নীলক্ষেত থেকে অনলাইন, সাড়ে ৫ হাজার টাকায় মিলছে এমফিল থিসিস

মাত্র সাড়ে ৫ হাজার টাকায় মিলছে সম্পূর্ণ রেডি এমফিল থিসিস। ক্রেতা সেজে অনুসন্ধানে নেমে এমন তথ্য পেয়েছে এশিয়া পোস্ট। রাজধানীর নীলক্ষেত, গাউছুল আজম, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় সক্রিয় এসব চক্র অনলাইন-অফলাইন দুই মাধ্যমেই থিসিস ও গবেষণাপত্র বিক্রির প্রচারণা চালাচ্ছে।
‘মাত্র ৭ থেকে ১৫ দিনে সম্পূর্ণ রেডি থিসিস, ১০০% গ্যারান্টি’, ‘এআই ফ্রি ও সম্পূর্ণ হিউম্যান-রিটেন গবেষণাপত্র’, ‘সুলভ মূল্যে প্রজেক্ট ও থিসিস সাপোর্ট’। এমন নানা বিজ্ঞাপনে সয়লাব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।
এই প্রচার চলে অফলাইনেও। টাকার বিনিময়ে হুবহু নকল, জোড়াতালি দেওয়া বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে তৈরি নিম্নমানের গবেষণাপত্র কিনে অনেকে অনায়াসে পেয়ে যাচ্ছেন স্নাতকোত্তর, এমফিল কিংবা পিএইচডির মতো উচ্চতর ডিগ্রি।
ক্রেতা সেজে দরদাম
ফেসবুকে ‘রিসার্চ পেপার বিডি’ নামের পেজে বিজ্ঞাপন দেখে ক্রেতা সেজে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। জিজ্ঞেস করা হয়, সমাজবিজ্ঞানের একটি বিষয়ে এমফিল থিসিসের রেডি পেপার পাওয়া যাবে কি না। উত্তরে জানতে চাওয়া হয়, শুধু রিসার্চ পেপার লাগবে নাকি পাবলিশও করে দিতে হবে। শুধু রিসার্চ পেপার লাগবে জানালে থিসিসের বিষয় জানতে চাওয়া হয়।
থিসিসের বিষয় হিসেবে জানানো হয়, ‘Socio-Economic Reintegration Challenge of Returnee Migrant Worker in Rural Bangladesh Post-Crisis’। এই শিরোনামের রিসার্চ পেপারের জন্য ছয় হাজার টাকা চাওয়া হয়। তবে দরদামের পর সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় বনিবনা হয়।
শর্ত অনুযায়ী, আগে অর্ধেক টাকা দিয়ে অর্ডার কনফার্ম করতে হয়। বাকি টাকা গবেষণাপত্র বুঝিয়ে দেওয়ার পর দিতে হয়। লেনদেনের জন্য একটি নম্বর দেওয়া হয় যেটির বিপরীতে বিকাশ, নগদ ও রকেট অ্যাকাউন্ট চালু রয়েছে। এ ছাড়া ব্র্যাক ব্যাংকের একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর দেওয়া হয়। অ্যাকাউন্টের টাইটেল অনুযায়ী, হিসাবধারীর নাম হাসিব খান।
পরে নিজের পরিচয় দিয়ে ‘রিসার্চ পেপার বিডি’ পেজের অ্যাডমিন হাসিব খানের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি দবি করেন, ‘আমরা শুধু রিসার্চের কাজে বিভিন্ন গাইডলাইন দিয়ে সাহায্য করি। এক বছরের মতো সময় ধরে এই কাজ করছি। এর বাইরে আর কিছু না।’
ফেসবুক, লিংকডইন, হোয়াটসঅ্যাপ ও বিভিন্ন টেলিগ্রাম গ্রুপে সার্চ করলেই দেখা মেলে এমন অনেক পেজ ও এজেন্সির। কোনো আড়াল না রেখেই চলে সুলভ মূল্যে গবেষণা বিক্রির প্রচারণা। স্নাতক পর্যায়ের অ্যাসাইনমেন্ট রাইটিং, প্রজেক্ট রিপোর্ট থেকে পিএইচডি পর্যায়ের থিসিস ও রিসার্চ পেপার; সবকিছুই পাওয়া যায় এসব পেজে।
অনলাইনের বাইরে রাজধানীর নীলক্ষেত, গাউছুল আজম, ফার্মগেটসহ বিভিন্ন এলাকায় এই চক্রগুলো সক্রিয়। ফটোকপির দোকান, কম্পিউটারের দোকান কিংবা দেয়ালে দেয়ালে থিসিস বাইন্ডিংয়ের নামে পোস্টার সাঁটিয়ে তারা শিক্ষার্থী ও গবেষকদের আকৃষ্ট করে।
বিষয়ভেদে দাম ৪০-৫০ হাজার টাকা
সাধারণ একাডেমিক অ্যাসাইনমেন্টের দাম ৫০০ টাকা থেকে শুরু। বিষয়ের জটিলতা, শব্দের পরিধি এবং জার্নাল বা গবেষণার মানের ওপর ভিত্তি করে দাম গিয়ে ঠেকে ৪০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
চক্রগুলোর দাবি, তাদের প্যাকেজে ডাটা অ্যানালাইসিস, প্লাগারিজম রিমুভ (লেখার চৌর্যবৃত্তি শনাক্তকরণ এড়ানো), ফরম্যাটিং এবং পিয়ার-রিভিউয়ার ম্যানেজ করার সব দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত। অগ্রিম কিছু টাকা দিয়ে কাজ শুরু করতে হয়। চুক্তিভেদে রিসার্চ পেপার বুঝিয়ে দেওয়ার পর অথবা জার্নালে লেখা পাবলিশ হওয়ার পর বাকি টাকা পরিশোধ করতে হয়।
জালিয়াতির যত কৌশল
