logo

প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের টাকায় লোকসান সমন্বয় জনতা ব্যাংকের

• দিলকুশা করপোরেট শাখায় অসমন্বিত দায় প্রায় ৪৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা

• ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত জেইসি ইতালির লোকসান ৬৩ লাখ ৯৩ হাজার ইউরোর বেশি

• লোকসান পূরণে রেমিট্যান্সের কভার ফান্ড থেকে অর্থ কেটে রেখে কম পাঠানো হয়

এশিয়া পোস্ট স্পেশাল
প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের টাকায় লোকসান সমন্বয় জনতা ব্যাংকের
জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (জেইসি) এসআরএলের লোগো। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কভার ফান্ড থেকে অর্থ কেটে রেখে ইতালির সাবসিডিয়ারির (ব্যাংকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান) লোকসান পূরণ করছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটির নাম ‘জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (জেইসি) এসআরএল’। বিদেশ থেকে পাঠানো রেমিট্যান্সের বিপরীতে দেশে আসার কথা থাকা কভার ফান্ডের একাংশ এখানে আটকে যাচ্ছে।

কভার ফান্ড হলো রেমিট্যান্সের বিপরীতে বিদেশ থেকে পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা। প্রবাসীরা এক্সচেঞ্জ হাউজে টাকা জমা দিলে সেই হাউজ সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা দেশের ব্যাংকে পাঠায়। দেশের ব্যাংক এর বিপরীতে প্রাপককে টাকা দেয়।

জেইসির লোকসানের কারণে ২০১৫ সাল থেকে কভার ফান্ড থেকে লোকসান পূরণ বাবদ অর্থ কেটে রাখা হয়। পরে ব্যাংকের বোর্ড সভা জেইসি ইতালির মাসিক ব্যয়ের জন্য কভার ফান্ড থেকে ৫০ হাজার ইউরো কেটে রাখার অনুমোদন দেয়। বাকি অর্থ যায় দিলকুশা করপোরেট শাখায়।

এর ফলে দিলকুশা করপোরেট শাখার হিসাবে বিপুল অসমন্বিত দায় (হিসাবে মেলানো হয়নি এমন অর্থ) তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের ৭ জুলাই পর্যন্ত এর পরিমাণ প্রায় ৪৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় থেকে এই অর্থের হিসাব এখনও সমন্বয় করা হয়নি।

নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, জেইসি ইতালি ২০০৯ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে লোকসানে আছে। ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে এই লোকসানের পরিমাণ ৬৩ লাখ ৯৩ হাজার ১৯ ইউরোর বেশি। এর মধ্যে ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্ষতির অর্থ জনতা ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে পূরণ (পুনঃভরণ) করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনেও নানা অনিয়ম ও অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে আছে ভাউচার ছাড়া অর্থ পরিশোধ, বাজেট না থাকা সত্ত্বেও ব্যয় এবং ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে নগদে বিল পরিশোধ। আছে কর্মকর্তাদের আবাসন সুবিধার বিপরীতে বেতন থেকে অর্থ কর্তন না করা এবং অনুমোদনের সুযোগ না থাকা সত্ত্বেও ঋণ দেওয়ার ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের জন্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

বোর্ডের সিদ্ধান্তে কভার ফান্ড থেকে কর্তন

বিদেশ থেকে বাংলাদেশে রেমিট্যান্স পাঠানোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কভার ফান্ড দিলকুশা করপোরেট শাখায় পাঠানো হয়। কিন্তু জেইসির নিজস্ব ব্যয় মেটাতে সেই অর্থের একটি অংশ কেটে রাখার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর জনতা ব্যাংকের বোর্ড সভায় এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জেইসি ইতালির মাসিক ব্যয় নির্বাহের জন্য কভার ফান্ড থেকে ৫০ হাজার ইউরো কেটে রাখার অনুমোদন দেওয়া হয়। বাকি অর্থ দিলকুশা শাখায় পাঠানোর কথা বলা হয়। ফলে রেমিট্যান্সের বিপরীতে দেশে আসার কথা, এমন অর্থের একাংশ বিদেশে থাকা লোকসানি প্রতিষ্ঠানের ব্যয় মেটানোর পেছনে খরচ হচ্ছে।

