আন্তর্জাতিক রাজনীতির ফাঁদে বাংলাদেশ, ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রম ঝুঁকিতে

২০১৪ সালের পর থেকে বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে। কিন্তু ২০২১ সালের পর থেকে মশাবাহিত এ রোগের প্রকোপ বাড়ছে নতুন করে। আগে পার্বত্য তিন জেলা ও সীমান্তবর্তী ১৩ জেলাকে (বর্তমানে ৯) ম্যালেরিয়াপ্রবণ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকাতেও ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী অ্যানোফিলিস মশার অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। অথচ প্রতি বছর এ মশা নির্মূলের জন্য ৫০ কোটি টাকারও বেশি ব্যয় করছে সরকার।
প্রশ্ন উঠেছে, বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের পরও পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে কেন? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, স্থানীয় অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের পাশাপাশি ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ মূলত বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। প্রতিবেশী দুই দেশ—ভারত ও মিয়ানমারের অসহযোগিতার কারণে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে ম্যালেরিয়া নির্মূলের জোরালো পদক্ষেপ নিয়েও সুফল মিলছে না। এ ছাড়া বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মাঝে ম্যালেরিয়ার ব্যাপক বিস্তারের কারণেও নির্মূল কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, একক কোনো ব্যবস্থায় ম্যালেরিয়ার মতো ভাইরাস নির্মূল সম্ভব নয়। কারণ, এ ধরনের ভাইরাস নির্মূলে সীমান্তবর্তী দেশের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা জরুরি। ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে প্রতি বছর কেন্দ্রীয়ভাবে বৈঠক হলেও গৃহীত পরিকল্পনা কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকছে। বাংলাদেশের ম্যালেরিয়া নির্মূলে এটিই প্রধান বাধা।
থামছে না সংক্রমণ, এখনও বিস্তার ৯ জেলায়
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন ৬ হাজার ১০৪ জন। মারা গেছেন ৭ জন। পরের বছর ৭ হাজার ২৯৪ জন আক্রান্তের বিপরীতে মৃত্যু হয়েছে ৯ জনের। কোভিড মহামারির মধ্যে ওই দুই বছর ম্যালেরিয়া আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পায়। কিন্তু কোভিড পরিস্থিতির উন্নতির পর আক্রান্তের হার পুনরায় বাড়তে থাকে। ২০২২ সালে ১৮ হাজার ১৯৫ জন, ২০২৩ সালে ১৬ হাজার ৫৬৭ জন এবং ২০২৪ সালে ১৩ হাজার ১০০ জন আক্রান্তের পাশাপাশি মারা গেছেন ৯ জন। ২০২৫ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ১৬২ জনে, কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ১৬।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির তথ্যমতে, ২০২৩ সাল পর্যন্তও ১৩ জেলায় ম্যালেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। ২০২৪ সালে ময়মনসিংহ, শেরপুর, নেত্রকোনা এবং কুড়িগ্রামকে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে সিলেট, হবিগঞ্জ, সুনামগঞ্জ, মৌলভিবাজার, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে এ ভাইরাসের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। উচ্চ প্রকোপ রয়েছে পার্বত্য ও সীমান্তবর্তী তিন জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে। এর মধ্যে বান্দরবানে ম্যালেরিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি।
২০২৫ সালে ঢাকায় বাস করেন এমন ২৬ জনের দেহে ম্যালেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়। আক্রান্তদের মধ্যে অন্তত পাঁচজনের অবস্থা ছিল গুরুতর, মৃত্যু হয়েছে একজনের। মারা যাওয়া ব্যক্তি রাজধানীর সূত্রাপুরের বাসিন্দা।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দাবি, ঢাকার বাসিন্দা হলেও তারা কেউ ঢাকায় আক্রান্ত হননি। তাদের প্রত্যেকের বান্দরবান ভ্রমণের ইতিহাস রয়েছে।