এই চক্রগুলোর পেছনে মূলত একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক কাজ করে। এর মধ্যে থাকেন কিছু অসাধু ও অর্থলোভী গবেষক, দেশের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, ফ্রিল্যান্সার এবং তথ্যপ্রযুক্তি জানা একদল তরুণ। অনেক ক্ষেত্রে কিছু অসাধু শিক্ষকও এসবের সঙ্গে জড়িত থাকেন।
জালিয়াতির প্রক্রিয়া মূলত তিনটি উপায়ে সম্পন্ন হয়। প্রথমে চ্যাটজিপিটির মতো এআই টুল ব্যবহার করে খুব দ্রুত নিবন্ধ লেখা হয়। এরপর প্যারাফ্রেজিং টুলের মাধ্যমে ভাষা বদলে দেওয়া হয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্লাগারিজম সফটওয়্যার লেখার চৌর্যবৃত্তি সহজে ধরতে পারে না।
অতীতে পাস করা কোনো শিক্ষার্থীর থিসিস থেকে ডাটা বা উপাত্ত চুরি করে কেবল সাল বা এলাকার নাম পরিবর্তন করে সম্পূর্ণ নতুন গবেষণা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু ভুয়া বা টাকার বিনিময়ে রিসার্চ পেপার প্রকাশ করে এমন জার্নালের সম্পাদক বা প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে খুব কম সময়ে নিম্নমানের লেখা প্রকাশ করে নেওয়া হয়।
মেধা কাঠামোর ওপর আঘাত
গবেষণার মতো কাজ নিয়ে এমন জালিয়াতিতে ক্ষুব্ধ শিক্ষাবিদ ও গবেষকরা। তাদের মতে, এটি কেবল মেধার অবমূল্যায়ন নয়, বরং জাতির মেধা কাঠামোর ওপর বড় ধরনের আঘাত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘শিক্ষার্থী বা গবেষকরা যখন বাইরে থেকে কাজ করিয়ে নিচ্ছে, তখন বুঝতে হবে সেখানে বড় ধরনের একাডেমিক ঘাটতি রয়ে গেছে। গবেষণার ক্ষেত্রে সুপারভাইজার যদি নিয়মিত শিক্ষার্থীর অবজেকটিভ, মেথডোলজি এবং স্যাম্পলিং ফলোআপ করতেন, তবে এমন জালিয়াতি সম্ভব হতো না। অনেক ক্ষেত্রে সুপারভাইজারদের অবহেলা বা গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে এমনটি ঘটছে। এটি প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থী বা গবেষক উভয়পক্ষের জন্যই কলঙ্কজনক।’
তিনি বলেন, ‘অনলাইনে গবেষণাপত্র কেনাবেচা শুধু শিক্ষার মান নিচে নামাচ্ছে না, বরং এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি বয়ে আনছে। শিক্ষার্থীরা নিজে কিছু না শিখে যখন নামের পাশে গবেষক তকমা ব্যবহার করে, তখন সেটি প্রতারণা ছাড়া আর কিছুই নয়।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরের আরেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, ‘টাকা দিয়ে গবেষণাপত্র বা অ্যাসাইনমেন্ট করিয়ে নেওয়া সম্পূর্ণ অনৈতিক। একাডেমিক যেকোনো কন্ট্রিবিউশন অবশ্যই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী বা শিক্ষকের নিজস্ব মেধা বা ইনটেলেকচুয়াল প্রপার্টি হতে হবে। অন্যের কাজ নিজের নামে চালিয়ে দেওয়া কপিরাইট আইনের পরিপন্থি। এর ফলে শিক্ষার্থীর কোনো প্রকৃত দক্ষতা তৈরি হয় না।’
উত্তরণের উপায় কী
এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়মিত সেমিনার ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান। তিনি বলেন, ‘গবেষণার প্রতিটি ধাপে শিক্ষার্থীকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সুপারভাইজার বা ইনস্টিটিউট যদি কঠোর হয়, তাহলে এগুলো অনেকাংশেই কমে যাবে।’
ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশিদ বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের ওরিয়েন্টেশনের শুরুতেই এই ধরনের অনৈতিক কাজের শাস্তির বিধান সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। যদি কেউ এমন কাজে শনাক্ত হয়, তবে তাকে কাউন্সিলিং এবং উপযুক্ত পেনাল্টি দেওয়ার জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন থাকা জরুরি। গাইডলাইন অনুযায়ী সবকিছু চলছে কী না সেটিও মনিটরিং করতে হবে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই একাডেমিক ইনস্টিটিউটগুলোকে বেশি ভূমিকা পালন করতে হবে।’
.png)






