logo
বিপাকে জনতা ব্যাংক

১৪৭ কোটির ঋণ নিয়েও চালু হয়নি কনিকা কমার্শিয়ালের কারখানা

• টাইলস ও সিরামিকস কারখানা স্থাপনে প্রজেক্ট লোন নেয় কনিকা কমার্শিয়াল লিমিটেড

• ঋণ মঞ্জুর ১৫২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা, ছাড় ১৪৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা

• ফাঁকা জমিতে সাইনবোর্ড। জনতা ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ, এমন কিছু লেখা নেই

• নিয়মবহির্ভূতভাবে ঋণ পুনঃতপশিল করেছে জনতা ব্যাংক

১৪৭ কোটির ঋণ নিয়েও চালু হয়নি কনিকা কমার্শিয়ালের কারখানা
রাজধানীর মতিঝিলে অবস্থিত জনতা ব্যাংক পিএলসির প্রধান কার্যালয়। ছবি: উইকিপিডিয়া

রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা ঋণ নিয়েও টাইলস ও সিরামিকস কারখানা চালু করেনি মেসার্স কনিকা কমার্শিয়াল লিমিটেড। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিদর্শনের সময় প্রকল্পস্থলের প্রধান ফটক বন্ধ ছিল।

সুদে-আসলে কনিকা কমার্শিয়ালের কাছে ব্যাংকের মোট পাওনা ২৬৬ কোটি টাকার বেশি। এর বিপরীতে বন্ধক রাখা জমির দাম ৬৭ কোটি টাকা। ফলে ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদের ঘাটতি প্রায় ১৯৯ কোটি টাকা। অনিয়মিতভাবে ঋণ পুনর্বিন্যাস ও বিতরণের ফলে এটি এখন ঝুঁকিপূর্ণ ঋণে পরিণত হয়েছে। মহাহিসাব নিরীক্ষক কার্যালয়ের বাণিজ্যিক অডিট অধিদপ্তরের ২০২৪-২০২৫ নিরীক্ষা বছরের প্রতিবেদন ও শাখার রেকর্ড পর্যালোচনায় উঠে এসেছে এসব তথ্য।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নে বারবার ব্যর্থতা সত্ত্বেও পাঁচবার ঋণ পুনর্বিন্যাস করা হয়েছে। অনিয়মিতভাবে অ্যাডহক সিসি নামে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। দায়ের তুলনায় জামানত কম থাকায় জনতা ব্যাংক ২৬৬ কোটি ২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

অনুমোদন ও অর্থ ছাড়

কনিকা কমার্শিয়াল লিমিটেডের অনুকূলে শিল্প ঋণ মঞ্জুরি ও অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১৮ সালে। ওই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের ৫০৯তম সভায় প্রজেক্ট লোনের প্রথম মঞ্জুরি দেওয়া হয়। টাইলস ও সিরামিকস উৎপাদনের এই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ২৩৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা।

ব্যাংক ও উদ্যোক্তার ঋণ-মূলধন অনুপাত ছিল ৫৫:৪৫। অর্থাৎ ব্যাংক দেবে ৫৫ শতাংশ, উদ্যোক্তা দেবেন ৪৫ শতাংশ। সেই হিসাবে পর্ষদ প্রথম ধাপে ১৩১ কোটি ৮৯ লাখ টাকার প্রকল্প ঋণ অনুমোদন করে। পর্ষদের সিদ্ধান্তের আলোকে ২০১৮ সালের ৪ মার্চ শাখা থেকে প্রাথমিক মঞ্জুরিপত্র দেওয়া হয়।

২০২০ সালের ৫ অক্টোবর পর্ষদের ৬৩৩তম সভায় ঋণসীমা বাড়ানো হয়। কারখানায় অতিরিক্ত ও আধুনিক মেশিনারিজ সংযোজনের কথা জানিয়ে গ্রাহক আবেদন করেছিলেন। এবার ঋণ-মূলধন অনুপাত ধরা হয় ৬০:৪০। মূল ঋণসীমা আরও ২০ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বাড়িয়ে মোট ১৫২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা অনুমোদন দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ৫ নভেম্বর শাখা থেকে দ্বিতীয় দফায় নতুন মঞ্জুরিপত্র ইস্যু করা হয়।

