logo

বিএনপি থেকে বহিষ্কারের চার মাসেই প্রত্যাহার, গাজীপুরের ‘নতুন ডন’ হালিম মোল্লা

বিএনপি থেকে বহিষ্কারের চার মাসেই প্রত্যাহার, গাজীপুরের ‘নতুন ডন’ হালিম মোল্লা
আবদুল হালিম মোল্লা। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগে গত বছর বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন গাজীপুর মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের তৎকালীন সদস্যসচিব আবদুল হালিম মোল্লা। ২০২৫ সালের ৬ জুলাই বহিষ্কারের প্রায় চার মাসের মাথায় একই বছরের ২৯ অক্টোবর তার বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এরপর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। চাঁদার দাবিতে মোটরসাইকেল বহর নিয়ে একের পর এক প্রতিষ্ঠানে হানা দিতে শুরু করে তার বাহিনী। স্থানীয়রা বলছেন, গাজীপুরের ‘নতুন ডন’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন আবদুল হালিম মোল্লা।

সন্ধ্যার পর চান্দনা চৌরাস্তার নিজ কার্যালয় থেকে সবকিছু তত্ত্বাবধান করেন আবদুল হালিম মোল্লা। তবে ছয়টি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা থাকা এই বিএনপি নেতা পুলিশের খাতায় ‘পলাতক’।

শুধু চাঁদাবাজি নয়, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া থেকে শুরু করে ফুটপাত দখলের মতো নানা ঘটনায় সামনে আসছে তার নাম। ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় মামলাও হয়েছে। তবে সবকিছুর পরও তাকে ‘খুঁজে পাচ্ছে না’ পুলিশ।

পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে, অনেক পুলিশ কর্মকর্তা সরাসরি তার ব্যাপারে কিছু বলার সাহস পান না। দু-একজন কথা বললেও এই প্রতিবেদকের কাছে তাদের নাম গোপন রাখার অনুরোধ জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপি নেতারা বলছেন, আবদুল হালিম মোল্লার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে মুখ দেখাতে পারছেন না তারা।

তার বিষয়ে মুখ খুলতে কেন ভয় পায় সবাই, সরেজমিনে এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে বেরিয়ে আসে তার ‘ক্ষমতাধর বাহিনীর’ কথা। বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের লোকজন থেকে শুরু করে খুনের মামলার আসামি পর্যন্ত রয়েছেন। সন্ধ্যার পর চান্দনা চৌরাস্তার নিজ কার্যালয় থেকে সবকিছু তত্ত্বাবধান করেন আবদুল হালিম মোল্লা।

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে চাঁদাবাজি ও দখলদারি নিয়ন্ত্রণে চান্দনায় হালিম মোল্লার অন্তত চারটি অফিসের খোঁজ পাওয়া গেছে। চান্দনা চৌরাস্তায় শহীদ একাডেমির পাশে খুলে বসেছেন আলিশান অফিস। একই এলাকার হাজী মার্কেটে দুটি এবং মোগরখালে মিমের গলিতে একটি অফিসে নিয়মিত বাহিনী নিয়ে বসেন। স্থানীয় সূত্র বলছে, এগুলোর একেকটির পেছনে অন্তত কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে হালিম মোল্লার এসব অফিস চাঁদাবাজি, দখলদারির আখড়া ও টর্চার সেল হিসেবে পরিচিত। তবে নিজের অপকর্ম ঢাকতে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করছেন দলীয় ব্যানার।

চাঁদার দাবিতে কাজ বন্ধের নির্দেশ

গাজীপুর মহানগরের ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের ফুলউইন গার্মেন্টস লিমিটেডে সম্প্রতি হানা দেয় হালিম মোল্লার বাহিনী। গত ১২ সেপ্টেম্বর প্রতিষ্ঠানটির নির্মাণাধীন অংশে হানা দেয় হালিম মোল্লার বাহিনী। ২০-২৫টি মোটরসাইকেলে ৫০-৬০ জন কারখানায় ঢুকে মোটা অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। এ সময় তারা নিজেদের হালিম মোল্লার লোক পরিচয় দেয়। চাঁদা দেওয়ার আগ পর্যন্ত কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় এক মাসের বেশি সময় ধরে নির্মাণাধীন অংশটির কাজ বন্ধ রয়েছে। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিতে ভোগড়া বাইপাসের আরেকটি তৈরি পোশাক কারখানায় দফায় দফায় হানা দিচ্ছে হালিম মোল্লার বাহিনী।

