জিপিএসের নামে বিআরটিএর নতুন ডিজিটাল ফাঁদ, তথ্য যাচ্ছে বিদেশি সার্ভারে
• অনুমোদিত ২৭টি ভিটিএস ভেন্ডরের মধ্যে ১২টিই বিদেশী সার্ভারে তথ্য পাঠায়
• জিপিএস ডিভাইসের দাম নিয়ে লুকোচুরি
• ২৩ লাখ টাকায় অনভিজ্ঞ সংস্থাকে পরামর্শক নিয়োগ
• হাজার কোটি টাকা খরচেও সেবা নিয়ে অনিশ্চয়তা

সড়ক দুর্ঘটনা কমানো, গাড়ির বেপরোয়া গতি নিয়ন্ত্রণ ও গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে জিপিএস ট্র্যাকিং গত ১ আগস্ট থেকে বাধ্যতামূলক করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। কিন্তু সড়ক নিরাপত্তার নামে শুরু হওয়া এই উদ্যোগের শুরুতেই দেখা দিয়েছে নানা অনিয়ম, বাড়তি খরচ ও তথ্য নিরাপত্তার ঝুঁকি।
বিআরটিএর অনুমোদিত ২৭টি ভ্যাহিকল ট্র্যাকিং সার্ভিস (ভিটিএস) প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ১২টি লাইসেন্সিং নীতিমালার স্পষ্ট শর্ত ভেঙে দেশের লাখ লাখ বাসের রিয়েল-টাইম লোকেশন ও যাত্রীদের রুট ডেটা পাঠাচ্ছে চীন, ভারত, সিঙ্গাপুর, পোল্যান্ড ও জার্মানির মতো বিদেশি সার্ভারে।
শুধু তথ্যের নিরাপত্তাই নয়, বাজারে ৪০০ থেকে ১২০০ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়, এমন সাধারণ ডিভাইসই বিআরটিএর অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায় কিনতে হচ্ছে পরিবহনমালিকদের। এর সঙ্গে প্রতি মাসে সার্ভিস চার্জ বাবদ গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা।
এ ছাড়া জাল জিপিএস সার্টিফিকেট দিয়ে ফি ফিটনেস নবায়ন করা হলেও নির্বিকার বিআরটিএ। ডিজিটাল নম্বর প্লেটের শত কোটি টাকা অপচয় এবং হাইওয়ের সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো হয়ে পড়ে থাকার পর জিপিএস ট্র্যাকিংয়ের নামে নতুন এই অপরিকল্পিত প্রকল্পে হাজার কোটি টাকা অপচয়ের মাধ্যমে দেশের গণপরিবহনব্যবস্থা নিরাপত্তাঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠেছে এখন।
বিদেশি সার্ভারে যাচ্ছে দেশের কোটি মানুষের তথ্য
ফিটনেস নবায়নসহ বিআরটিএর সেবা নিতে হলে বাধ্যতামূলক দেখাতে হচ্ছে সচল জিপিএস ডিভাইসের সনদ। এটাও আবার নিতে হবে বিআরটিএ অনুমোদিত ২৭টি ভিটিএস প্রতিষ্ঠান থেকে। বিটিআরসির ওয়েবসাইটে ৫০-এর অধিক ভিটিএস লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান থাকলেও কিসের ভিত্তিতে গণপরিবহনে ট্র্যাকিং ডিভাইস স্থাপনের জন্য এই ২৭টি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করা হয়েছে, তার কোনো সদুত্তর দিতে পারেনি বিআরটিএ।
বিআরটিএর পরিচালক অপারেশন মমতাজ বেগম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিটিআরসি তো এমনি এমনি লাইসেন্স দেয়নি। যাদের ভিটিএস স্থাপন করার লাইসেন্স দিয়েছে বিটিআরসি, আমরা তাদের অনুমতি দিয়েছি।
তবে বিটিআরসির নিজস্ব ভিটিএস লাইসেন্সিং নীতিমালা পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, ২৭টি প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই আইন লঙ্ঘন করে লাইসেন্স নিয়েছে। নীতিমালার ৫.০৫ নম্বর ধারায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, লাইসেন্সধারী কোনো প্রতিষ্ঠান আন্তর্জাতিকভাবে কোনো ভয়েস বা ডেটা ট্রাফিক বহন করতে বা পাঠাতে পারবে না।
