কৃষকের জমি দখল করে প্রাচীর দিয়েছে ব্র্যাক

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার মশুরী গ্রামে স্থানীয় কৃষকদের জমি ঘিরে সীমানাপ্রাচীর তুলেছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। প্রাচীরের কারণে নিজেদের জমিতে ঢুকতে পারছেন না তারা। ফলে বন্ধ হয়ে গেছে চাষাবাদের স্বপ্ন।
এই সমস্যার সূত্রপাত রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের মশুরী মৌজায় আরএস ১৬০ ও ১৬১ দাগের ১১৫ শতাংশ জমি নিয়ে। এই জমির বৈধ মালিক নিত্যনন্দ সরকার, বিনন্দ সরকার, নরেন্দ সরকার, সত্যরঞ্জন সরকার, মনোরঞ্জন সরকার ও রাধানাথ সরকার।
তাদের বক্তব্য, বাপ-দাদার আমল থেকে পৈতৃক সূত্রে তারা এই জমির মালিক। দলিল আছে, নিয়মিত খাজনা দেন। বছরের পর বছর ধরে এখানে চাষাবাদ করছেন। কিন্তু তাদের কাছ থেকে বৈধ প্রক্রিয়ায় জমি না কিনেই সীমানাপ্রাচীর তুলে দিয়েছে ব্র্যাক। ফলে নিজেদের জমিতেই আর যেতে পারছেন না তারা।
পার্শ্ববর্তী আরও কয়েকজন কৃষক এবং একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যের জমিও চলে গেছে ব্র্যাকের সীমানার ভেতরে। শুধু ব্যক্তিগত জমি নয়; মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানার জমিও প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়েছে। যদিও ব্র্যাকের দাবি, সবকিছু আইন মেনে হয়েছে।
নিজের জমিতে প্রবেশে বাধা
স্থানীয় জমির মালিকদের অভিযোগ, বিভিন্ন মৌজায় তাদের মালিকানাধীন কয়েকশ বিঘা জমি দখল করে বাউন্ডারি দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এতে নিজেদের জমিতে প্রবেশ ও ভোগদখল নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।
দখলি জমির পাহারায় রাখা হয়েছে নিরাপত্তাপ্রহরী। সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করে ফটক বাইরে দিয়ে তালাবদ্ধ করে রাখায় মূল মালিকরা তাদের জমিতে যেতে পারছেন না।

এই এলাকায় তপন সরকারের ৪০ শতাংশ জমি রয়েছে। জমিতে কাজ করতে গেলে বাধার সম্মুখীন হওয়ার কথা জানান তিনি। তার ভাষায়, ‘আমার এখানে জমি আছে ৪০ শতাংশ। আমরা যখন কাজ করমু তখন আমগো বাধা দিছে। আমরা আবার কাজ করতে গেছি। তারা বাধা দিছে। পরে তারা ওয়াল করতে গেছে, আবার আমরা বাধা দিছি। হেরে কয় মানে না।’
তপন সরকার জানান, প্রাচীর তুলে ব্র্যাক এই জায়গার দখল নিয়েছে। বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও তাদের নিবৃত্ত করা যায়নি।
ব্র্যাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে স্থানীয় আরেক ভুক্তভোগী বলেন, ‘এখন তো আমরা কাম করি না হল (দেয়াল) দিয়া দিছে। কাজ কি করমু খিলা দখল কলা দিয়ে নিতা।’
বাদ যায়নি মসজিদ-মাদ্রাসার জমিও
স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানান, মসজিদ-মাদ্রাসার জমিও দখলে নিয়েছে ব্র্যাক। তিনি বলেন, ‘এই জায়গাটা আমরা লিজ দিতাম। যে টাকা আসত সেটা দিয়ে মসজিদ-মাদ্রাসা চালাতাম।’
ব্র্যাক সীমানাপ্রাচীর দেওয়া শুরু করলে স্থানীয় মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মো. বিলাল প্রাচীর না দেওয়ার অনুরোধ করেন। তখন কিছু জায়গা খালি রাখা হলেও পরে পুরো জায়গা প্রাচীর দিয়ে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়। ফলে মসজিদ-মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষও আর সেখানে প্রবেশ করতে পারছে না। এতে করে প্রতিষ্ঠান চালাতে আর্থিক সংকটের মুখে পড়ার কথা জানান শফিকুল ইসলাম। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এ নিয়ে ব্র্যাকের সঙ্গে যোগাযোগের অনেক চেষ্টা করলেও কোনো সাড়া মেলেনি বলে জানান তিনি।
থানায় নেওয়া হয় না অভিযোগ
ভুক্তভোগী জমির মালিকরা বলছেন, প্রতিকার চেয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গেলেও অভিযোগ নেয় না থানা পুলিশ। এমনকি কেউ নিজেদের জমিতে যেতে চাইলে পুলিশ দিয়ে উল্টো তাদের হয়রানি করা হয়।
