logo

মিরপুরে বিএনপি-আওয়ামী লীগ মিলে প্লট দখলের হিড়িক

এশিয়া পোস্ট স্পেশাল
মিরপুরে বিএনপি-আওয়ামী লীগ মিলে প্লট দখলের হিড়িক
প্রকল্প অফিস নামে এই স্থাপনার সামনে বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে বানানো বেষ্টনী রাখা হয়। জমি দখলে এগুলো বেষ্টনী ব্যবহার করা হয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

রাজধানীর মিরপুরে গত কয়েক দিনে রাতের আঁধারে বেশ কয়েকটি প্লটে দখলচেষ্টা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। এসব ঘটনায় ক্ষমতাসীন বিএনপির পাশাপাশি বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের নাম সামনে আসছে।

দুয়ারীপাড়ার ৮ নম্বর সেকশনের সম্প্রসারিত রূপনগর আবাসিক এলাকা। গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাতে টিনের বেষ্টনী দিয়ে সেখানে মো. সুমন হোসেন নামের একজনের প্লট ঘিরে ফেলা হয়। ভেতরে তোলা হয় অস্থায়ী ঘর।

এ ঘটনায় রূপনগর থানায় হওয়া জিডি ও অভিযোগের কপি বিশ্লেষণ করে কয়েকজন দখলদারকে শনাক্ত করেছে এশিয়া পোস্ট। তাদের মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় বিএনপি, যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

স্থানীয়রা জানান, গত ২৮ সেপ্টেম্বর রাত ৩টায় একদল ব্যক্তি প্লটে হানা দেয়। টিনের বেষ্টনী দিয়ে প্লটটি আটকে দেয় তারা। ভেতরে নির্মাণ করা হয় একটি স্থাপনা।

খবর পেয়ে প্লটের মালিক লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। স্থানীয়রা বলছেন, প্রায় প্রতি রাতেই কোনো না কোনো প্লটে দখলচেষ্টা চালায় দুর্বৃত্তরা। শুধু ব্যক্তি মালিকানাধীন প্লট নয়, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের অধিগ্রহণ করা জায়গায়ও বাদ যাচ্ছে না। এসব ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে।

সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গভীর রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে জমি দখলের তৎপরতা শুরু হয়। প্লট দখলের জন্য বাঁশ ও টিন দিয়ে আগে থেকেই বেষ্টনী তৈরি করে রাখা হয়। রাতের আঁধারে প্রথমে মানুষের প্লটে থাকা স্থাপনা ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে বেষ্টনী দিয়ে পুরো প্লট আবদ্ধ করে ফেলা হয়। ভেতরে তৈরি করা হয় অস্থায়ী টিনশেড ঘর। এরপর বস্তির কোনো একটি পরিবারকে সেখানে তুলে দেওয়া হয়। ওই পরিবারের সঙ্গে আগে থেকেই দখলদারদের চুক্তি থাকে।

একটি পরিবার উঠে গেলে প্লট উদ্ধার করতে গিয়ে বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয় আসল মালিকদের। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, রাতের আঁধারে যারা প্লট দখল করে, দিনের আলোয় তারাই আবার বিচারকের ভূমিকায় নামে। দখল করা প্লটে থাকা পরিবারকে অসহায় দেখিয়ে তারা তার পাশে দাঁড়ায়। আগে থেকে ম্যানেজ করা থানা-পুলিশও দখলদারদের পক্ষে থাকে।

রাতের আঁধারে প্লটে থাকা স্থাপনা ভেঙে বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। পরে ভেতরে অস্থায়ী টিনশেড ঘর তৈরি করা হয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট
রাতের আঁধারে প্লটে থাকা স্থাপনা ভেঙে বেষ্টনী দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। পরে ভেতরে অস্থায়ী টিনশেড ঘর তৈরি করা হয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

আশ্রিত পরিবারের পক্ষে কখনো কখনো প্লটের মালিকানা দাবি করে আদালতে রিট করা হয়। অন্যদিকে জায়গা উদ্ধারে প্রভাবশালীদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে থাকেন মূল মালিক। এক সময় বিরক্ত হয়ে আশা ছেড়ে দেন।