কিন্তু এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে দেখা যায়, অনুমোদিত ২৭টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অন্তত ১২টি প্রতিষ্ঠান বিটিআরসির ভিটিএস নীতিমালার ৫.০৫ ধারা লঙ্ঘন করে আন্তর্জাতিক সার্ভার ব্যবহার করছে।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত আইপি ঠিকানা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ‘অন্যরকম ইলেকট্রনিক্স কোম্পানি লি.’ (আইপি: ১০৪.২১.৫৯.০), 'ট্র্যাকিং অ্যান্ড সার্ভে সলিউশনস' (আইপি: ৬৭.২০৩.১৫.০) এবং 'জিপিএস ডট ফ্যালকনবিডি ডট কম' (আইপি: ১৩.২২৩.২৫.০০) 'ট্র্যাকিং বিডি' (আইপি: ৪৭.৯০.২০৮.০০০)—সবাই ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্রের সার্ভার।
এ ছাড়া 'থেন সিস্টেমস' (আইপি: ১৩.২৫১.২৫৫.০০০) ব্যবহার করছে সিঙ্গাপুরের সার্ভার, 'বন্ডস্টাইন টেকনোলজিস লি.' (আইপি: ১৪৬.৫৯.৮৫.০০) ব্যবহার করছে পোল্যান্ডের সার্ভার, 'অটো জেনারেশন লিমিটেড' (আইপি: ৭৯.৯৮.২৪.০০) ব্যবহার করছে লিথুয়ানিয়ার সার্ভার, 'ডুপনো ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড' (আইপি: ১৪৮.২৫১.১৭৯.০০) ব্যবহার করছে সিঙ্গাপুর ও জার্মানির সার্ভার। 'ফরবিট লিমিটেড' (আইপি: ৯৪.১৩৬.১৮৪.০০০) ব্যবহার করছে ভারতের সার্ভার, 'অটোনেমো লিমিটেড' (আইপি: ৫.২২৩.৭১.০০০/ ১৯৪.১৩৫.৮৬.০০) ব্যবহার করছে সিঙ্গাপুর ও লিথুয়ানিয়ার সার্ভার। 'জিকার সলিউশনস' (আইপি: ৫.২২৩.৮৮.০০০) ব্যবহার করছে সিঙ্গাপুরের সার্ভার, 'বঙ্গো টেকনোলজি লি.' (আইপি: ১৩.১২৭.২২৮.০০) ব্যবহার করছে ভারতের সার্ভার।
নীতিমালা লঙ্ঘন করে বিদেশি সার্ভার ব্যবহারে কী কী নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হতে পারে জানতে চাইলে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা এশিয়া পোস্টকে বলেন, গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার বাধ্যতামূলক করার উদ্যোগটি সড়ক নিরাপত্তা, গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ইতিবাচক পদক্ষেপ। তবে এখানে শুধু গাড়িতে একটি জিপিএস ডিভাইস বসানোই যথেষ্ট নয়। কারণ এর মাধ্যমে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক যানবাহনের রিয়েল টাইম অবস্থান, চলাচলের ইতিহাস, রুট ও সময়সহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ডেটা তৈরি হবে। ১০ লাখের মতো যানবাহন এই ব্যবস্থার আওতায় এলে এটি কার্যত একটি বড় জাতীয় পর্যায়ের লোকেশন-ডাটা ইনফ্রাস্ট্রাকচার হয়ে উঠবে।
তিনি আরও বলেন, তাই প্রতিষ্ঠান নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু ডিভাইসের দাম বা জিপিএস ট্র্যাকিং করার সক্ষমতা বিবেচনা করলে হবে না। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সার্ভার ও ডাটা সেন্টার কোথায়, ডেটার মালিক কে, কারা ডেটা অ্যাকসেস করতে পারবে, ডাটা এনক্রিপশন, অ্যাকসেস কন্ট্রোল, অডিট লগ, সাইবার সিকিউরিটি মনিটরিং, ব্যাকআপ ও ডিজেস্টার রিকভারি ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী, সেটিও যাচাই করা জরুরি। কোনো বিদেশি ক্লাউড এবং থার্ড পার্টি সার্ভিস ব্যবহৃত হলে ডাটা কোথায় যাচ্ছে এবং কোন জুরিজডিকশনের অধীনে থাকছে, সেটিও পরিষ্কার হওয়া দরকার।
