেম্বর পুনরায় আদালতে তোলা হলে পুলিশ ১১ দিনের রিমান্ড আবেদন করে। তথ্য-প্রমাণ বিবেচনায় নিয়ে আদালত জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন।

সিসিটিভি ফুটেজে ব্যবসায়ী শামীম খানকে ঘিরে ধরার দৃশ্য। ২৬ আগস্ট রাত ৮টা ২৩ মিনিটে মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে। ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া
সিসিটিভি ফুটেজে ব্যবসায়ী শামীম খানকে ঘিরে ধরার দৃশ্য। ২৬ আগস্ট রাত ৮টা ২৩ মিনিটে মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে। ছবি: সিসিটিভি ফুটেজ থেকে নেওয়া

ফুটেজে দেখা যায়, সাদা পাঞ্জাবি ও পায়জামা পরা মো. শামীম খান ফুটপাত দিয়ে হেঁটে একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় একটি মোটরসাইকেলে করে একজন ব্যক্তি সেখানে আসেন। মোটরসাইকেল রেখে আগে থেকে অবস্থান করা আরও তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে তিনি শামীম খানের কাছে যান। কিছুক্ষণ কথা বলার পর তাকে মোটরসাইকেলের মাঝখানে তুলে রাত ৮টা ২৫ মিনিটে সেখান থেকে চলে যান তারা। এই সময়ের মধ্যে তাকে কোনো ধরনের তল্লাশি চালাতে দেখা যায়নি।

যা বলছেন ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা

শামীম খানের স্ত্রী আরবী সুলতানা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘২৬ আগস্ট বিকেল ৩টার দিকে শামীম বাসা থেকে বের হন। সন্ধ্যায়ও তার সঙ্গে আমার স্বাভাবিক কথা হয়। কিন্তু রাত ১০টার দিকে এক পরিচিত ব্যক্তি এসে জানান, শামীমকে ডিবি পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শোনার পর আমি দারুস সালাম থানা, মিরপুর থানা, শাহ আলী থানা এবং ডিবি কার্যালয়ে খোঁজ নেই। কিন্তু সব জায়গা থেকে জানানো হয়, এই নামের কেউ তাদের হেফাজতে নেই।’

আরবী সুলতানা বলেন, ‘২৭ আগস্ট সকালে আমি দারুস সালাম থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে গেলে পুলিশ তা গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। একপর্যায়ে যখন জানতে পারি তাকে তুলে নিয়ে গেছে তখন আমি অপহরণ মামলা করার সিদ্ধান্ত নেই। ২৮ আগস্ট সকালে যখন মামলা করতে যাই তখন ওসি নেই, এই অজুহাত দিয়ে মামলা নেওয়া হয়নি। তবে ২৮ আগস্ট আসরের দিকে ডিবির একজনের এসআইয়ের ফোন থেকে আমার স্বামী কল দিয়ে জানান, তিনি ডিবিতে আছেন। এর আগে ডিবিতে কয়েকবার গেলেও তারা বলেছে, তাদের কাছে নেই।’

শামীম খানের বোন সাহিদা আফরিন দোলা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার ভাইকে বেড়িবাঁধ বাশপট্টি থেকে নয়, বরং ২৬ আগস্ট মিরপুর ১ নম্বরের ইউসিবি ব্যাংকের সামনে থেকে তুলে নেওয়া হয়েছে। এজাহারে গ্রেপ্তারের তারিখ ২৮ আগস্ট ভোর ৫টা ১০ মিনিট দেওয়া হয়েছে। মাঝখানের এই দুদিন আমার ভাই কোথায় ছিলেন? তাকে গুম বা হত্যা করার কোনো চেষ্টা করা হয়েছিল কি না?’

তিনি বলেন, ‘পুলিশ দাবি করেছে ভাই তাদের দেখে দৌড় দিয়েছেন। কিন্তু ফুটেজে তাকে স্বাভাবিকভাবে হেঁটে আসতে দেখা গেছে। সেখানে তার ওপর কোনো তল্লাশিও চালানো হয়নি। এজাহারে ভুয়া সাক্ষীদের নাম বসিয়ে তল্লাশি ও অস্ত্র উদ্ধারের যে দাবি করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ মিথ্যা। আমার ভাই একজন ভালো ব্যবসায়ী ও নিরীহ মানুষ। আমরা তার নিঃশর্ত মুক্তি চাই। এই ঘটনার পেছনে জড়িত প্রশাসনিক অসাধু কর্মকর্তাদের সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।’

প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য

সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা একজন নিরাপত্তাকর্মী বলেন, ‘২৬ আগস্ট রাত আনুমানিক ৮টা ২০ থেকে ২৫ এর দিকে মিরপুর ১ নম্বর দারুস সালাম রোডের ইউসিবি ব্যাংকের সামনে শামীম তার পরিচিত এক দোকানদারের সঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এমন সময় কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই হঠাৎ চারজন লোক এসে পেছন দিক থেকে তার দুই হাত চেপে ধরে। শামীম তখন তাদেরকে কোথাও বসে কথা বলার অনুরোধ করলেও তারা এতে রাজি হয়নি এবং তাকে জোর করে টেনে নিয়ে গিয়ে মোটরসাইকেলে তুলে দ্রুত চলে যায়। পুরো ঘটনাটি ঘটতে দুই থেকে তিন মিনিট সময় লেগেছিল। আমার সামনেই শামীমকে তারা নিয়ে যায়। কোনো তল্লাশি করা ছাড়াই। সে সময় তার হাতে বাজারের ব্যাগে শাকসবজি ছাড়া অন্য কোনো কিছু ছিল না।’