পুরো ঋণের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ৮ বছর। এর মধ্যে নির্মাণকালসহ গ্রেস পিরিয়ড ছিল ২১ মাস। গ্রেস পিরিয়ড হলো কিস্তি শুরুর আগের বিরতিকাল, যখন ঋণগ্রহীতাকে কিস্তি দিতে হয় না।

অনুমোদন পাওয়ার পর দিলকুশা করপোরেট শাখা থেকে ধাপে ধাপে পূর্ত কাজ ও অন্যান্য খাতে মোট ১৪৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা গ্রাহকের অনুকূলে ছাড় বা বিতরণ করা হয়। এর মধ্যে কারখানার অবকাঠামো বা পূর্ত কাজ বাবদ আটটি পৃথক কিস্তিতে দেওয়া হয় ২১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। ২০১৮ সালের ১২ জুন প্রথম কিস্তি হিসেবে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়া হয়।

কিস্তির হিসাবে ২০১৮ সালে প্রতি কিস্তিতে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা করে ৫ কিস্তিতে ১৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ২০১৯ সালে ২ কিস্তিতে ৫ কোটি ৪০ লাখ এবং ২০২১ সালে এক কিস্তিতে ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ঋণপত্র (এলসি) এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক খাতে বিভিন্ন মেয়াদে ৯০ কোটি ৮৬ লাখ টাকা, ১৮ কোটি ৮ লাখ টাকা এবং ১৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়।

মঞ্জুরিপত্রের শর্ত নম্বর ১৭(ক) অনুযায়ী, মোট স্থায়ী পরিসম্পদজনিত প্রকল্প বিএমআরই ব্যয়ের ২৩৯ কোটি ৮১ লাখ টাকার মধ্যে উদ্যোক্তার অংশ, অর্থাৎ ১০৭ কোটি ৯১ লাখ টাকা খাতওয়ারি সমমূলধন হিসেবে মার্জিন অ্যাকাউন্টে জমা করার বিধান ছিল। বিএমআরই হলো কারখানার ভারসাম্য, আধুনিকায়ন, প্রতিস্থাপন ও সম্প্রসারণসংক্রান্ত ব্যয়। মার্জিন অ্যাকাউন্ট হলো ঋণ ছাড়ের আগে উদ্যোক্তার নিজস্ব অর্থ জমা রাখার হিসাব। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্যোক্তার অংশ সমমূলধন হিসেবে মার্জিন অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়নি।

পাঁচ দফায় ঋণ পুনর্বিন্যাস

প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় ছিল প্রথম মঞ্জুরি থেকে ২১ মাস, অর্থাৎ ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু নিয়মিত কিস্তি আদায় ও প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। ঋণ পুনর্বিন্যাস মানে ঋণ পরিশোধের সূচি নতুন করে নির্ধারণ।

২০২০ সালের ২২ এপ্রিল তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও প্রকল্প বাস্তবায়নকাল এক বছর বাড়ান। এতে মার্চ ২০২০-এর পরিবর্তে মার্চ ২০২১ এবং প্রথম কিস্তি পরিশোধের তারিখ জুন ২০২০-এর পরিবর্তে জুন ২০২১ নির্ধারণ করা হয়। ঋণ পরিশোধ সূচি এভাবে প্রথমবার পুনর্বিন্যাস করা হয়। একই সঙ্গে প্রকল্প ঋণ পরিশোধের মেয়াদ ২০২৬ সালের ৩০ জুনের পরিবর্তে ২০২৭ সালের ২০ জুন নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ঋণের প্রথম কিস্তি আদায় এবং প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন হয়নি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদি ঋণের মেয়াদ বাড়ানোর বিষয়টি ঋণ অনুমোদনকারী কর্তৃপক্ষ, অর্থাৎ পরিচালনা পর্ষদ কর্তৃক অনুমোদিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। তা সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও অনিয়মিতভাবে ঋণ পুনর্বিন্যাস করেছেন।

