প্রবাসী ভোট, মাসে ৬০ লাখ গুনেও পূর্ণাঙ্গ সেবা পায়নি ইসি

প্রবাসীদের ভোটগ্রহণের জন্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অনলাইন পদ্ধতি চালু করে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এই ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সহায়তার পেছনে মাসে ৬০ লাখ টাকা ব্যয় হলেও গত নির্বাচনে ব্যালটের লাইভ ট্র্যাকিং সিস্টেম কার্যকর করা সম্ভব হয়নি।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে গত ১৫ এপ্রিল অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রকল্পের পিআইসি সভায় উঠে আসে বিষয়টি। বিদেশে ভোটারদের জন্য অনলাইন ভোটিং সিস্টেম উন্নয়ন ও বাস্তবায়ন (ওসিভি-এসডিআই) নিয়ে এর আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেডের (বিডিসিসিএল) মাধ্যমে বর্তমানে নিরবচ্ছিন্ন আইটি সাপোর্ট নিচ্ছে ইসি। এর বিপরীতে মাসে গুনতে হচ্ছে ৬০ লাখ টাকা। পিআইসি সভায় অংশগ্রহণকারীরা এই ব্যয়কে বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যধিক বলে মত দেন। নিরবচ্ছিন্ন আইটি সাপোর্ট প্রয়োজন হলেও অত্যধিক ব্যয়ের বিষয়টি পুনর্বিবেচনার তাগিদ দেন তারা।
ব্যয় সংকোচনের পথ খুঁজতে সভায় কারিগরি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সাব-কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই কমিটি বর্তমান ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কম খরচে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ আছে কি না, সে বিষয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন দেবে। একই সঙ্গে প্রতিটি ভোটের বিপরীতে প্রকৃত ব্যয়ের তুলনামূলক চিত্র পরবর্তী সভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ডাকযোগে ব্যালট পাঠানোর পর সেটির অবস্থান জানতে কোনো লাইভ ট্র্যাকিং ব্যবস্থা কার্যকর ছিল না। ফলে ব্যালট ভোটারের হাতে পৌঁছেছে কি না, তা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। মোবাইল অ্যাপভিত্তিক ট্র্যাকিং সিস্টেম কার্যকর থাকলেও ব্যালট পরিবহনের সময় লাইভ ট্র্যাকিং চালু রাখা যায়নি।
পিআইসি সভায় জানানো হয়, বিভিন্ন দেশের ডাক বিভাগ স্থানীয় নীতিমালা মেনে ব্যালট বিতরণ করে। অনেক ক্ষেত্রে ম্যানুয়াল পদ্ধতির ওপর নির্ভর করা হয়, যা নির্ভুল ও সময়মতো ব্যবস্থাপনার পথে প্রতিবন্ধক। ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়নের (ইউপিইউ) মাধ্যমে ভোটার পর্যায়ে ট্র্যাকিং সুবিধাও কার্যকরভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রতিনিধি সভায় একজন বলেন, ‘পোস্টাল ব্যালট গ্রহণ ও পাঠানোর দিকগুলো ভোটারের জন্য কীভাবে আরও সহজ ও সুবিধাজনক করা যায়, তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি উপায় খুঁজে বের করতে হবে।’
সমস্যা সমাধানে ইউপিইউ এবং বিভিন্ন দেশের ডাক বিভাগের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে লাইভ ট্র্যাকিং চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ডাক অধিদপ্তরের সঙ্গেও একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের আলোচনা ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে।
ট্র্যাকিং ব্যর্থতার পাশাপাশি নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় বড় পরিসরে এসএমএসের অপব্যবহারও বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। বিদেশে একই ঠিকানায় একাধিক ভোটার নিবন্ধিত থাকায় ব্যালট বিতরণে তৈরি হয়েছে জটিলতা।
সমন্বিত প্ল্যাটফর্মের পরিকল্পনা
নানা জটিলতা সত্ত্বেও নির্বাচন কমিশন প্রবাসীদের ভোট ব্যবস্থাপনাকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসতে চায়। এশিয়া, ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পোস্টাল ভোটিং কার্যক্রম অব্যাহত রাখার পাশাপাশি প্রচার কার্যক্রম চালুর পরিকল্পনা রয়েছে কমিশনের।
মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর পাশাপাশি মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে বিপুলসংখ্যক প্রবাসীর কাছে সরাসরি ব্যালট পাঠানো কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা যাচাইয়ে পৃথক সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চালানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেসব দেশে ভোটার সংখ্যা ১০০-এর কম এবং বিদেশে কর্মরত সামরিক সদস্যদের জন্য অনলাইন ভোটিং চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
মোবাইল অ্যাপে জাতীয় পরিচয়পত্রসহ অন্যান্য সরকারি সেবা ও কমিউনিটি উন্নয়নের ফিচার যুক্ত করে এটিকে পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে পরিণত করতে চায় ইসি। প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সঙ্গে তাল মিলিয়ে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভোটার যাচাই নিশ্চিত করে ম্যানুয়ালি প্রিন্টেড ডিক্লারেশন ফর্ম বাতিলেরও প্রস্তাব আসে সভায়।
পিআইসি সভাপতি ও নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ বলেন, ‘খরচ কমিয়ে কীভাবে সিস্টেমটিকে আরও সহজ ও টেকসই করা যায়, সেই পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।’
প্রকল্পের ব্যয় ও ভোটের চিত্র
প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, ওসিভি-এসডিআই প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৯ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ ৩৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা। প্রকল্পের শুরু থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ২১ কোটি ৭১ লাখ টাকা।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন ৭ লাখ ৭২ হাজার ৬৪৬ জন, ভোট দিয়েছেন ৪ লাখ ৭১ হাজার ৯৭০ জন। অভ্যন্তরীণ পোস্টাল ভোটে নিবন্ধন ছিল ৭ লাখ ৬১ হাজার ১০৮ জনের, ভোট দিয়েছেন ৬ লাখ ৯ হাজার ৫২৪ জন।
২০২৬ সালের জুনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব জনবলকে প্রশিক্ষিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ সিস্টেমটি ইসির হাতে হস্তান্তর করা হবে ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে।
.png)

