নতুন সম্পত্তি আইন নিয়ে আলেমদের আপত্তি কেন

সম্পত্তি দান করেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ব্যবহার ও ভোগের অধিকার পাবেন। এমন বিধান রেখে রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী নিয়ে আপত্তি তুলেছেন আলেমরা। তারা বলছেন, ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’ শীর্ষক এই সংশোধনী কোরআন-সুন্নাহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
এই ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে হেফাজতে ইসলাম থেকে শুরু করে কওমি ধারার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সংশোধনী বাতিলের দাবিতে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব আলেমদের একটি বড় অংশ।
বিলটিতে বলা হয়েছে, পিতা-মাতা বা পিতামহ/মাতামহ কর্তৃক তার সন্তান বা নাতি-নাতনিকে (অথবা বিপরীতক্রমে) অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পর দাতা নিজে জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন। দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতার মৃত্যু হলে, সম্পত্তির ভোগাধিকার থাকবে এবং আইন অনুযায়ী সম্পত্তি গ্রহীতার ওয়ারিশদের কাছে স্থানান্তরিত হবে।
এই সংশোধনীর বিপরীতে পবিত্র কোরআনের সুরা নিসায় মৃতের সম্পদ বণ্টনের বিধিমালার বিষয়টি সামনে আনছেন আলেমরা। সুরা নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াতে ওয়ারিশদের অংশ সুনির্দিষ্ট করে দিয়ে ১৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘এটা আল্লাহর সীমানা’। ১৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, ‘যে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের অবাধ্য হবে এবং তাঁর সীমারেখা লঙ্ঘন করবে, তিনি তাকে আগুনে প্রবেশ করাবেন।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব আলেমদের একটি বড় অংশের বক্তব্য হচ্ছে, ইসলাম যেহেতু ওয়ারিশদের সম্পত্তি সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে, তাই এখানে পছন্দের এক সন্তান বা ওয়ারিশকে সব সম্পত্তি লিখে দেওয়ার সুযোগ নেই।
যা বলছেন আলেমরা
আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে হেবার সঙ্গে জীবনস্বত্ব জুড়ে দেওয়া এবং বিক্রিতে বাধা দেওয়া ইসলামি আইন বা শরিয়তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করেন আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফফুজে খতমে নবুওয়াত বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী।
তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ইসলাম বাবা-মার অধিকার ও মর্যাদাকে সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছে। তাদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করি না। মুসলমানদের সম্পত্তি হস্তান্তর, হেবা, মিরাস ও ফারায়েজের সঙ্গে পবিত্র কোরআন-সুন্নাহর সুস্পষ্ট বিধান যুক্ত। ফলে এ সংক্রান্ত যে কোনো আইন প্রণয়নের আগে এর প্রতিটি ধারা শরিয়াহ ও ফিকহি নীতিমালার আলোকে পর্যালোচনা করা জরুরি।’
নরসিংদী জেলা তানযীম ফাতওয়া বোর্ডের সদস্য মুফতি নুরুল হুদা। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ইসলামি শরিয়ায় হেবা বা দান বিশুদ্ধ হওয়ার অন্যতম শর্ত দখল বা পূর্ণ গ্রহণ করা। উল্লিখিত আইনে দানগ্রহীতা পূর্ণ দখল করতে পারছে না বিধায় দাতার মালিকানা শেষ হচ্ছে না, তাই এটি অসিয়ত হিসেবে বিবেচিত হবে। হাদিসে ওয়ারিশদের জন্য অসিয়ত নিষেধ। সুতরাং স্বত্ব বাকি রেখে সম্পত্তি দানের আইন শরিয়াবিরোধী।’
এই সংশোধনী বাতিল করে শরিয়া বিশেষজ্ঞ দিয়ে যাচাই করে নতুন বিধান করা জরুরি বলে মনে করেন মুফতি নুরুল হুদা।
গাজীপুর সালনা ইসলামিয়া কামিল মাদ্রাসার মুহাদ্দিস যুবায়ের আহমাদ বলেন, ‘যুক্তি দিয়ে ইসলামের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো বিষয় প্রতিষ্ঠিত করতে যাওয়া আত্মঘাতী।’