অডিট আপত্তির জবাবে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানায়, জনতা ব্যাংকের ঋণ মঞ্জুরি ক্ষমতা বিধির ৮ম সংস্করণের ৭নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ব্যাংকের এমডি প্রকল্প বাস্তবায়নকাল প্রথমবার ১২ মাস বাড়িয়ে মার্চ ২০২১ নির্ধারণ করেন। ব্যাংকের জবাব প্রত্যাখ্যান করে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই জবাব আপত্তি নিষ্পত্তির জন্য সহায়ক নয়। কারণ সার্কুলার লঙ্ঘন করে ব্যাংকের এমডি ও সিইও অনিয়মিতভাবে ঋণ পুনর্বিন্যাস সুবিধা দিয়েছেন।

পরে ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদ ২০২১ সালের ৫ মে দ্বিতীয়বার, ২০২২ সালের ২০ এপ্রিল তৃতীয়বার এবং ২০২২ সালের ১৬ অক্টোবর চতুর্থবার ঋণ পুনর্বিন্যাস করে। একই সঙ্গে ১০ শতাংশ মার্জিনে ৬ কোটি ৫ লাখ টাকার ব্যাংক গ্যারান্টি ইস্যু করা হয়।

কোনো গ্রাহকের মেয়াদি ঋণ একবার পুনঃসূচির মাধ্যমে সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ মেয়াদ বাড়ানো যায়। কিন্তু এই ঋণের ক্ষেত্রে পঞ্চমবার পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ২১ মাস থেকে আরও ৪৮ মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এটি প্রাথমিক অনুমোদনের চেয়ে ২২৯ শতাংশ বেশি।

২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিল ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৮১২তম সভায় প্রকল্প ঋণের বাস্তবায়নকাল এক বছর বাড়ানো হয়। এতে মার্চ ২০২৩-এর পরিবর্তে মার্চ ২০২৪ এবং প্রথম কিস্তি পরিশোধের তারিখ জুন ২০২৩-এর পরিবর্তে জুন ২০২৪ নির্ধারণ করা হয়। একই সঙ্গে ঋণ পরিশোধের মেয়াদ জুন ২০২৯-এর পরিবর্তে জুন ২০৩০ নির্ধারণ করে পঞ্চমবারের মতো ঋণ পুনর্বিন্যাস করা হয়।

পর্ষদ সভার সিদ্ধান্ত পাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্রাহক প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ২ কোটি টাকা এবং প্রথম কিস্তির সমুদয় অর্থ ২০২৪ সালের ৩০ জুনের মধ্যে পরিশোধ নিশ্চিতের পর অনুমোদন কার্যকরের নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহকের কাছ থেকে কোনো অর্থ আদায় না করে শাখা কর্তৃপক্ষ ২০২৪ সালের ৯ মে এক চিঠির মাধ্যমে পঞ্চমবার ঋণ পুনর্বিন্যাসের মঞ্জুরি দেয়।

খেলাপি গ্রাহককে ঋণ সুবিধা

ব্যাংক পরিচালনা পর্ষদের ৭২২তম সভায় ২০২২ সালের ২২ জুন প্রারম্ভিক উৎপাদনের জন্য কাঁচামাল সংগ্রহের লক্ষ্যে ৬ মাস মেয়াদে অ্যাডহক সিসি অনুমোদন দেওয়া হয়। অ্যাডহক সিসি হলো চলতি মূলধনের জন্য সাময়িক নগদ ঋণ সুবিধা। শাখার ২০২২ সালের ২৮ জুনের চিঠির মাধ্যমে তা মঞ্জুর ও বিতরণ করা হয়।