প্রত্যক্ষদর্শী দোকানদার বলেন, ‘২৬ আগস্ট রাতে শামীম ভাই আমার দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে বলছিলেন, আমি নামাজ কেন পড়ি না। ঠিক এমন সময় হঠাৎ সাধারণ পোশাকের কয়েকজন লোক এসে তার দুই পাশ থেকে জাপটে ধরে। শামীম ভাইয়ের ইশারায় আমি এগিয়ে গিয়ে তাদের পরিচয় জানতে চাইলে তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। নিজেদের ‘ডিফেন্সের লোক’ পরিচয় দিয়ে কোমর থেকে কারেন্টের শটের মতো একটি লাঠি (বৈদ্যুতিক শক দেওয়ার লাঠি) বের করে ভয় দেখায়। আমি ভয় পেয়ে পেছনে আসি।’

তিনি জানান, ‘এর মধ্যে আরও ৩-৪ জন লোক এসে জড়ো হলে শামীম ভাই তাদের কাছে ওয়ারেন্টের কাগজ দেখতে চান এবং বসে কথা বলার কথা বলেন। কিন্তু তারা কোনো কথা না শুনে তাকে মেইন রোডের দিকে টেনে নিয়ে যায়। সেখান থেকে অন্য এক লোকের নির্দেশে মোটরসাইকেলে তুলে দ্রুত চলে যায়। ঘটনার সময় কোনো দৌড়াদৌড়ির ঘটনা ঘটেনি। সেখানে উপস্থিত ১০-১২ জন কাস্টমার ছিল, কেউই কোনো পিস্তল দেখেনি, কোনো তল্লাশিও চালানো হয়নি।’

এজাহারে বলা হয়েছে, শামীম খানকে বেড়িবাঁধ এলাকার বাশপট্টির উল্টো পাশে আলাইনা মটর্স-সংলগ্ন রাস্তার ওপর থেকে আটক করা হয়। আলাইনা মটর্সের পাশের এক দোকানদারের সঙ্গে কথা হয় এশিয়া পোস্টের। তিনি বলেন, ‘আলাইনা মটর্স দোকানটি প্রায় সাত-আট মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। আমার এই পাশে একটা টায়ারের দোকান আছে। এখানে ডিবি পুলিশ কাউকে ধরেছে, কোনো অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে, এমন কিছুই আমি জানি না। এখানে এই ধরনের কোনো ঘটনাই ঘটেনি।’

স্থানীয় বাসিন্দা বাবুল বলেন, ‘আমরা এখানে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছি এবং এখানেই কাজ করি। ২৮ তারিখ এই এলাকাতেই ছিলাম। আমার বাসার নিচে যদি এত বড় একটা ঘটনা ঘটত, আমি ঘুমিয়ে থাকি বা জেগেই থাকি, এলাকার কোনো না কোনো মানুষ তো অবশ্যই দেখত এবং আমরাও জানতে পারতাম। অথচ আজ আপনাদের মুখ থেকেই আমি প্রথম এই ঘটনার কথা শুনলাম। এখানে এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি।’

পুলিশের বক্তব্য

ঘটনার বিষয়ে জানতে মামলার বাদী এসআই এ কে এম নিয়াজউদ্দিন মোল্লাকে ফোন করা হলে তিনি এ ব্যাপারে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। তবে ডিবির মিরপুর জোনাল টিমের উপপুলিশ কমিশনার (ডিসি) রাকিব খান ২৬ আগস্ট শামীম খানকে গ্রেপ্তারের কথা সরাসরি নাকচ করে দেন।

রাকিব খান বলেন, ‘প্রথমে তাকে কেবল কথাবার্তা বলার জন্য ডাকা হয়েছিল। সে সময় (২৬ আগস্ট) তার কাছে আপত্তিকর কিছু না পাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া হয়। তবে পুলিশ তার ওপর কড়া নজরদারি বজায় রেখেছিল। পরবর্তীতে যখন তার কাছ থেকে অস্ত্র পাওয়া যায়, ঠিক তখনই তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।’

পরিবারের সদস্যদের দাবি, ওই ঘটনার পর থেকেই শামীম খান আটক ছিলেন এবং তাদের সঙ্গে তার সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। তবে রাকিব খানের দাবি, সাংবাদিকদের কাছে ঘটনাটি ভুলভাবে ব্যাখা করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের জানামতে শামিম খান ওই এলাকার একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে কাজ করছে। পুলিশ যদি সেদিনই তাকে গ্রেপ্তার করত, তবে তা নথিবদ্ধ করা হতো। আইন এখন অত্যন্ত কঠোর এবং পুলিশ চাইলেই কাউকে বেশিক্ষণ থানায় আটকে রাখতে পারে না। কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ বা অবৈধ কিছু না পাওয়া পর্যন্ত কাউকে থানায় বসিয়ে রাখার সুযোগ পুলিশের নেই। তবে সন্দেহভাজনের ওপর নজরদারি বজায় রাখা হয় এবং প্রমাণ পাওয়া মাত্রই আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ নেওয়া হয়।’