ম্যালেরিয়া নির্মূলে বার্ষিক ব্যয় অর্ধশত কোটি
সরকারি বরাদ্দ ও আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থা থেকে ম্যালেরিয়া নির্মূলের পেছনে বছরে গড়ে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ১০০ কোটি টাকা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৪-২৫ অর্থবছর পর্যন্ত ছয় বছরে ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচিতে সরকারের বরাদ্দ ছিল ৩৭৬ কোটি ৮৩ লাখ ২০ হাজার টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকা।
অন্যদিকে একই সময়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) উন্নয়ন সংস্থা ‘গ্লোবাল ফান্ড টু ফাইট এইডস’ দিয়েছে ২০৩ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে বরাদ্দ ছিল ৬০৪ কোটি ৭০ লাখ ৭০ হাজার টাকা। এর মধ্যে ব্যয় হয়েছে অর্ধেকের বেশি, ৩১০ কোটি ২৯ লাখ টাকা। সে অনুযায়ী গড়ে বছরে ম্যালেরিয়া নির্মূলের পেছনে ব্যয় ৫১ কোটি টাকার বেশি।
ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর সরকারি বরাদ্দের প্রায় ১০ শতাংশ যায় প্রশিক্ষণ, সভা, সেমিনারসহ কর্মসূচি বাস্তবায়নে। বাকি ৯০ শতাংশ ব্যয় হয় শনাক্তকরণ কিট, চিকিৎসার ওষুধ, ইনজেকশন, মশারিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কিনতে। গ্লোভাল ফান্ডের ৮০ ভাগ টাকায় প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কিনে দেয় দাতা সংস্থাগুলোই।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির ফাঁদ
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো ম্যালেরিয়া নির্মূলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সম্মিলিতভাবে কাজ করার লক্ষ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে ২০১৭ সালে। বাংলাদেশ ছাড়াও এ চুক্তিতে সই করেছে ভারত, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, ভুটান, কোরিয়া, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ, নেপাল, থাইল্যান্ড ও তিমুর-লেস্তে। এর মধ্যে মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা এরই মধ্যে নিজেদের ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করেছে।
চুক্তি অনুযায়ী, সীমান্তের এক পাশের দেশে উচ্চ প্রকোপ এবং অন্য পাশে কম হলে কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে তা যেমন বলা হয়েছে, তেমনি উভয় সীমান্তে সমানভাবে ছড়ালে ভিন্ন ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে, যা সীমান্তবর্তী জেলার স্থানীয় প্রশাসনই সিদ্ধান্ত নেবে। তবে বাস্তবতা বলছে, এসব চুক্তির সবটাই রয়ে গেছে কাগজে-কলমে।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির সাবেক এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ম্যালেরিয়া এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির ফাঁদে পড়েছে। ভারত একটা পর্যায় পর্যন্ত আমাদের সঙ্গে থাকলেও নির্মূলে যে ধরনের সহযোগিতা দরকার তা করছে না।’
সরকারের ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির আওতায় মাঠপর্যায়ে প্রায় এক দশক ধরে কাজ করছেন এপিডেমিওলজিস্ট মশিকুর রহমান বিটু। এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘চুক্তিবদ্ধ যে দুটি দেশ (মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা) নিজেদের ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করেছে তাদের সঙ্গে কোনো দেশের সীমান্ত নেই। উল্টো চিত্র বাংলাদেশের ক্ষেত্রে। নির্মূলে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েও ভারত ও মিয়ানমারের মতো সীমান্তবর্তী দেশের আন্তরিকতা ও সহযোগিতার অভাবে আমাদের বেগ পেতে হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ম্যালেরিয়া নির্মূল করতে হলে একটি জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মধ্যস্ততায় জোরালো কার্যক্রম দরকার।’