সরেজমিনে দুয়ারীপাড়ার ‘ক’ ব্লকের ২ নম্বর রোডে গিয়ে ‘প্রকল্প অফিস’ নামে দখলদারদের একটি অফিস দেখা যায়। তখন ভেতরে কেউ ছিলেন না। অফিসের সামনে বাঁশ, কাঠ ও টিন দিয়ে বানানো শতাধিক বেষ্টনী রাখা ছিল। স্থানীয়রা জানান, রাতের আঁধারে জমি দখলে এসব বেষ্টনী ব্যবহার করা হয়।

ক ব্লকের ৬ নম্বর রোডের ১৪ নম্বর প্লটের মালিক মো. সুমন হোসেন। সোমবার রাতে এই প্লটে দখলচেষ্টা চালানো হয়। সুমন হোসেন বলেন, ‘ভোরে মানুষ যখন গভীর ঘুমে থাকে তখন ওরা হামলা করে। সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) আমাদের প্লটে হামলা হয়। প্লটের স্থাপনা ভেঙে তারা ভেতরে বাঁশ, টিন ও কাঠ দিয়ে একটি স্থাপনা তৈরি করে। তবে সেখানে লোক উঠানোর আগেই খবর পাই। ভোর ৫টার দিকে লোকজন নিয়ে ঘটনাস্থলে যাই। আমাদের দেখে ওরা পালিয়ে যায়। পরে প্লটের ভেতরে বানানো স্থাপনা ভেঙে বাইরে ফেলে দেই।’

পুলিশের ভূমিকা নিয়ে তিনি বলেন, ‘থানায় গেলে ওসি মামলা নেয় না। ফোন দিলে পুলিশ পাঠায় না। তবে ৯৯৯ ফোন দিলে পুলিশ আসে।’

৬ নম্বর রোডের ৪ নম্বর প্লটের মালিক একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যসহ আরও কয়েকজন। তাদের একজন একটি বেসরকারি টেলিভিশনের উপস্থাপিকা। তার প্লটেও সাইনবোর্ড ভেঙে দখলচেষ্টা চালানো হয়।

ভুক্তভোগী নারী বলেন, ‘আমাদের প্লট দখল নিতে পারেনি। তবে বেষ্টনী ভেঙে আমাদের সাইনবোর্ড খুলে নিয়ে গেছে। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে আজ রাতেও হামলা করবে। এখন প্রতি রাতে কী এভাবে পাহারা দেওয়া সম্ভব?’

তিনি বলেন, ‘আমি ওসি সাহেবকে ফোন দিয়েছি। তিনি নাকি খাচ্ছেন। এরপর আর ফোন ধরেন না। ডিসি সাহেবকে ফোন দিলাম। তিনি আমাকে থানায় গিয়ে ওসিকে আমাকে ফোনে ধরিয়ে দিতে বললেন।’

৮ নম্বর সেকশনের ‘ক’ ব্লকের ৮ নম্বর রোডের ১০ ও ১১ নম্বর প্লটের মালিক মো. আকতার হোসেন ও আবুল কালাম আজাদ গং। তাদের দুটি প্লট সম্প্রতি বেদখল হয়েছে। ১১ নম্বর প্লটের ভেতরে তৈরি করা হয়েছে অস্থায়ী স্থাপনা। সরেজমিনে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) সেখানে ইটের গাঁথুনি তৈরি করতে দেখা যায়।

দখল করা প্লটের ভেতরে আব্দুর রহিম নামের একজনকে পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘আমাকে এখানে মোবারক মেম্বার উঠিয়েছে। আমার কাজ এই প্লট পাহারা দেওয়া। তারা আমাকে ৪-৫ হাজার টাকা বেতন দেয় মাসে।’

প্লটের মালিক তো অন্যজন, আপনি এখানে কীভাবে আছেন? এমন প্রশ্নে আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাকে উঠাই দিছে। আমি থাকতেছি। এখন আমি কি কারও সঙ্গে মারামারি করুম?’