এই ঋণ অনুমোদনের বিষয়টি ব্যাংকের ঋণ নীতি কিংবা কোনো সার্কুলার দ্বারা সমর্থিত নয়। অর্থাৎ অনিয়মিতভাবে এটি অনুমোদন ও বিতরণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, যে উদ্দেশ্যে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে সে উদ্দেশ্যে ঋণের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ঋণের অর্থ দিয়ে কাঁচামাল সংগ্রহের বিষয়টিও ব্যাংক নিশ্চিত করতে পারেনি।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট শাখার জবাবে বলা হয়, গ্রাহক ২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি এক চিঠিতে জানিয়েছেন, অ্যাডহক সিসি (হাইপো) ঋণসীমা থেকে নেওয়া ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য সরবরাহকারীকে অগ্রিম দেওয়া হয়েছে। হাইপো হলো মজুত পণ্যের ওপর ব্যাংকের স্বার্থ রেখে দেওয়া ঋণ। গ্রাহকের চিঠি অনুযায়ী, ঋণসীমার অবশিষ্ট অর্থ পাওয়ার পর ট্রায়াল প্রোডাকশনের সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

কোনো বিধি-বিধান, সার্কুলার কিংবা আদেশ না থাকা সত্ত্বেও অ্যাডহক সিসি ঋণের নামে ২৫ কোটি টাকা অনুমোদনপূর্বক ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। নিরীক্ষকদের এমন বক্তব্যের বিষয়ে ব্যাংক কোনো জবাব দেয়নি।

গ্রাহকের ২০২৪ সালের ১৩ এপ্রিলের সিআইবি রিপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর স্থিতিভিত্তিক ঋণ হিসাব ‘এসএস’ মানে প্রদর্শিত ছিল। সিআইবি হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্যভান্ডার, আর ‘এসএস’ হলো নিম্নমানের খেলাপি শ্রেণি। হিসাবটি ছয় মাসের বেশি সময় মেয়াদোত্তীর্ণ ছিল।

এই সিআইবি রিপোর্টের ভিত্তিতে পর্ষদের ২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিলের ৮১২তম সভার সিদ্ধান্তের আলোকে শাখা কর্তৃপক্ষ গ্রাহকের অ্যাডহক সিসি ঋণের মেয়াদ একই বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত বাড়ায়। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়, এতে খেলাপি গ্রাহককে ঋণ সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, কোনো ঋণ ছয় মাসের বেশি সময় মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে তা খেলাপি হিসেবে গণ্য হবে। খেলাপি গ্রাহককে ঋণ সুবিধা দেওয়া যাবে না। আলোচ্য ক্ষেত্রে এসব ধারা লঙ্ঘন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে ব্যাংকের বক্তব্য, গ্রাহকের আবেদন এবং প্রধান কার্যালয়ের ক্রেডিট কমিটির সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ৬ মাস বাড়িয়ে মার্চ ২০২৩ নির্ধারণ করা হয়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ১৭ এপ্রিল প্রকল্প বাস্তবায়নকাল ১২ মাস বাড়িয়ে প্রথম কিস্তি পরিশোধের সময় জুন ২০২৩-এর পরিবর্তে জুন ২০২৪ নির্ধারণ করে পঞ্চম পুনর্বিন্যাস করা হয়। প্রকল্পের অনুকূলে মঞ্জুর করা ২৫ কোটি টাকার অ্যাডহক সিসি (হাইপো) ঋণসীমার মেয়াদও ৩০ জুন ২০২৪ পর্যন্ত বাড়ানোর অনুমোদন দেওয়া হয়।

ব্যাংক কর্তৃপক্ষ বলছে, সিদ্ধান্ত পাওয়ার দুই সপ্তাহের মধ্যে গ্রাহক কর্তৃক ২ কোটি টাকা এবং প্রথম কিস্তির সমুদয় অর্থ ৩০ জুন ২০২৪-এর মধ্যে পরিশোধ নিশ্চিতের পর এই অনুমোদন কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু গ্রাহক অনুমোদনের শর্ত পরিপালন না করায় মঞ্জুরি কার্যকর হয়নি।

