সরকারে বিএনপি, সংগঠনে স্থবিরতা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরেছে বিএনপি। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলেও নির্বাচনের পর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন বিএনপির নেতাকর্মী ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।
নির্বাচনের পর একাধিকবার রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারম্যানের কার্যালয় এবং নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে নেতাকর্মীদের তেমন সমাগম চোখে পড়েনি। অথচ ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আগেও কার্যালয় দুটি নেতাকর্মীদের ভিড়ে সরগরম ছিল।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একই পরিস্থিতি জেলা-উপজেলা এবং মহানগর পর্যায়ের দলীয় কার্যালয়গুলোতেও। নেতাকর্মীদের আনাগোনা ব্যাপকভাবে কমেছে। অনেক নেতাকর্মী এখন সচিবালয়মুখী হয়ে পড়েছেন।
দলীয় সূত্র বলছে, সরকার গঠনের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ মন্ত্রিসভা ও সংসদীয় দায়িত্বে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ফলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে গতি কমে গেছে। নির্বাচনের পর বিশেষ কোনো দলীয় কর্মসূচি কিংবা রাজপথে মিটিং-মিছিল না থাকায় নেতাকর্মীদের তৎপরতা কমেছে। এ ছাড়া টানা আন্দোলন-সংগ্রামের ব্যস্ততা শেষে অনেকে এখন নিজস্ব কাজকর্মে সময় দিচ্ছেন।
তবে দলের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা জানান, স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে দলীয় কার্যক্রম চাঙা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিগগিরই দল পুনর্গঠনের কাজ শুরু হতে পারে। বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হবে। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সংগঠনকে আরও সক্রিয় করে তোলার চিন্তা রয়েছে হাইকমান্ডের।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিএনপি জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে মাত্র সরকার গঠন করেছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী দলের সাংগঠনিক অবস্থা শিগগিরই ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। আমাদের দলের চেয়ারম্যান দলের সাংগঠনিক অবস্থাসহ সার্বিক বিষয়ে অবহিত আছেন।
মেয়াদোত্তীর্ণ বেশির ভাগ কমিটি
বিএনপি ও অঙ্গসহযোগী সংগঠন মিলিয়ে ১১টি সাংগঠনিক কমিটির মধ্যে ১০টিরই মেয়াদ শেষ হয়েছে। নির্বাচনে জয়ের পর বর্তমানে সুষ্ঠুভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করাই বিএনপির প্রধান চ্যালেঞ্জ। আপাতত দলের শীর্ষ নেতৃত্বের নজর সেই দিকেই বেশি। তবে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে শিগগিরই সাংগঠনিক তৎপরতা শুরুর প্রস্তুতি চলছে।
বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একাধিক নেতা এশিয়া পোস্টকে জানান, ঈদুল ফিতরের পর অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হতে পারে। এমনকি ঈদের আগেই কয়েকটি কমিটি ঘোষণার সম্ভাবনাও রয়েছে।
সূত্র জানায়, সম্প্রতি তেজগাঁও কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে উপদেষ্টারা দলীয় সাংগঠনিক শক্তি বাড়াতে অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোর পুনর্গঠন দ্রুত শুরু করার পরামর্শ দেন। প্রধানমন্ত্রীও ঈদের পর এ বিষয়ে কাজ শুরুর ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানা গেছে।
প্রধানমন্ত্রীর শিল্প ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে এ বিষয়ে কথা বলেছে এশিয়া পোস্ট। বিএনপির সিনিয়র এই যুগ্ম মহাসচিব বলেন, খুব শিগগিরই দল পুনর্গঠন শুরু হবে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে সরকার গঠন হয়েছে মাত্র কিছুদিন আগে। চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে সংসদ অধিবেশন শুরু হবে। সেই অধিবেশন নিয়ে নেতারা ব্যস্ত সময় পার করছেন। এরপরই দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন কার্যক্রম শুরু হবে।
তিনি আরও বলেন, সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন কার্যক্রম হাতে নেওয়া হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা দলের চেয়ারম্যানের নির্দেশনা অনুযায়ী দৃশ্যমান উদ্যোগ নেবেন।
১০ বছর ধরে কাউন্সিল হয়নি বিএনপির
বিএনপির সর্বশেষ ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হয় ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও বিগত সরকারের আমলে তা করা সম্ভব হয়নি। যদিও এই সময়ে নির্বাহী কমিটি একাধিকবার পুনর্গঠন করা হয়েছে এবং জাতীয় স্থায়ী কমিটিসহ বিভিন্ন পদে সংযোজন-বিয়োজন হয়েছে। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত থেকে পূর্ণাঙ্গ চেয়ারম্যান হন তারেক রহমান।
এমপি-মন্ত্রী হওয়ায় সংগঠনে সময় কম
মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা বলছেন, অঙ্গসহযোগী সংগঠনের অনেক শীর্ষনেতা এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন এবং কেউ কেউ মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন। ফলে তারা সংগঠনে আগের মতো সময় দিতে পারছেন না। আবার নতুন কমিটি না হওয়ায় নতুন নেতৃত্বও তৈরি হচ্ছে না। এতে পদপ্রত্যাশীদের অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছেন।