ফুলউইনের ঘটনাটি মহানগর পুলিশ কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারকে জানানো হয়। স্থানীয় সংসদ সদস্য মজিবুর রহমানেরও শরণাপন্ন হয় কারখানা কর্তৃপক্ষ। তাদের পক্ষ থেকে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও হালিম মোল্লার প্রভাবের কথা চিন্তা করে সে পথে এগোয়নি কারখানাসংশ্লিষ্টরা।

মোটরসাইকেল মহড়া দিয়ে আবদুল হালিম মোল্লার বাহিনীর সদস্যদের সেদিন কারখানায় যাওয়ার পুরো দৃশ্য সিসি ক্যামেরাতে ধরা পড়ে। ওই ফুটেজের সূত্র ধরে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত করেছে এশিয়া পোস্ট। স্থানীয়রা জানান, কালা নাজমুল ওরফে ডিশ নাজমুলের নেতৃত্বে নেওয়াজ মাহমুদ, পিস্তল শাজাহান, ছাব্বির, কালা জাহাঙ্গীর ও হুমায়ুনসহ অনেকে সেদিন ওই মহড়ায় অংশ নেন। এর মধ্যে নেওয়াজ মাহমুদ আগে স্বেচ্ছাসেবক লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

ভোগড়া বাইপাসের কারখানাটিতে হানা দেওয়ার দৃশ্যও সিসি ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও পুলিশকে জানালেও আতঙ্কমুক্ত হতে পারছে না কারখানা কর্তৃপক্ষ।

পুলিশ কমিশনার বরাবর ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের অভিযোগ
পুলিশ কমিশনার বরাবর ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলামের অভিযোগ

কারখানা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ঝুট ব্যবসায় চুক্তিবদ্ধ ব্যবসায়ী শফিকুল ইসলাম বাসন থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। এর বাইরে পুলিশ কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগকারী নিজেও বাসন থানা বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

এর আগে বাইপাস রোডে বাসন থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক আমিনুল ইসলামের নিয়ন্ত্রণে থাকা মাস্টহেড নামের একটি কারখানার ঝুট ব্যবসা দখলের ঘটনায় হালিম বাহিনীর নাম সামনে আসে।

স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের কয়েকজনকে নিয়ে দুই বছর ধরে লুইট্যাক্স কারখানায় ঝুট ব্যবসা করছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা তুষার খান। ২৫ অক্টোবর দিনদুপুরে হালিম মোল্লা ও তার বাহিনীর সদস্যরা বলপূর্বক প্রতিষ্ঠানটির ঝুট নিয়ে যায়।

ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের বর্ষা সিনেমা হলের পাশে দীর্ঘদিন ধরে কলোটেক্স নামের একটি পোশাক কারখানা করেন স্থানীয় বাসিন্দা বুলবুল। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ‘ফ্যাসিবাদের দোসর’ আখ্যা দিয়ে মারধর করা হয় তাকে। পরে বুলবুলের নিয়ন্ত্রণে থাকা কারখানার ঝুট ব্যবসার দখল নেয় হালিম মোল্লা ও তার বাহিনী।