ইতালি থেকে আসা রেমিট্যান্সের অর্থ দিলকুশা করপোরেট শাখা অগ্রিম পরিশোধ করে। এটি শাখার ‘সান্ড্রি অ্যাসেট-অ্যাডভান্স পেমেন্ট টু জেইসি অপারেশন’ খাতে দেখানো হয়। কিন্তু ব্যাংকের নস্ট্রো হিসাবে এক্সচেঞ্জ কোম্পানির সংগ্রহ করা রেমিট্যান্সের সমপরিমাণ অর্থ পুরোটা জমা করা হয় না। নস্ট্রো হিসাব হলো বিদেশি ব্যাংকে রাখা দেশীয় ব্যাংকের নিজস্ব হিসাব।

নথি অনুযায়ী, এই অগ্রিম অর্থের বিপরীতে দিলকুশা করপোরেট শাখার প্রাপ্য অর্থ সর্বশেষ ২০২০ সালে সমন্বয় করা হয়। সমন্বয় হয় ওভারসীজ ব্যাংকিং ডিপার্টমেন্টের ক্রেডিট অ্যাডভাইসের (হিসাব সমন্বয়ের অভ্যন্তরীণ নির্দেশনা) মাধ্যমে। ২০২১ সাল থেকে আর কোনো সমন্বয় হয়নি। ফলে ২০২৬ সালের ৭ জুলাই পর্যন্ত এ খাতে দিলকুশা করপোরেট শাখার অসমন্বিত দায় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৮ কোটি ৮৬ লাখ টাকা।

দীর্ঘ সময় ধরে একটি সাবসিডিয়ারির পরিচালন ব্যয় মেটাতে কভার ফান্ড থেকে অর্থ কেটে রাখা হচ্ছে। এতে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহের অর্থ ব্যবস্থাপনা এবং ব্যাংকের সম্পদের মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন দলও এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। তাদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কভার ফান্ড থেকে অর্থ কেটে রাখার কারণে দেশে প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ কমছে। দিলকুশা করপোরেট শাখার সম্পদের গুণগত মানও দিন দিন ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

জেইসির কভার ফান্ড ব্যবহারের বিষয়টি বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরেও আসে। ২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) জেইসির কভার ফান্ড ব্যবহার বন্ধে সতর্ক করে। কিন্তু কভার ফান্ড ও লোকসানের বিষয়টি পরবর্তী সময়ের হিসাবেও থেকে যায়। পরিদর্শন দলের পর্যবেক্ষণে প্রশ্ন উঠেছে, একদিকে নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশ, অন্যদিকে বছরের পর বছর লোকসান; এরপরও কেন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে? কার স্বার্থে এর ব্যয়ভার বহন করছে জনতা ব্যাংক?

পরিদর্শন প্রতিবেদনে জেইসির আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। বিদেশের এক্সচেঞ্জ হাউজকে ওভারড্রন (জমার চেয়ে বেশি অর্থ তোলার সুবিধা) দেওয়ার সুযোগ নেই। এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা নীতি বিভাগের ‘বিদেশস্থ এক্সচেঞ্জ হাউজের সঙ্গে বাংলাদেশস্থ ব্যাংকের ড্রয়িং ব্যবস্থা স্থাপনসংক্রান্ত নীতিমালা’র ৩(জ) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। অনিবাসী প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ সৃষ্টি করা হলে তা ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭-এর ৫ ধারার লঙ্ঘনের পর্যায়ে পড়ে বলেও পরিদর্শন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০০৯ থেকে লোকসান, লাভে ফেরার শর্ত

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের সেবা দেওয়ার লক্ষ্যে ইতালিতে যাত্রা করে জনতা এক্সচেঞ্জ কোম্পানি (জেইসি) এসআরএল। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি টানা ১৮ বছর ধরে লোকসানে চলছে। নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০০৯ সাল থেকে জেইসি ইতালি ধারাবাহিকভাবে লোকসানি প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচালিত হয়ে আসছে।

২০০৯ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ক্ষতি দাঁড়ায় ৩৮ লাখ ৬৬ হাজার ৭৬৯ দশমিক ৫৫ ইউরো। এই ক্ষতির অর্থ জনতা ব্যাংকের নিজস্ব তহবিল থেকে পূরণ করা হয়েছে।

এর মধ্যে ২০০৯ থেকে ২০১৪ সালের ক্ষতির বিপরীতে ১২ লাখ ৭১ হাজার ২৭০ দশমিক ৭৬ ইউরো পুনঃভরণের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। ২০১৫ থেকে ২০২০ মেয়াদের ২৫ লাখ ৯৫ হাজার ৪৯৮ দশমিক ৭৯ ইউরো ক্ষতির অর্থও পুনঃভরণের অনুমোদন পাওয়া যায়। অর্থাৎ দুই মেয়াদে ২০২০ সাল পর্যন্ত ক্ষতি পুনঃভরণের অনুমোদিত অঙ্ক প্রায় ৩৮ লাখ ৬৭ হাজার ইউরো।