তার মতে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, একজন মানুষের নিয়মিত যাতায়াতের তথ্য থেকে তার বাসস্থান, কর্মস্থল, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং চলাচলের ধরন পর্যন্ত অনুমান করা সম্ভব। ফলে এই ডেটা ফাঁস বা অপব্যবহার হলে টার্গেট ক্রাইম ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তাঝুঁকি এমনকি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মুভমেন্ট প্রোফাইলিংয়ের মতো সমস্যাও তৈরি হতে পারে।
নীতিমালা উপেক্ষা করে কীভাবে ভিটিএস লাইসেন্স পেল, এ ব্যাপারে বিটিআরসির উপপরিচালক মাহফুজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, যেসব ভিটিএস লাইসেন্সধারী জিপিএস ট্র্যাকার লাগানোর কাজ করছে, তাদের কয়েকজন বিদেশি সার্ভার ব্যবহার করছে। এটি আমাদের নজরে আসছে, আমরা এটি নিয়ে কাজ করছি। একটা সমাধান হবে। আর আমি তাদের লাইসেন্স প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত না।
বিটিআরসির লাইসেন্স শাখার পরিচালক লে. কর্নেল সৈয়দ মো. তৌফিকুল ইসলামের নম্বরে ফোন করলে তিনি মিডিয়া শাখার মাধ্যমে যোগাযোগ করতে বলেন।
বিটিআরসির মিডিয়া শাখায় প্রশ্ন লিখে জমা দিলে এক সপ্তাহের বেশি সময় পর প্রতিষ্ঠানটির মিডিয়া বিভাগের উপপরিচালক মো. আব্দুস শাহীদ চৌধুরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, আপনার আবেদনটি আমরা আমাদের সংশ্লিষ্ট শাখায় পৌঁছে দিয়েছি। আপনার অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে তারা কাজ করছেন। কাজ শেষ হলে আপনাকে লিখিতভাবে জানানো হবে। কবে নাগাদ কাজ শেষ হবে, কত দিন লাগবে, এই প্রশ্নে তিনি বলেন, এটা সঠিক বলা যাচ্ছে না কত দিন লাগবে।
জিপিএস ডিভাইসের দাম নিয়ে লুকোচরি
বিআরটিএ মিরপুর শাখা থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, গত ১৭ আগস্ট পর্যন্ত ১০১টি গণপরিবহনে জিপিএস ট্র্যাকার প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৫টি বাস এবং ৬টি থ্রি হুইলার সিএনজি।
জিপিএস ট্র্যাকার প্রতিস্থাপনের সময় বসুমতি বাসের ড্রাইভার ইকবাল এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটা ভালো উদ্যোগ মনে হয় কিন্তু আমি এ বিষয়ে তেমন কিছু জানি না। ফিটনেস করাতে এসেছিলাম। জিপিএস না লাগালে ফিটনেস করবে না। মালিককে জানিয়েছি, মালিক লোক পাঠাইছে। আগে একটা লাগানো ছিল মালিকের কিন্তু এখন সরকার যে কোম্পানি বলে দিয়েছে, সেই কোম্পানির লাগাচ্ছি। টাকাপয়সা কত কী লাগছে জানি না, মালিক জানে। তবে শুনেছি বছরে ৩ হাজার ৫০০ টাকা চুক্তি করেছে।
তবে দাম যাচাই করতে তালিকা ধরে এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হয়েছে অন্তত ছয়টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে। তারা প্রায় সবাই বলেছে প্রাথমিকভাবে তিন হাজার থেকে পাঁচ হাজার পর্যন্ত দাম নেওয়া হচ্ছে ডিভাইস-ভেদে এবং মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান বছরে সার্ভিস চার্জ বাবদ ৩ হাজার ৫০০ টাকা নিচ্ছে।
এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে আলিবাবা, মেইড ইন চায়নাসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ই-কমার্স সাইট থেকে পাওয়া তথ্যমতে, ফোরজি ভ্যাহিকল জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইসের দাম ৪০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকার মধ্যে। যদিও খুবই উন্নত মানের কিছু ডিভাইসের দাম ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত রয়েছে। কিন্তু বিআরটিএর তালিকায় নাম থাকা ভেন্ডররা পরিবহনমালিকদের কাছে একই ডিভাইস বিক্রি করছে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতি মাসে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা মাসিক সার্ভিস চার্জ।
গাণিতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, থ্রি-হুইলারসহ সারা দেশে নিবন্ধিত বাণিজ্যিক যানবাহনের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। গড়ে ৪ হাজার টাকা হিসাবে ডিভাইস লাগাতে পরিবহনমালিকদের গুনতে হবে ৪০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া বছরে ৩ হাজার ৫০০ টাকা সার্ভিস চার্জ নিলে দিতে হবে আরও ৩৫০ কোটি টাকা।
মানিকগঞ্জের বাসিন্দা লুৎফর নিজের ট্রাক চালান। ঢাকায় এসেছিলেন ট্রিপ নিয়ে। জিপিএস নিয়ে প্রশ্ন করতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আমার গাড়ি আমি ভাড়ায় দিই না। নিজেই চালাই। তাই কখনও জিপিএস লাগাতে হয়নি। কিন্তু এখন দেখি পাঁচ হাজার টাকা চায়, তাই লাগাইনি। এসব দিয়ে কী করতে চায়, তাও জানি না। মালিক সমিতির মাধ্যমে শুনছি সরকারি আদেশ করতে হবে।
প্রস্তুতিহীন বিআরটিএ
সার্কেল অফিসগুলোতে বিআরটিএ ভেন্ডরদের যে তালিকা পাঠিয়েছে, তার প্রতিটির মন্তব্যের ঘরে লেখা রয়েছে টেস্ট্রি এপিআই কানেক্ট। অর্থাৎ কোন ভেন্ডরের কাছ থেকে কীভাবে তথ্য পাওয়া যাবে, সেই তথ্য কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে, সংরক্ষিত তথ্য কাজে লাগিয়ে কীভাবে সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে, তার কোনো প্রস্তুতি নেই বিআরটিএর। সংস্থাটির সার্ভার ম্যানেজমেন্টে অভিজ্ঞ ও নির্দিষ্ট কোনো জনবলও নেই।
বিআরটিএর পরিচালক অপারেশন মমতাজ বেগম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি এখনও প্রস্তুতি পর্যায়ে রয়েছে। যাদের বিটিআরসি লাইসেন্স দিয়েছে, আমরা তাদের অনুমতি দিয়েছি ডিভাইস বিক্রি করার জন্য। এটা নিয়ে আমরা ভাবছি কীভাবে কী করব।
তবে এশিয়া পোস্টের হাতে আসা নথি বলছে, জিপিএস প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই ও কারিগরি রোডম্যাপ তৈরির জন্য গত জুনে বিআরটিএ ২৩ লাখ টাকার বিনিময়ে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেয় 'জিও প্ল্যানিং ফর অ্যাডভান্সড ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড' (জি-প্যাড)-কে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, নিবন্ধিত এই প্রতিষ্ঠানটির মূলত ড্রোন সার্ভে, জিআইএস ম্যাপিং ও নগর পরিকল্পনা নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। গণপরিবহনের লাইভ জিপিএস ট্র্যাকিং, এপিআই সার্ভার সিকিউরিটি বা বৃহৎ ফ্লিট ম্যানেজমেন্টের মতো জটিল আইটি অবকাঠামো তৈরিতে তাদের কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই। জি-প্যাড এখনও তাদের ফিজিবিলিটি স্টাডি ও কারিগরি সুপারিশ বিআরটিএকে চূড়ান্তভাবে জমাই দেয়নি। কবে দেবে তাও চূড়ান্ত নয়।