জাতীয় ফিকহি বোর্ড গঠনের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেককে প্রধান ও শায়খ আহমাদুল্লাহকে সদস্যসচিব করে জাতীয় ফিকহি বোর্ড করা হোক। সরকার কোনো আইনের প্রস্তাবনা আনার পর তারা দেখবেন, এতে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কিছু আছে কি না।’
তার মতে, জাতীয় ফিকহি বোর্ড করা হলে একদিকে সরকারের ওয়াদা রক্ষা হবে, জনগণের ধর্মীয় অধিকারও নিশ্চিত হবে।
বায়তুল মোকাররমের খতিবের অভিমত
চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি ‘জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা করার শরয়ি বিধান’ বিষয়ে বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আবদুল মালেকের কাছে ফতোয়া চান অন্তর্বর্তী সরকারের ধর্ম উপদেষ্টা আ ফ ম খালিদ হোসেনের সহকারী একান্ত সচিব মো. আশিকুল ইসলাম। ওই মাসের ৫ তারিখে এ বিষয়ে বিস্তারিত ফতোয়া দেন মুফতি আবদুল মালেক।
ফতোয়ার শেষ পৃষ্ঠায় তিনি বলেন, ‘মুসলিম উত্তরাধিকার আইনে কোনো ধরনের সংশোধন ও পরিবর্তনের ন্যূনতম অবকাশ নেই। জীবনস্বত্ব সংরক্ষিত রেখে হেবা করা ইসলামি শরিয়তে জায়েজ নেই। হেবাকৃত সম্পদের দখল হস্তান্তর না হওয়া পর্যন্ত কেউ একা ওই সম্পদের পূর্ণ মালিক হতে পারবে না। সেক্ষেত্রে সম্পদ মিরাস বণ্টননীতি অনুযায়ী সব ওয়ারিশের মধ্যে বণ্টন করা আবশ্যক। অন্যদিকে, যদি হেবার বস্তুর দখল হস্তান্তর সম্পন্ন হয়ে যায়, তবে তা তাৎক্ষণিকভাবে হেবাকারীর মালিকানা থেকে বাদ পড়ে হেবাগ্রহীতার মালিকানায় অন্তর্ভুক্ত হয়। দখল হস্তান্তরের পর “দাতার জীবদ্দশায় হেবাগ্রহীতা ওই সম্পদ ভোগ করার দাবি করতে পারবে না”—এমন শর্ত যুক্ত করা ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ বাতিল ও অর্থহীন।’
কওমি দলগুলোর অবস্থান
সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের সংশোধনী পাসের প্রতিক্রিয়ায় বিদ্যমান মুসলিম পারিবারিক ও সামাজিক বিধিব্যবস্থার কোনো ব্যত্যয় না ঘটানোর আহ্বান জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ। গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বিলটি নিয়ে নিজেদের এমন অবস্থানের কথা জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিবৃতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন কোনো পদ্ধতি বা ধারা যেন ইসলামি উত্তরাধিকার ও হেবার বিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিতের ওপর জোর দেন হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব আল্লামা শায়েখ সাজিদুর রহমান।
ইসলামী আন্দোলনের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘আইনটি বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এটি শরিয়া পরিপন্থি। এর মধ্যে জটিলতা আছে। জটিলতা নিয়ে কোনো আইন হতে পারে না।’
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক বলেন, ‘মা-বাবার নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা যাবে না, যা আল্লাহ তাআলা নির্ধারিত হেবা, ওয়াসিয়ত ও ফারায়েজের শরয়ি বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। তাই জীবনকালীন ভোগাধিকার রেখে সম্পত্তি হস্তান্তরের এই নতুন বিধানটি শরিয়াহর আলোকে পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।’
খেলাফত মজলিসের বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ইসলামি শরিয়া বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে অধিকতর পর্যালোচনা এবং প্রকাশ্য মতামত গ্রহণ না করে তড়িঘড়ি করে জাতীয় সংসদে পাস হওয়া সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল গ্রহণযোগ্য হবে না।’
দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের এক বৈঠক শেষে সোমবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম জানায়, বাবা-মার অধিকার ও প্রবীণ নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য শরিয়াহর মিরাস, হেবা ও সম্পত্তি হস্তান্তরের বিধান অক্ষুণ্ণ রাখতে হবে।