২০২১ থেকে ২০২৫ মেয়াদে আরও ২৫ লাখ ২৬ হাজার ২৫০ দশমিক ৪৩ ইউরো ক্ষতি হয়েছে। এই অর্থ পুনঃভরণের অনুমোদন চেয়ে গত ১ জুন বাংলাদেশ ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠায় জনতা ব্যাংক। সমপরিমাণ অর্থ ব্যাংকে প্রভিশন (সম্ভাব্য ক্ষতির জন্য আলাদা করে রাখা অর্থ) হিসেবেও রাখা হয়। এতে ২০০৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে জেইসির লোকসান দাঁড়ায় ৬৩ লাখ ৯৩ হাজার ১৯ ইউরোর বেশি।

এরপরও লোকসান থামেনি। জুন ২০২৬ মেয়াদে জেইসির ব্যয় হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার ৭৭১ ইউরো। ওই মাসেই প্রতিষ্ঠানটির লোকসান দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬৩ ইউরো। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে লোকসান হয়েছে ৬ লাখ ১৮ হাজার ১৮০ ইউরো। নতুন অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের অর্থের ওপর নির্ভরশীল।

রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর পাশাপাশি পরিচালন ব্যয় সামলাতে জেইসি তিনটি এজেন্ট প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটিকে লাভজনক করা যায়নি। এজেন্ট নিয়োগ করে ব্যবসা বাড়ানোর উদ্যোগ দীর্ঘদিনের লোকসানের ধারা থামাতে পারেনি।

জেইসির আর্থিক পরিস্থিতি নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদ্বেগ নতুন নয়। ২০২১ সালের ৯ ডিসেম্বর বিআরপিডির ওভারসীজ ব্যাংকিং শাখা (ওবিএস) ২০২০ সাল পর্যন্ত পুঞ্জীভূত ক্ষতির অর্থ পুনঃভরণের অনুমতি দেয়। একই সঙ্গে কঠোর শর্ত দেওয়া হয়। শর্ত ছিল, ২০২২ সালের মধ্যে জেইসিকে লাভজনক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যথায় প্রতিষ্ঠানটির অবসায়ন বা লিকুইডেশনের (প্রতিষ্ঠান গুটিয়ে ফেলা) ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই শর্ত পূরণ হয়নি।

২০২৩ সালের ২৭ আগস্ট বিআরপিডি সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে বন্ধের নির্দেশ দেয়। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ হয়নি।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০২৪ সালের ২৯ মে জানায়, ইতালিতে জেইসির কার্যক্রম বন্ধ করা হলে রেমিট্যান্স প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ারও আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণে বিভাগটি প্রতিষ্ঠান বন্ধের বিষয়ে অসম্মতি জানায়। ফলে নিয়ন্ত্রক সংস্থার বন্ধের নির্দেশ এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের অসম্মতির মধ্যে আটকে থাকে জেইসির ভবিষ্যৎ।

জনতা ব্যাংকের পুনঃভরণের আবেদনের জবাবে ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট বিআরপিডি ডিভিশন-১ জানায়, ২০২১-২০২৫ মেয়াদের ১৯ লাখ ৬২ হাজার ৯০২ দশমিক ৪৩ ইউরো পুনঃভরণের সুযোগ নেই। একই সঙ্গে জুন ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি লাভজনক অবস্থায় ফিরতে পারে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু জুন ২০২৬-এর হিসাব বলছে, লাভে ফেরার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠানটি তখনও বড় অঙ্কের লোকসানে ছিল।

এসব কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক একবার নয়, একাধিকবার প্রতিষ্ঠানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২০২১ সালে লাভজনক করার শর্ত দেওয়া হয়। ২০২৩ সালে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ আসে। পরবর্তী সময়ে লোকসান পুনঃভরণের বিষয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়। তারপরও জেইসি চলছে।