ভুক্তভোগীদের একজন মেহেদী হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ব্র্যাকের প্রাচীরের ভেতরে আমার ১১ শতাংশ জমি। ইচ্ছে করলেও জমিতে যেতে পারছি না। প্রতিকার চাইতে থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে গিয়েছিলাম, কিন্তু সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্য হয়েও প্রতিকার পাইনি। ব্র্যাকের টাকা আছে, প্রভাব আছে। আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের কিছুই নেই।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে রূপগঞ্জ থানার ওসি এ. আইচ. এম সালাউদ্দিন বলেন, ‘আমার জানামতে এমন কোনো বিষয়ে কেউ অভিযোগ করতে আসেনি।’
রেজিস্ট্রিতে কমিশন বাণিজ্য
রূপগঞ্জের ২৫৫ নম্বর দাগে ১০ শতাংশের বেশি জমির মালিক স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তার হোসেনের। তিনি বলেন, ‘নিজের জমিতে চাষাবাদ করতে গেলেও বাধা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি শাকসবজি লাগানোর পরদিনই তা তুলে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে।’
কারা এসব করছে? এমন প্রশ্নের জবাবে মুক্তার হোসেন বলেন, ‘ব্র্যাকের লোকজন।’
জমি দখল ও রেজিস্ট্রিতে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ করেন মুক্তার হোসেন। জমি নিয়ে ব্র্যাকের সঙ্গে কোনো আর্থিক সমঝোতা হয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ব্র্যাকের সঙ্গে সরাসরি কোনো লেনদেন হয়নি। তবে তাদের কাছে জমি রেজিস্ট্রি করে দিতে গেলে শতাংশপ্রতি দেড় লাখ টাকা করে কমিশন দিতে হয়। ইমরান নামে ব্র্যাকের একজন কর্মকর্তা এ ধরনের লেনদেনের সঙ্গে জড়িত। এ ছাড়া স্বপন নামের এক ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেন। যদিও তার সঙ্গে ব্র্যাকের সরাসরি কোনও সম্পৃক্ততা নেই।
মুক্তার হোসেন বলেন, সম্প্রতি বাধ্য হয়ে তিনি সাড়ে ১০ শতাংশ জমির একটি অংশ রেজিস্ট্রি করেছেন। ওই জমির খাজনা কাটা ছিল না। ইমরানের মাধ্যমে জমিটি রেজিস্ট্রি হয়। রেজিস্ট্রির সময় শতাংশপ্রতি দেড় লাখ টাকা করে কমিশন নেন ইমরান।
বিষয়টি নিয়ে এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। কিছু জানার থাকলে ব্র্যাকের জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
আরও যেসব এলাকায় দখলের থাবা
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিংরাম মৌজায় আরএস ৯৭ দাগে স্থানীয়দের আরও ১৫০ শতাংশ জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে ব্র্যাকের বিরুদ্ধে। একই এলাকায় সুনীল চন্দ্র বিশ্বাসের ৭৫ শতাংশ জমি দখলে নিয়েছে ব্র্যাক।
মসজিদ-মাদ্রাসার আরও ৭৫ শতাংশ জমি দখলের অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া মেহেদী হাসান ও রাব্বি গংদের ১২ শতাংশ জমি ব্র্যাকের দখলে। সরেজমিন অনুসন্ধানে রূপগঞ্জের মশুরী গ্রামের বাসিন্দাদের জমি দখলের সত্যতা মিলেছে।
যা বলছে ব্র্যাক
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে গত ২৯ আগস্ট ব্র্যাকের মিডিয়া রিলেশনস বিভাগের টিম লিড গোলাম কিবরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। তিনি প্রতিবেদককে লিখিত প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। কিন্তু প্রশ্ন পাঠিয়েও উত্তর মিলছিল না। কয়েক দফা যোগাযোগের পর মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) ব্র্যাকের লিখিত বক্তব্য পাওয়া যায়।
লিখিত বক্তব্যে গোলাম কিবরিয়া এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ব্র্যাকের সকল কার্যক্রম দেশের প্রচলিত আইন ও বিধিবিধান মেনে পরিচালিত হয়ে থাকে। এর ধারাবাহিকতায় ব্র্যাকের ক্রয়কৃত সকল সম্পদ প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রয়োজনেই ব্যবহৃত হয় এবং তা দেশের প্রচলিত আইন এবং প্রক্রিয়া মেনেই করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘ব্র্যাক যেসব জমি কিনেছে সেগুলোর প্রত্যেকটির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে। যেগুলো পরিপূর্ণভাবে কেনা হয়েছে কেবল সেগুলোতে প্রাচীর দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে যেসব জমি কেনার প্রক্রিয়া বা আলোচনার পর্যায়ে রয়েছে সেগুলোতে কোনো কাজ করা হয়নি।’