সোয়েটার্স, ইকো ফ্যাব, টি অ্যান্ড জেড, আলিফ ক্যাজুয়াল, কলম্বিয়া অ্যাপারেলস, ব্রাদার্স, ওডেসা সোয়েটার্স, সান ফার্মা, এসকেএম, বিমান, লিরিক, ম্যানাল, ইন্টারম্যাক্স, ডডিসহ দেড় শতাধিক কারখানার ঝুট ও বর্জ্যসমাগ্রীর ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নেন আবদুল হালিম মোল্লা। বাসন থানা ছাড়িয়ে গাছা ও টঙ্গী এলাকার কারখানায়ও হালিম বাহিনীর হানা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চান্দনা চৌরাস্তার কাঁচাবাজার দখল করে সেখান থেকে নিয়মিত চাঁদা তোলে হালিম বাহিনী। এর বাইরে চৌরাস্তা ও কড্ডা বাজারে আরও দুটি কাঁচাবাজার দখলের পাঁয়তারা চলছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। চৌরাস্তা কেন্দ্রীয় মসজিদ মাঠে ফুটপাত বসিয়ে প্রায় দুই বছর ধরে চাঁদাবাজি করা হচ্ছে।

বাড়িঘর নির্মাণ থেকে শুরু করে অটোরিকশার ব্যবসা, এমনকি ময়লার ব্যবসায়ও থাবা বসিয়েছেন হালিম মোল্লা। এ ছাড়া মালেকেরবাড়ি ও ভোগড়া এলাকায় খাস পুকুরপাড়ে অবৈধ দোকান বসিয়ে এবং বাসা নির্মাণ করে ভাড়া তোলা হচ্ছে।

চান্দনা চৌরাস্তা ও আশপাশের এলাকায় হালিম ও তার বাহিনীর ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। চৌরাস্তায় সাংবাদিক আসাদুজ্জামান তুহিন হত্যা মামলার আসামি কেটু মিজান ও তার সহযোগীরা হালিম মোল্লার বাহিনীর সদস্য ছিল।

ক্ষুব্ধ স্থানীয় বিএনপি নেতারা

পুলিশের খাতায় তালিকাভুক্ত হালিম মোল্লার বর্তমান অবস্থা যাচাই করতে গত সপ্তাহে একাধিকবার চান্দনা চৌরাস্তায় তার কার্যালয়ে খোঁজ নেয় এশিয়া পোস্ট। এ সময় দেখা যায় কার্যালয় ঘিরে তার বাহিনীর সতর্ক প্রহরায়। রয়েছে সিসি ক্যামেরার নজরদারি। অপরিচিত কেউ গেলে তাকে জেরার মুখে পড়তে হয়। কৌশলে তাই হালিম মোল্লার ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পান এই প্রতিবেদক। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বাহিনী নিয়ে এখানে অবস্থান করেন আবদুল হালিম মোল্লা।

হালিম মোল্লা সম্পর্কে বাসন থানা বিএনপির সভাপতি, সেক্রেটারি, মহিলা দলের সভানেত্রীসহ ১০ জন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে পরিচয় গোপন রেখে কথা বলেন এই প্রতিবেদক। তাদের সবাই তাকে সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজ হিসেবে উল্লেখ করেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে মহানগর যুবদলের শীর্ষস্থানীয় দুই নেতা বলেন, ‘হালিম মোল্লা শহরে ডন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।’ মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শাহাদাত হোসেন শাহিন বলেন, ‘আমি কোনো কথা বলব না। আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন।’

এক ব্যবসায়ীকে তুলে নেওয়ার ঘটনায় সম্প্রতি হালিম মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা নিয়েছে পুলিশ। বাদী আমিরুল ইসলাম বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য মজিবুর রহমানের চাপের মুখে ওই মামলা নিয়েছে পুলিশ।

আমিরুল ইসলাম জানান, মজলিশপুর এলাকায় একটি প্রজেক্টে বালু ভরাটের কাজকে কেন্দ্র করে তাকে হালিম মোল্লার অফিসে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে তাকে কাজটি ছেড়ে দিতে বলা হয়। রাজি না হলে আটকে রেখে মারধর এবং বুকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করার হুমকি দেয় সন্ত্রাসীরা। একপর্যায়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে মামলা দিয়ে তাকে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে জামিনে এসে সংসদ সদস্যের সহায়তায় বাসন থানায় মামলা করেন।

গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশের প্রতিবেদন অনুযায়ী তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী হিসেবে হালিম মোল্লার বিরুদ্ধে ছয় মাসের আটকাদেশ রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র এশিয়া পোস্টকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে গাজীপুর মহানগর পুলিশের উত্তর বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘হালিম মোল্লা পুরো মহানগরের আতঙ্ক। সাধারণ মানুষ ভয়ে মুখ খোলে না। তারপরও দুই একজন থানায় অভিযোগ নিয়ে হাজির হন। বিশেষ করে বাসন থানায়। কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে মামলা হয় না। ফলে পুলিশ ইচ্ছা করলেও তাকে গ্রেপ্তার করতে পারে না। রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় পুলিশও কিছুটা নমনীয়।’

টঙ্গীর সেটার্ন কারখানায় ঝুট দখল কেন্দ্র করে ২০২৫ সালের ২৮ জুন সংঘর্ষ, গোলাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। ওই ঘটনার জেরে হালিম মোল্লাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। তখন কিছুদিন তার তৎপরতা স্তিমিত ছিল। তবে চার মাসের মাথায় বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করায় তিনি আরও বেপরোয়া হয়ে পড়েন।

মহানগর পুলিশের আরেকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর হালিম মোল্লার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগে অর্ধ ডজন মামলা হয়েছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকায় তিনি মহানগরের শীর্ষ সন্ত্রাসী। দলীয় লেবাসে অপকর্ম করে দলকে ডোবাচ্ছেন। দলই পারে তাকে থামাতে। কিন্তু স্থানীয় রাজনীতির একটি অংশ তাকে শেল্টার দিচ্ছে।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পুলিশ সদস্য, রাজনীতিক ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবদুল হালিম মোল্লার সঙ্গে নগর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতার সুসম্পর্ক রয়েছে। তার আশীর্বাদে রাস্তাঘাটের উন্নয়নকাজ, হাটবাজার এমনকি ফুটপাতও ইজারা নিচ্ছেন হালিম মোল্লা।

মহানগর বিএনপির শীর্ষস্থানীয় একজন নেতা বলেন, ‘ও (আবদুল হালিম মোল্লা) দলের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছে। তাকে থামাতে না পারলে সাধারণ মানুষের কাছে মুখ দেখানো যাচ্ছে না।’

মাদক ও ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাসন সড়ক এলাকার ফুটপাতের একজন হকার বলেন, ‘হালিম মোল্লার অন্যতম সহযোগী হাবিবুল্লাহ বেলালী এই এলাকা নিয়ন্ত্রণ করেন। বেলালী ফুটপাত থেকে শুরু করে এমন কোনো জায়গা নেই, যেখানে চাঁদাবাজি করেন না। এমনকি ডিম বিক্রেতার কাছ থেকেও কমিশন নেন।’

শুধু বাসন এলাকা নয়; পুরো গাজীপুরেই নিজের বাহিনী গড়ে তুলেছেন হালিম মোল্লা। চৌরাস্তার কাঁচাবাজার নিয়ন্ত্রণ করেন বাসন থানা বিএনপি নেতা শওকত বাবু। সেলিম মোল্লা ডিম সিন্ডিকেট, নাজমুল ইসলাম বাবু অটোরিকশা ও সিএনজি এবং লুৎফর রহমান ফরহাদ ‘দাঙ্গা পার্টি’ নিয়ন্ত্রণ করেন। স্বেচ্ছাসেবক লীগ থেকে দলে ভেড়া মাহমুদ নেওয়াজ ফ্যাক্টরির সামনের ‘গ্যাঞ্জাম’ নিয়ন্ত্রণ করেন।

সব গ্রুপের নিয়ন্ত্রক সাইফুল, লুৎফর, ফরহাদ, মাসুদ, হারুন ও শামীম। এর মধ্যে মাসুদ রানা অন্তত অর্ধশত কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। কোটি টাকার সম্পদ কিনেছেন চান্দনা এলাকায়। শ্বশুরবাড়ি পিরোজালি এলাকায়ও নামে-বেনামে বিপুল সম্পদ কিনেছেন। চলাফেরা করেন দামি গাড়িতে।