ভারত ও মিয়ানমারের অসহযোগিতার বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির পরিচালনা উপদেষ্টা ড. মো. মুশফিকুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘প্রতি বছর দেশগুলো বড় করে বৈঠক করছে। কিন্তু কোনো কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ভারত ও মিয়ানমারের থেকে কোনো সহযোগিতা পাওয়া যায় না। ফলে একতরফাভাবে সীমান্তের এ পারে বাংলাদেশ হাজারো পদক্ষেপ নিলেও ম্যালেরিয়া নির্মূল কঠিন।’
জটিলতা বাড়ছে রোহিঙ্গাদের কারণে
মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বড় অংশ ঠাঁই নিয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজারে। জেলাটিতে সমতলের পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পেও ব্যাপক আকারে ছড়িয়েছে ম্যালেরিয়া। ২০১৭ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। গত বছরও শতাধিক রোহিঙ্গা ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়েছেন, মৃত্যু হয়েছে অন্তত ছয়জনের।
জাতীয় ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির পরিচালনা উপদেষ্টা ড. মো. মুশফিকুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে এখন অন্যতম প্রধান বাধা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ব্যাপক বিস্তার। ক্যাম্প থেকে বেরিয়ে পাহাড়ে ও বনে কাজ করতে গিয়ে ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন তারা। কিন্তু আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে জ্বর এলেও অনেকে বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না। ফলে তাদের শনাক্ত করাই বড় কঠিন।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ম্যালেরিয়া নির্মূলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক। সংস্থাটির ম্যালেরিয়া নির্মূল কর্মসূচির পরিচালক ড. মো. আকরাম হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘রোহিঙ্গারা আক্রান্ত হলে তা নির্মূলে কিছুটা কঠিন, তবে একেবারে অসম্ভব নয়। শনাক্তকরণের পাশাপাশি তাদের চিকিৎসা, কীটনাশক মশারি প্রদানসহ সব ধরনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে নয়, বনে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছে। উৎপত্তিস্থল ধ্বংস করা ছাড়া সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব নয়।’
আছে অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনাও
ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রমে সম্পৃক্ত একাধিক কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে জানান, আন্তর্জাতিক উৎস থেকে পাওয়া বরাদ্দের ২০ শতাংশ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যবহার করা হয়। তার মধ্যে ১০ শতাংশ নানা অনিয়মের মাধ্যমে তছরুপের অভিযোগ রয়েছে। তাই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো তাদের বরাদ্দের ৮০ ভাগ অর্থ এখন সরাসরি বাংলাদেশকে না দিয়ে কিট, ওষুধসহ চিকিৎসা ও সুরক্ষা সরঞ্জাম ক্রয়ে সরাসরি যুক্ত থাকছে। ফলে সেখানে অনিয়মের সুযোগ নেই বললেই চলে।
তবে সরকারি বরাদ্দের কেটাকানায় এখনো অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত সাবেক দুজন কর্মকর্তা এশিয়া পোস্টকে জানান, প্রতি অর্থবছরের শেষ সময়ে বরাদ্দ অবশিষ্ট থাকলে সেটি কীভাবে ব্যয় করা যায় তা নিয়ে সর্বোচ্চ তৎপরতা দেখান লাইন ডিরেক্টর থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ফলে প্রশিক্ষণ, সভা না হলেও ভুয়া বিল তৈরি অর্থ আত্মসাতের বহু ঘটনা রয়েছে। অতীতে যারাই এসব পদে ছিলেন প্রত্যেকই এসব অনিয়মে জড়িত বলেও দাবি করেন ওই দুই কর্মকর্তা।
বদলে গেছে জীবাণুর ধরণ, তবু হাল ছাড়ছেন না সংশ্লিষ্টরা