বিএনপির এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী না করলে নির্বাচনি লড়াইয়ে শক্ত অবস্থান তৈরি করা সম্ভব নয়। নিয়মিত কাউন্সিল না হলে নতুন নেতৃত্বও তৈরি হবে না।
ছাত্রদলে নতুন নেতৃত্বের জোর আলোচনা
জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে গত ১ মার্চ। সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসিরের নেতৃত্বাধীন এই কমিটি যে কোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন নাসির উদ্দিন নাসির, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শ্যামল মালুম, সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান, সহসভাপতি রিয়াদ রহমান, সাফি ইসলাম, এজাজুল করিম রুয়েল ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান।
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন আমান উল্লাহ আমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল হক জিশান, রাজু আহমেদ, প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস।
দেড় বছরেও পূর্ণাঙ্গ হয়নি যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি
২০২৪ সালের ৯ জুলাই আব্দুল মোনায়েম মুন্নাকে সভাপতি ও নুরুল ইসলাম নয়নকে সাধারণ সম্পাদক করে যুবদলের আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। দেড় বছরেও সেই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা যায়নি। বর্তমানে ছয় সদস্যের আংশিক কমিটি দিয়ে সংগঠনটির কার্যক্রম চলছে।
নুরুল ইসলাম নয়ন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর বলেন, দল যেভাবে দায়িত্ব দেবে সেটাই তিনি পালন করবেন। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে পরামর্শ করে শিগগিরই পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেওয়া হতে পারে বলেও জানান তিনি।
কমিটি পূর্ণাঙ্গ হওয়ার আগেই যুবদলে নতুন নেতৃত্ব আসতে পারে বলেও গুঞ্জন রয়েছে দলীয় ফোরামে। আগামী কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন রেজাউল করিম পল, আকরামুল হাসান মিন্টু ও গোলাম মাওলা শাহীন। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ফজলুর রহমান খোকন ও কাজী রওনাকুল ইসলাম শ্রাবণ।
স্বেচ্ছাসেবক দলেও নতুন নেতৃত্বের গুঞ্জন
২০২২ সালের ৪ সেপ্টেম্বর এস এম জিলানীকে সভাপতি ও রাজিব আহসানকে সাধারণ সম্পাদক করে জাতীয়তাবাদী স্বেচ্ছাসেবক দলের কমিটি হয়। তিন বছরের মেয়াদ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। শীর্ষ দুই নেতাই এবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাধারণ সম্পাদক রাজিব প্রতিমন্ত্রীও হয়েছেন।
এমন প্রেক্ষাপটে সংগঠনটিতে নতুন নেতৃত্ব আসার সম্ভাবনা রয়েছে। সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন সাংগঠনিক সম্পাদক নাজমুল হাসান। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন শ্যামল ও সাইফ মাহমুদ জুয়েল।
কৃষক দল, মহিলা দলেও স্থবিরতা
কৃষক দলের বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে দেড় বছর আগে। সভাপতি হাসান জাফির তুহিন ও সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ায় তখন কমিটি ভাঙা হয়নি। নতুন কমিটিতে সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতাদের থেকে যে কেউ সভাপতি পদে আসতে পারেন। সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় রয়েছেন কৃষিবিদ মেহেদী হাসান পলাশ ও শাহাদাত হোসেন বিপ্লব।
মহিলা দলের বর্তমান কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০১৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। আফরোজা আব্বাসকে সভাপতি ও সুলতান আহমেদকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠিত দুই বছরের সেই কমিটি দিয়েই প্রায় এক দশক ধরে সংগঠনটির কার্যক্রম চলছে। সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের দ্বন্দ্বও একাধিকবার প্রকাশ্যে এসেছে।
অন্য সংগঠনগুলোর অবস্থাও একই
এক যুগ পুরোনো কমিটি দিয়ে চলছে জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা ও শ্রমিক দল। মুক্তিযোদ্ধা দলের সর্বশেষ কাউন্সিল হয় ২০১৩ সালের ১৪ ডিসেম্বর। একইভাবে জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কমিটি হয় ২০১৪ সালের এপ্রিলে। দুই সংগঠনেরই কমিটি বহু আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে।
এদিকে ২০১৯ সালে গঠিত তাঁতি দলের আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০২২ সালে। অন্যদিকে মৎস্যজীবী দলের আহ্বায়ক কমিটিও বিলুপ্ত হলেও এখনও নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়নি।
জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার (জাসাস) আহ্বায়ক কমিটির মেয়াদ তিন বছর হলেও প্রায় পাঁচ বছর ধরে একই কমিটি চলছে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সীমিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম ছাড়া তেমন কোনো সাংগঠনিক তৎপরতা নেই।