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে গত এক সপ্তাহে আরও কয়েকটি প্লটে দখলদারদের তৎপরতার খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘খ’ ব্লকের ৪ নম্বর রোডের ৭ ও ১১ নম্বর প্লট। ‘ক’ ব্লকের ৯ নম্বর রোডের ৫ নম্বর প্লট, ৭ নম্বর রোডের ২২ নম্বর প্লট, ৮ নম্বর রোডের ১১ নম্বর প্লট, ২ নম্বর রোডের ৬ ও ৮ নম্বর প্লট এবং ৬ নম্বর রোডের ৪ নম্বর প্লট। একই অবস্থা ৫ নম্বর রোডের ৮, ১৬ ও ১১ নম্বর প্লট এবং ৬ নম্বর রোডের ১৬ নম্বর প্লটের।

রূপনগর থানায় হওয়া একাধিক জিডি ও অভিযোগের কপি বিশ্লেষণ এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে বেশ কয়েকজন দখলদারকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লা, ক্যান্টনমেন্ট থানা ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক পরিচয়দানকারী মো. সিয়াব উদ্দিন, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির নেতা কামাল ওরফে সিএনজি কামাল, রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ মামুন প্রমুখ।

তালিকায় রয়েছেন দুয়ারীপাড়া ইউনিট আওয়ামী লীগের সভাপতি মোবারক হোসেন মেম্বার, ভোলা বস্তি ইউনিট যুবদলের সভাপতি এরশাদ খোকনের নাম। রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক নেতা হুমায়ুন কবির স্বপন, ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সহসভাপতি জামাল ওরফে লাম্বা জামাল, দুয়ারীপাড়া ইউনিট আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা আইজলের নামও রয়েছে তালিকায়। মো. সোহেল, জান্নাতুল ফেরদৌস সুমি ও মো. রাজু (চান্দি রাজু) নামের কয়েকজনের নামও সামনে এসেছে।

তালিকায় আরও আছেন ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম (নজু), ভাষানটেক থানা যুবদল নেতা জাকির হোসেন শান্ত, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা ও বর্তমানে বিএনপি নেতা আব্দুল হক এবং ভোলা বস্তির ইউনিট যুবদল নেতা মো. আক্তার হোসেন।

এ ছাড়া রয়েছেন গালিব হোসেন আরিফ, সুমন (পিতলা সুমন), আজিজুল হক, দুলাল, মো. স্বপন, সোহেল আনসারী, আবুল কালাম আনসারী (জামাল), মো. বাশার, শফিক গং, জহিরুল ইসলাম গং, সাইফুল ইসলাম গং, জসিম (জামাই জসিম) গং, ইউসুফ ও সেলিম গং। শারমিন আক্তার, শিল্পী ওরফে খালিদা, মো. দুলার, এরশাদ খোকন গং, তরিকুল ইসলাম মইন গং এবং ৯২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি আমজাদ হোসেন মোল্লার নামও সামনে এসেছে।

যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা

সামগ্রিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে রূপনগর থানা বিএনপির আহ্বায়ক এম আশরাফ ইসলাম বলেন, ‘দলের নামে ভাঙিয়ে কোনো অনিয়ম বা চাঁদাবাজির সুযোগ নেই। এই ধরনের কাজ করলে সে যেই হোক কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। ডিরেক্ট ফায়ার করা হবে।’

তিনি বলেন, ‘কিছু ভুক্তভোগী আমার কাছে এসেছিলেন। আমি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিছু প্লট উদ্ধার করে দিয়েছি আমিনুল ভাইয়ের নির্দেশে।’

পুলিশের ভূমিকা প্রসঙ্গে এম আশরাফ ইসলাম বলেন, ‘এটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাজ। পুলিশ কেন ব্যবস্থা নেবে না? আপনারা এটা ওসি বা ডিসিকে সরাসরি প্রশ্ন করেন।’

রূপনগর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসভাপতি মোহাম্মদ মামুনের দাবি, এ ব্যাপারে তার কিছু জানা নেই। আর রূপনগর থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শিপু মোল্লাকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেনি।

রূপনগর থানার ওসি মোহাম্মদ নোমান হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে ব্যস্ততার কথা জানিয়ে এ বিষয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান তিনি।