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জি প্যাডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রেজাউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বর্তমানে গণপরিবহনে জিপিএস স্থাপন-সংক্রান্ত প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ চলমান রয়েছে। আমরা আগস্ট ২০২৬-এর মধ্যে Draft Feasibility Study Report জমা দেওয়ার পরিকল্পনা করছি। পরবর্তী ধাপে প্রকল্পটির Development Project Proposal (DPP) প্রস্তুত করা হবে। সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও DPP প্রস্তুতিসহ সম্পূর্ণ পরামর্শক কার্যক্রম অক্টোবর ২০২৬-এর মধ্যে সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে প্রকল্পের কার্যকারিতা পরীক্ষা ও প্রাথমিক প্রয়োজনীয়তা নির্ধারণের জন্য আমরা অ্যাডহক ভিত্তিতে একটি সফটওয়্যারসিস্টেম তৈরি করেছি। ফিসিবিলিটি স্টাডি সম্পন্ন হওয়ার পর মূল সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের জন্য বিস্তারিত টার্মস অব রেফারেন্স (টিওআর) প্রস্তুত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান বেসিসএর সদস্য এবং আমরা আইসিটিসহ বিভিন্ন খাতে নানা ধরনের সেবা দিয়ে আসছি। বর্তমানে আমরা পরিকল্পনা কমিশনের সঙ্গেও একটি সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্টের কাজ করছি। বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের বিভিন্ন খাতে আমাদের ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
ভুয়া সনদ আর এক মাসের ভাড়ায় ফিটনেস পার
মাত্র ১৫ দিন আগে জিপিএস ট্র্যাকিং ডিভাইস লাগানো শুরু হলেও এরই মধ্যে জালিয়াতি শুরু করে দিয়েছে একটি চক্র। বাজার থেকে ইচ্ছামতো অনটাইম ডিভাইস লাগিয়ে ভিটিএস প্রতিষ্ঠানের জাল সার্টিফিকেট বানিয়ে নেওয়া হয়েছে বাড়ানো হয়েছে ফিটনেসের মেয়াদ। প্রকল্পের শুরুতেই এমন জালিয়াতির অভিযোগ ওঠে খোদ বিআরটিএর ফিটনেস শাখার কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। মিরপুর বিআরটিএ অফিস থেকে দুটি বাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট নবায়ন করা হয়েছে সানসিটি বিজ নামক একটি ভিটিএস সার্ভিস প্রতিষ্ঠানের সনদ নিয়ে। বাস্তবে দেখা যায়, সানসিটি এখন পর্যন্ত কোনো সার্টিফিকেট ইস্যু করেনি বা গণপরিবহনে কোনো জিপিএস ডিভাইসও স্থাপন করেনি।
এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে মাঠে নামে এশিয়া পোস্ট। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মিরপুর বিআরটিএ অফিস থেকে দেওয়ান পরিবহনের বাস (ঢাকা মেট্রো বিএ-১২-০৪২৩) জিপিএস সনদ নিয়েছে সানসিটির কাছ থেকে, জমা দেওয়া হয়েছে একটি সনদও।
সানসিটির বিজের স্বত্বাধিকারী রবিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমার প্রতিষ্ঠান সানসিটি এখনও সার্টিফিকেট ইস্যু শুরুই করেনি। কিন্তু আমি নিজে মিরপুর বিআরটিএতে গিয়ে জানতে পারলাম, আমার কোম্পানির নামে চারটা সার্টিফিকেট দেখিয়ে, ফিটনেস করায় নিয়ে গেছে। বিআরটিএর কাছে সার্টিফিকেট ভেরিফিকেশনের সুযোগ না থাকায় অসাধু সিন্ডিকেট এরই মধ্যে জালিয়াতি শুরু করে দিয়েছে।