ভাউচারবিহীন পরিশোধ, ভাড়া ও ঋণে অনিয়ম

পরিদর্শন নথিতে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে ব্যয়ের কাগজপত্র নিয়ে। ভাউচার ছাড়া অর্থ পরিশোধের একাধিক উদাহরণ রয়েছে। এইচএবি কোস্ট্রুজিওনি সোসিতা-কে ২০২২ সালের ১৩ এপ্রিল ৮১৮ ইউরো দেওয়া হয়। ওই অর্থ পরিশোধের বিপরীতে কোনো ভাউচার পাওয়া যায়নি। বাজেট বরাদ্দ বা ভাউচার না থাকা সত্ত্বেও ২০২১ সালের ১৬ জানুয়ারি অ্যালার্ম নজরদারি বিল বাবদ অর্থ পরিশোধ করা হয়।

বিভিন্ন সার্ভিস প্রোভাইডারকে ব্যাংক ট্রান্সফার বা পে-অর্ডারের পরিবর্তে সরাসরি নগদ অর্থে বিল পরিশোধের ঘটনাও পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ২০২২ সালের ২২ অক্টোবর নগদে ৩০০ ও ৪৫০ ইউরো দেওয়ার তথ্য রয়েছে।

রোম শাখায় বিজনেস প্ল্যান তৈরির নামেও একাধিক অর্থ পরিশোধের তথ্য মিলেছে। ‘স্টেফানো সিরোচ্চি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এসএনসি, রোম’-কে ২০২২ সালের ১৯ ডিসেম্বর পরিশোধ করা হয় ৪ হাজার ৬৮০ ইউরো। ‘ইমপ্রেসা সভিলুপ্পো অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট এসএনসি, রোম’-কে ২০২০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি দেওয়া হয় ২ হাজার ৩৭৯ ইউরো। একই বছরের ১০ জুন প্রতিষ্ঠানটিকে আরও ২ হাজার ৩৭৯ ইউরো দেওয়া হয়। পরিদর্শন নথিতে এসব অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে যথাযথ ভাউচার বা উপযুক্ত সমর্থনকারী কাগজপত্রের ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।

পরিদর্শন দলের পর্যবেক্ষণে ব্যবসার পরিমাণ ও প্রবৃদ্ধির তুলনায় বিজ্ঞাপন, কম্পিউটার এবং স্টেশনারি খাতে অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়টিও এসেছে। নথিতে ব্যয় কাঠামোতে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণ না থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানের ভবনে আবাসন সুবিধা নিয়ে যেসব কর্মকর্তা বসবাস করছেন, তাদের বেতন থেকে নিয়ম অনুযায়ী আবাসন বাবদ অর্থ কর্তন করা হয়নি।

লোকসানের মধ্যেও পরিচালন ব্যয় কমানোর পরিবর্তে কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোর তথ্য পাওয়া গেছে। রোমে জেইসির প্রধান কার্যালয় ও রোম শাখা একই স্থানে ছিল। ২০১৭ সালে তা দুটি পৃথক ভবনে স্থানান্তর করা হয়। পরিদর্শন নথিতে এ স্থানান্তরের কোনো যৌক্তিক কারণ পাওয়া যায়নি। ফলে পৃথক ভবনের ভাড়া, প্রশাসনিক ব্যয় ও জনবল ব্যয় সবই বেড়ে যায়।

মিলান শাখার একটি বাণিজ্যিক স্থান নিয়েও অনিয়মের তথ্য সামনে এসেছে। প্রায় ১৩ দশমিক ৭৫ বর্গমিটার জায়গা মাসিক মাত্র ৬০০ ইউরোতে চুক্তিভিত্তিক ভাড়া দেওয়া হয়েছে। পরিদর্শন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশপাশের বাজারদরের তুলনায় এই ভাড়া অত্যন্ত কম।

মিলান শাখার এজেন্ট ম্যানেজার মহিউদ্দিন আহমেদকে ৬ হাজার ইউরো ঋণ দেওয়া হয়েছে। জেইসির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক এই ঋণ অনুমোদন করেন। পরিদর্শন দলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা পরিচালকের এমন ঋণ অনুমোদনের জন্য প্রয়োজনীয় নির্বাহী কর্তৃত্ব বা অনুমোদনক্ষমতা ছিল না।

সামগ্রিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জনতা ব্যাংকের মুখপাত্র মো. ফেরদৌস আহমেদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, এটি ২০২৩ সালের বিষয়। এখন যারা পরিচালনা পর্ষদে আছেন তাদের কেউ তখন ছিলেন না। এ বিষয়ে অডিট টিম কাজ করেছে। ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাদের যথাযথভাবে উত্তর দেওয়া হয়েছে। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। ব্যাংকের পক্ষ থেকে এখন আর এ বিষয়ে কেউ কথা বলবেন না।