মাদক ব্যবসা, ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ও ফুটপাথের চাঁদা, সবকিছুর টাকার তদারকি করেন মাসুদ। যখন-তখন যাকে-তাকে মারতে অস্ত্র বের করেন। মাসুদ রানাকে হালিম মোল্লার এক নম্বর হাতিয়ার বলা হয়।

হালিম মোল্লার গাড়িচালকের ভূমিকায় থাকলেও মাদক ব্যবসা দেখভাল করেন হারুন। শেরপুরের কামারেরচর ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনের পোস্টারও সাঁটিয়েছেন। হালিম মোল্লার সিন্ডিকেটে প্রথম সারিতে থাকা বেশির ভাগই শেরপুর ও ময়মনসিংহ এলাকার বাসিন্দা।

এর বাইরে এলাকাভিত্তিক আলাদা দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়। তারা নিজ নিজ এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে। হালিম মোল্লার আপন ভাই সেলিম মোল্লা বিচার-সালিশ দেখেন। জমিজমা এবং পারিবারিক ঝগড়াঝাঁটি মেটানোর নামে সেলিম নিজেও আলাদা একটি গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করেন।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে হালিম মোল্লা ও সেলিম মোল্লার জীবনযাপন ছিল আর ১০ জন সাধারণ মানুষের মতো। তবে এখন হালিম মোল্লা চড়েন প্রাডোতে। আরেকটি দামি গাড়ি আছে। সেলিম কিনেছেন জিপ। চান্দনা চৌরাস্তায় ট্রিপ্লেক্স বাড়ির কাজে হাত দিয়েছেন হালিম মোল্লা। এর মধ্যে তিনতলার নির্মাণকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। নামে-বেনামে অন্তত ১৫টি প্লট কিনেছেন হালিম মোল্লা। বায়না করা আছে আরও প্রায় ১০টি প্লট।

অভিযোগ অস্বীকার আবদুল হালিম মোল্লার

সামগ্রিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে নিজের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সব অভিযোগ অস্বীকার করেন আবদুল হালিম মোল্লা। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আপনারা কাগজপত্র দেখেন, অভিযোগগুলো দেখেন এবং ঝুট ব্যবসার বিষয়ে যেগুলো বলা হচ্ছে, সেগুলোর সত্য-মিথ্যা যাচাই করেন। আমি কোনো জায়গায় চাঁদাবাজি করি না, চাঁদাবাজির সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আপনারা সঠিক তথ্য নেন এবং প্রমাণ উপস্থাপন করেন।’

মাসুদ রানার বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল হালিম বলেন, ‘মাসুদ রানা দুজন আমার সঙ্গে আছে। একজন আমার ছোট ভাই। আরেকজন আমাদের সঙ্গে রাজনীতি করে।’

ফুলউইন গার্মেন্টসের নির্মাণাধীন ভবনে মহড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে বলেন, ‘কোন জায়গায়?’ পরে বিস্তারিত উল্লেখ করা হলে বলেন, ‘আমি গেছি? ভিডিও ফুটেজ আছে? কোনো প্রমাণ ছাড়া এসব কথা বলা হচ্ছে কেন? আমাকে প্রমাণ করে দেখান। কেউ যদি বলে থাকে, তাহলে সেটার প্রমাণ দেখান।’

আমিরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তিকে অফিসে ডেকে নিয়ে মারধর এবং অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলির হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে আব্দুল হালিম বলেন, ‘এগুলো মিথ্যা কথা। ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করেন। হয়তো আমাদের বিরুদ্ধে কিছু করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে বিদেশি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করেন আবদুল হালিম মোল্লার সহযোগী মাসুদ রানা। ওই নম্বরের হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার কল দিয়ে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠানো হলেও সাড়া মেলেনি।

গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার ইসরাইল হাওলাদারকে একাধিকবার কল দিয়ে পাওয়া যায়নি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।