এশিয়া পোস্টের পক্ষ থেকে দেওয়ান পরিবহনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে সাংবাদিক পরিচয় শোনার পর ফোন কেটে দিয়ে নম্বর বন্ধ করে রাখেন তিনি। পরের দিন ১৮ আগস্ট সার্টিফিকেট জালিয়াতির সময় হাতেনাতে ধরা হয় এএলডি কোম্পানির হেড অব সেলস নুরুল ইসলাম নামে একজনকে। বিআরটিএ ও ভিটিএস ভেন্ডরের মধ্যস্থতায় মুচলেকা দিয়ে ছাড়া হয় তাকে।
বিআরটিএ মিরপুর সার্কেলের উপপরিচালক এস এম কামরুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, আসলে আমাদের কাছে ডিজিটাল ভাবে যাচাই করার সুবিধা না থাকায় একটি চক্র এই সুযোগ নিয়েছে। আমরা ওই কোম্পানির বাসের ফিটনেস বাতিল করব এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেব।
এদিকে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক বাস ও ট্রাক মালিক বিআরটিএর ফিটনেস সনদ নবায়নের ঝামেলা এড়াতে কোনোমতে তালিকাভুক্ত ভেন্ডরের কাছ থেকে মাত্র এক মাসের সার্ভিস প্যাকেজ কিনছেন। যা দেখিয়ে ফিটনেস লাইসেন্সের মেয়াদ বৃদ্ধি করছেন। ফলে এক মাস পর ওই গাড়িটি রাস্তায় কোথায় চলছে বা আদৌ জিপিএস চালু আছে কি না, তার কোনো তথ্য সংগ্রহের ক্ষমতা বিআরটিএর থাকছে না।
ভিটিএস সার্ভিস প্রোভাইডার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক তানজীম রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাসমালিকরা এক মাসের বিল দিয়ে ডিভাইস নিতে চাচ্ছে। কিন্তু বিআরটিএ আমাদের বলেছে আমরা যেন কন্টিনিউয়াসলি (অব্যাহতভাবে) ডেটা দিই। কিন্তু বাসমালিকরা যদি পরবর্তী মাসে আমাদের থেকে সার্ভিস না নেয়, তাহলে আমরা বিআরটিএকে কোনো তথ্য দিতে পারব না। বিআরটিএ যদি কোনো নিয়ম করে যে পরবর্তী ফিটনেস পর্যন্ত বাসমালিকরা সার্ভিস নেবে, তাহলে আমরা বিআরটিএকে কন্টিনিউ ডেটা দিতে পারব। এ ছাড়া ইতোমধ্যে জাল সনদের কারবার শুরু হয়ে গিয়েছে। আমরা বিআরটিএকে ফ্রিতে একটা সফটয়্যার দিতে চেয়েছি কিন্তু তারা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। যে সফটয়্যার দিয়ে তারা ইনস্ট্যান্ট (তাৎক্ষণিক) চেক করতে পারবে যে এটা সঠিক সনদ বা জাল।
১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা নষ্ট করেও শিক্ষা নেয়নি বিআরটিএ
প্রযুক্তিকে ঢাল বানিয়ে জনগণের পকেট কাটা ও রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ অপচয়ের এই খেলা সড়ক পরিবহন খাতে এবারই প্রথম নয়। এর আগে ২০১২ সালে গাড়ি চুরি রোধ ও রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিংয়ের লোভনীয় স্বপ্ন দেখিয়ে চালু করা হয়েছিল আরএফআইডি ট্যাগসহ ডিজিটাল নম্বর প্লেট। গাড়িপ্রতি আড়াই থেকে চার হাজার টাকা পর্যন্ত বাধ্যতামূলক ফি নিয়ে গত ১৪ বছরে দেড় হাজার কোটির বেশি টাকা তুলেও কোনো সেবা দিতে পারেনি বিআরটিএ।
একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে ২০২১ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে গতিসীমা নিয়ন্ত্রণ ও অপরাধ শনাক্তে বসা সিসিটিভি ও ইন্টেলিজেন্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে। প্রায় ১৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বসা মোট ১৪৭টি লোকেশনের সিসিটিভি ক্যামেরার বড় একটি অংশ রক্ষণাবেক্ষণ ও কেন্দ্রীয় সার্ভার সংযোগের অভাবে এখন ধুলা জমে বিকল হয়ে পড়ে আছে।