ম্যালেরিয়ার জীবাণুর ধরনে পরিবর্তন হওয়ায় শনাক্তকরণে জটিলতা দেখা দিয়েছে। আক্রান্ত হলেও ফল নেগেটিভ আসায় কিট পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানিয়েছে, কিট যাচাইয়ে গত বছরের অক্টোবরের শেষের দিকে ভারতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রেফারেল ল্যাবে ২০টি নমুনা পাঠানো হয়। ইতোমধ্যে সেই ফলাফল এসেছে। জীবাণুর ধরনের পরিবর্তনের প্রমাণ মিলেছে। ফলে কিটের পরিবর্তন চেয়ে গ্লোবাল ফান্ডকে চিঠি দেওয়ায় ম্যালেরিয়া শনাক্তে পরিবর্তিত জীবাণু ধরতে সক্ষম এমন ৫ লাখ কিট দিতে সম্মত হয়েছে গ্লোবাল ফান্ড।
এ ব্যাপারে ড. মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘জীবাণুর ধরনের পরিবর্তনের বিষয়টি আমাদের নজরে এলে আইসিডিডিআরবির (আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ) ল্যাবে কয়েকটি ব্যাচের কিট পরীক্ষা করা হয়। সেখানে ফলস রিপোর্ট আসে। পরে সব ব্যাচ আইসিডিডিআরবির ল্যাবে পরীক্ষা করানো হয়। পরে দেখা গেল কিটের সমস্যা নেই, জীবাণুর ধরন পরিবর্তন হয়েছে।’
চলছে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল
ম্যালেরিয়া নির্মূলে স্বাভাবিক কার্যক্রম হিসেবে পার্বত্য তিন জেলা বান্দরবানের থানচি ও আলীকদম উপজেলার ৩৫টি গ্রামে টার্গেটেড ড্রাগ খাওয়ানোর কর্মসূচি চলছে। তবে নির্মূলে তা যথেষ্ট নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ জন্য ভ্যাকসিনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্মূল কর্মসূচির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৪ সাল থেকে ভ্যাকসিনেশন শুরু হয়েছে। তিন ডোজের এই টিকা আলীকদম উপজেলার ১০০টি গ্রামে পরীক্ষামূলকভাবে দেওয়া শুরু হয়েছে। এ বছরের চলতি মাসেই এই টিকার বুস্টার ডোজ প্রদান শুরু হয়েছে।
এ বিষয়ে ড. মো. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘যেসব এলাকা হটস্পট সেখানে ব্যাপক আকারে ওষুধ খাওয়ানো হচ্ছে। এতে করে আক্রান্ত কমছে। তবে নির্মূলে ভ্যাকসিনের বিকল্প নেই। যে ভ্যাকসিনটি দেওয়া হচ্ছে তা আফ্রিকার কয়েকটি দেশে প্রয়োগ করা হলে সেখানে ৮০ ভাগ সফলতা পাওয়া গেছে। ভ্যাকসিন নেওয়ার পর আক্রান্ত হওয়ার হার আশানুরূপভাবে কমে এসেছে। ইতোমধ্যে আমরাও ভ্যাকসিনটির বুস্টার ডোজের ট্রায়াল শুরু করেছি। এরপর তিন বছর পর্যবেক্ষণে থাকবেন তারা। এই সময়ে ভ্যাকসিনগ্রহীতাদের মধ্যে আক্রান্তের হার কমলে সরকারের অনুমোদন পেলে সংক্রমিত সব জেলাতেই দেওয়া হবে।’
তিনি আরও জানান, জেলাভিত্তিক কার্যক্রম হাতে নেওয়ায় ২০২৪ সালে ময়মনসিংহ বিভাগকে ম্যালেরিয়ামুক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। চলতি বছরে সিলেট, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার এবং ২০২৭ সালের মধ্যে সারা দেশে মৃত্যু সংখ্যা শূন্যে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে। ম্যালেরিয়া পরজীবীকে মারতে পারলেই নির্মূল অর্জন সম্ভব।’
গতানুগতিক চিন্তায় ২০ বছরেও নির্মূল অসম্ভব: বে-নজির আহমেদ
সরকারের ম্যালেরিয়া নির্মূল কার্যক্রমে সম্পৃক্তরা আশাবাদের কথা শোনালেও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গতানুগতিক কর্মসূচিতে আগামী ২০ বছরেও ম্যালেরিয়া নির্মূল সম্ভব নয়। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ এশিয়া পোস্টকে তিনি বলেন, ‘ম্যালেরিয়া নির্মূলে কৌশল বদলাতে হবে। আমাদের দরকার সমন্বিত কঠোর ব্যবস্থা। অধিক সংক্রমিত পাড়ায় জনগণকে সম্পৃক্ত করে দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, মশার কামড় যাতে না দেয় তা নিশ্চিত করা, উৎপত্তিস্থল ধ্বংস, লার্ভা ও এডাল্ট মশাকে মেরে ফেলতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ভাইরাসটি নির্মূলে সবখানে কার্যক্রম এক। সেখানে রোহিঙ্গা কিংবা সমতল- আলাদা করে দেখার কিছু নেই। মূল বিষয় হলো বাহক নিয়ন্ত্রণ। বান্দরবান ও রাঙামাটির গহিন অরণ্যে কিছু মানুষের মাঝেমধ্যে যাতায়াত থাকলেও সেখানে কেউ বাস করে না।