ফটক বন্ধ, ভেতরের সাইনবোর্ডে নেই ব্যাংকের নাম

বাণিজ্যিক অডিট টিম ২০২৫ সালের ১১ এপ্রিল প্রকল্পস্থল সরেজমিন পরিদর্শন করে। এ সময় কারখানার প্রধান ফটক পুরোপুরি বন্ধ পাওয়া যায়। কোথাও প্রতিষ্ঠানের নাম কিংবা প্রকল্পটি জনতা ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ, এমন কোনো সাইনবোর্ড ছিল না। ফলে ওই জায়গা প্রকৃতপক্ষে কনিকা কমার্শিয়ালের নিজস্ব কারখানা কি না, নিরীক্ষকদের কাছে তা স্পষ্ট হয়নি।

কারখানার সীমানাপ্রাচীরের বাইরে বাউন্ডারি দেওয়া ফাঁকা এক খণ্ড জমিতে অবশ্য ‘মেসার্স কনিকা কমার্শিয়াল লিমিটেড’-এর নামের একটি সাইনবোর্ড দেখতে পায় অডিট দল। স্থানীয় এক ব্যক্তি তাদের জানান, বাউন্ডারির ভেতরে সাইনবোর্ডের ওই জমি ছাড়া আশপাশের অন্য সব জমি ভিন্ন মালিকের। প্রকল্পস্থলে প্রতিষ্ঠানের নাম বা প্রকল্পটি জনতা ব্যাংকের কাছে দায়বদ্ধ মর্মে কোনো সাইনবোর্ড না থাকার বিষয়ে ব্যাংক কোনো জবাব দেয়নি বলে নিরীক্ষা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গ্রাহকের মেশিনারিজ আমদানি-সংক্রান্ত এলসি নথি এবং শাখার অসমন্বিত বিল অব এন্ট্রির তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, গ্রাহকের অনুকূলে স্থাপিত এলসির বিপরীতে বিল অব এন্ট্রি প্রায় দুই বছর ধরে অসমন্বিত রয়েছে। বিল অব এন্ট্রি হলো আমদানি করা পণ্য বন্দর থেকে খালাসের শুল্ক দলিল। ব্যাংক এলসির মূল্য পরিশোধ করলেও গ্রাহক বন্দর থেকে মালামাল ছাড় করেনি। তারপরও ব্যাংক প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়েছে।

ব্যাংক এলসির মূল্য পরিশোধের পরও গ্রাহক বন্দর থেকে মালামাল ছাড় না করার বিষয়টি প্রমাণ করে, প্রকল্প বাস্তবায়নে গ্রাহকের আগ্রহ নেই। নিরীক্ষাকালীন ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্প সমাপ্তি প্রতিবেদন (পিসিআর) সম্পন্ন হয়নি। ব্যাংক কর্তৃক এলসির মূল্য পরিশোধের পরও গ্রাহক কর্তৃক বন্দর থেকে বৈদেশিক মেশিনারিজ ছাড় না করার বিষয়ে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কোনো জবাব দেয়নি।

২০২৫ সালের ৩১ মার্চের হিসাবে কনিকা কমার্শিয়াল লিমিটেডের কাছে জনতা ব্যাংকের মোট অনাদায়ী দায়ের পরিমাণ ২৬৬ কোটি ২ লাখ টাকা। ঋণের প্রথম কিস্তি আদায় না হওয়া এবং কারখানার উৎপাদন শুরু না হওয়ায় সুদে-আসলে দায় বেড়েছে।

এর বিপরীতে সহজামানত হিসেবে, অর্থাৎ ঋণের বিপরীতে বন্ধক রাখা সম্পদ হিসাবে কনিকা কমার্শিয়ালের কাছ থেকে ব্যাংকে রাখা হয় মোট ১ হাজার ২০৪ দশমিক ৩২ শতক জমি। ২০২২ সালের ২৯ জানুয়ারি ব্যাংক এই জমির মূল্যায়ন করে। এতে জমির ফোর্সড সেল ভ্যালু বা বাধ্যতামূলক বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬৭ কোটি ৪৪ লাখ ৬ হাজার ৯০০ টাকা। ফলে ব্যাংকের পাওনা দায় ও বন্ধকী সম্পদের মধ্যে ঘাটতি দাঁড়ায় ১৯৮ কোটি ৫৮ লাখ টাকা।

অডিট পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, প্রকল্প চালু করতে না পারায় কারখানায় স্থাপিত বা আমদানি করা যন্ত্রপাতির আয়ুষ্কাল ক্রমান্বয়ে কমছে। অন্যদিকে জমির দাম সামান্য বাড়লেও ব্যাংক ঋণের সুদের কারণে দায়ের পরিমাণ ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। ফলে ব্যাংক ২৬৬ কোটি ২ লাখ টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।

ঋণ অনুমোদন, বিতরণ, তদারকি এবং পরে পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষ চারটি আইন, সার্কুলার ও শর্ত লঙ্ঘন করেছে। প্রথমত, বিআরপিডি সার্কুলার নম্বর-১৫-এর ৮(সি) ও ৮(বি) অনুচ্ছেদ উপেক্ষা করা হয়েছে। খেলাপিগ্রস্ত ঋণ হিসাবকে অনিয়মিতভাবে ঋণ পুনঃতপশিল ও পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শাখার ২০১৮ সালের ৪ মার্চের মঞ্জুরিপত্রের শর্ত নম্বর-১৭(ক) লঙ্ঘন করা হয়েছে। তৃতীয়ত, ব্যাংক কোম্পানি আইন লঙ্ঘন করে ঋণগ্রহীতাকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। চতুর্থত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত নীতিমালার সুস্পষ্ট ব্যত্যয় ঘটানো হয়েছে। নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অনিয়মের বিষয়ে দায় নির্ধারণসহ পুরো অর্থ আদায়ের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

কনিকা কমার্শিয়াল লিমিটেডের নামে নেওয়া ঋণ এবং প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করে এশিয়া পোস্ট। তবে বর্তমানে দায়িত্বশীল কাউকে না পেয়ে যোগাযোগ করা হয় কনিকা কমার্শিয়ালের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক গৌতম সাহার সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি ওই কোম্পানিতে চাকরি করতাম। ২০১৭-১৮ সালে বের হয়ে আসছি। এখন কোম্পানির কী অবস্থা, তা জানা নেই।’

কোম্পানিটির সঙ্গে বর্তমানে কারা সম্পৃক্ত আছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি সাবেক জিএম (ট্রেড) সিরাজুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন। পরে সিরাজুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘না, কোম্পানি চালু হয়নি। ওই অবস্থায় পড়ে আছে।’

কোম্পানির নামে নেওয়া ঋণের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সিরাজুল আলম বলেন, ‘আমি ট্রেডিং দেখতাম। আমার ট্রেডিং বন্ধ হয়ে গেছে। আমি বেকার। ফ্যাক্টরি সম্পর্কে কিছুই জানি না।’ যেখানে কোম্পানির সাইনবোর্ড ছিল সেখানে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল কি না। এমন জবাবে সিরাজুল আলম বলেন, ‘না।’

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে জনতা ব্যাংকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. ফেরদৌসের সঙ্গে যোগাযোগ করে এশিয়া পোস্ট। তিনি প্রশ্ন লিখে পাঠাতে বলেন। সে অনুযায়ী গত ১৫ অক্টোবর হোয়াটসঅ্যাপে তাকে প্রশ্ন লিখে পাঠানো হয়। পরে জানান, ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে প্রশ্ন পাঠিয়েছেন। জবাব পেলে ফরোয়ার্ড করবেন। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। কল দিয়েও সাড়া মেলেনি।