logo

জুলাইয়ে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম হত্যা মামলার আসামি এখন চট্টগ্রাম এনসিপির শীর্ষ নেতা

জুলাইয়ে ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম হত্যা মামলার আসামি এখন চট্টগ্রাম এনসিপির শীর্ষ নেতা
চলতি বছরের ১৪ মে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ পান একেএম জিয়াউদ্দিন ওরফে জিয়া রনি। ইনসেটে জুলাই শহীদ ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

জুলাই অভ্যুত্থানে চট্টগ্রামের প্রথম শহীদ ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম। ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মুরাদপুর এলাকায় বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গুলিবিদ্ধ হন। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই হত্যা মামলায় গত বছর গ্রেপ্তার হওয়া একেএম জিয়াউদ্দিন এখন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক। কমিটিতে তার নাম জিয়া রনি। একাধিক নথি পর্যালোচনা করে এশিয়া পোস্ট নিশ্চিত হয়েছে, জিয়া রনি ও একেএম জিয়াউদ্দিন একই ব্যক্তি।

২০২৫ সালের ২৩ জুন একেএম জিয়াউদ্দিনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জামিনে মুক্তি পেয়ে চলতি বছরের ১৪ মে চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়কের পদ পান জিয়া রনি।

২০২৬ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির রিকশা শোভাযাত্রায় একেএম জিয়াউদ্দিন (ডান থেকে দ্বিতীয়)। ছবি: সংগৃহীত
২০২৬ সালের ৪ আগস্ট চট্টগ্রাম মহানগর এনসিপির রিকশা শোভাযাত্রায় একেএম জিয়াউদ্দিন (ডান থেকে দ্বিতীয়)। ছবি: সংগৃহীত

জুলাই অভ্যুত্থানের পর ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট শহীদ মো. ওয়াসিম আকরাম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় চট্টগ্রামের পাঁচলাইশ মডেল থানায় মামলা হয়। মামলা নম্বর ১৮। বাদী ছিলেন নিহতের মা মোসাম্মৎ জোসনা আক্তার।

২০২৫ সালের ২৪ জুন এজাহারভুক্ত আসামিসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতে হাজির করে পুলিশ। চালান নথি অনুযায়ী, প্রথম তিনজন হলেন আশরাফ চৌধুরী মুন্না, আরিফ শওকত ও সজিব হাসাম। চতুর্থ জন হলেন একেএম জিয়া উদ্দিন (৪৪)। মূল এজাহারে নাম না থাকলেও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পুলিশের প্রতিবেদনে জিয়াউদ্দিন সম্পর্কে বলা হয়, তিনি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক ২৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর আবদুস সবুর লিটনের ঘনিষ্ঠ সহচর। এ ছাড়া চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।

তারা টোব্যাকোর মালিক চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা ও চসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র আব্দুর সবুর লিটনের (সেলফি তোলা ব্যক্তি হ্যাট পরা) সঙ্গে একেএম জিয়াউদ্দিন (সামনে মাঝে)। ছবি: সংগৃহীত
তারা টোব্যাকোর মালিক চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা ও চসিকের সাবেক প্যানেল মেয়র আব্দুর সবুর লিটনের (সেলফি তোলা ব্যক্তি হ্যাট পরা) সঙ্গে একেএম জিয়াউদ্দিন (সামনে মাঝে)। ছবি: সংগৃহীত

গত বছরের ২৬ জুন জিয়াউদ্দিনকে আবার আদালতে হাজির করে পাঁচ দিনের রিমান্ড চায় পুলিশ। রিমান্ড আবেদনে তার বিস্তারিত পরিচয় উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, তিনি চট্টগ্রামের চান্দগাঁও ফরিদারপাড়া এলাকার নজু মিয়া মহলের আবুল কালাম সামশুদ্দিনের সন্তান।

সংযুক্ত নথির বিবরণ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই মুরাদপুরের বারকোড রেস্টুরেন্টের সামনে ছাত্র-জনতার শান্তিপূর্ণ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলছিল। এতে অংশ নেন ছাত্র ওয়াসিম আকরাম। পূর্বপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনায় আসামিরা সশস্ত্র আক্রমণ চালান। তারা এলোপাতাড়ি গুলিবর্ষণ ও বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেন। এ সময় আসামিদের ছোড়া গুলি ওয়াসিমের পেটে লাগে। তিনি গুরুতর রক্তাক্ত জখম হন। পরে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

তদন্তে ওয়াসিম হত্যাকাণ্ডে জিয়াউদ্দিনের কী ধরনের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে? এমন প্রশ্নে তদন্ত কর্মকর্তা পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক নুরুজ্জামান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তদন্তাধীন বিষয়ে কথা বলতে চাই না।’

চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ আদালতের নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৭ জুলাই ফৌজদারি বিবিধ (মিস) মামলা নম্বর ৪৫২৫/২৫-এর আদেশের ভিত্তিতে জিয়াউদ্দিন জামিন লাভ করেন। পুলিশ রিপোর্ট জমা দেওয়া পর্যন্ত এই জামিন মঞ্জুর হয়। বর্তমানে তিনি ওই মামলায় নিয়মিত হাজিরা দিচ্ছেন।

গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের মধ্যে কারা জামিনে আছেন, এ বিষয়ে নুরুজ্জামান বলেন, ‘এই মামলায় গ্রেপ্তার আসামিদের কারা জামিনে আছেন এই বিষয়ে আমার কাছে তথ্য নেই। জামিনের কাগজ আসে না আমাদের কাছে।’

নুরুজ্জামান এই মামলার পঞ্চম তদন্ত কর্মকর্তা। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মামলায় এখন পর্যন্ত ১৪০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন।

এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে একেএম জিয়াউদ্দিন। বাঁ থেকে চতুর্থ। ছবি: সংগৃহীত
এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে একেএম জিয়াউদ্দিন। বাঁ থেকে চতুর্থ। ছবি: সংগৃহীত

জুলাই অভ্যুত্থানের অনেক মামলায় গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের অব্যাহতি দিতে বাদীর পক্ষ থেকে সুপারিশের ঘটনা ঘটেছে। এই মামলায় এ ধরনের কোনো আবেদন আদালতে জমা পড়েছে? এমন প্রশ্নে নুরুজ্জামান বলেন, ‘না এই ধরনের কোনো আবেদন দেওয়া হয়নি। গ্রেপ্তারকৃত কেউ মামলা থেকে বাদ গেছেন, এমন হয়নি এখন পর্যন্ত।’

তদন্ত প্রতিবেদন কবে নাগাদ জমা দেওয়া হতে পারে, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটি নিশ্চিতভাবে বলতে পারছি না। ফরেনসিকের কিছু কাজ আছে। শেষ হলে দিয়ে দেব।’

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে একেএম জিয়াউদ্দিন শুরুতে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই মামলায় আমাকে চার্জশিট থেকে বাদ দিয়েছে।’ পরে মামলার চার্জশিট এখনও হয়নি জানালে তিনি বলেন, ‘ইন্টেরিমের সময় এসব নিয়ে কি আইন হয়েছিল না। সেগুলোতে আমি বাদ গেছি। আমার আইনজীবী এই বিষয়ে জানে।’

একপর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আপনি কীভাবে নিশ্চিত হলেন আমি এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছি। নিশ্চিত হলে আপনি লিখে দেন। এর পরে আমার যা করার আমি তা করব। আপনার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতে আমি ইন্টারেস্টেড না। বাধ্যও না।’

চট্টগ্রামে এনসিপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্র এশিয়া পোস্টকে জানিয়েছে, কমিটিতে আসার আগে একেএম জিয়া উদ্দিন ওরফে জিয়া রনি দলীয় সম্পৃক্ততার বিষয়ে তাদের জানা নেই।

২০২৬ সালের ১৪ মে এনসিপির চট্টগ্রাম মহানগর আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদিত হয়। এতে স্বাক্ষর করেন দলের সদস্যসচিব আখতার হোসেন এবং মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) মো. আবুল হাসনাত। অনুমোদিত কমিটির ‘যুগ্ম আহ্বায়ক’ তালিকায় ‘জিয়া রনি’র নাম রয়েছে।

কমিটির প্রথম পাতায় আহ্বায়ক, দুই সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ১৫ যুগ্ম আহ্বায়কের নাম আছে। বাকি সবার পূর্ণ নাম ও মোবাইল নম্বর দেওয়া থাকলেও জিয়া রনির নামের পাশে কোনো নম্বর নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনসিপির একজন নেতা বলেন, ‘ওই কমিটির তালিকা দেখলেই বোঝা যায় শেষ মুহূর্তে তড়িঘড়ি করে তার নামটা বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর আগে তাকে সেভাবে চিনতামও না।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, মামলা ও পুলিশের নথিতে সাবেক যুবলীগ সমর্থক ও হত্যা মামলার আসামি হিসেবে চিহ্নিত একেএম জিয়াউদ্দিনই এনসিপির কমিটির জিয়া রনি।

ওয়াসিম হত্যা মামলা নিয়ে কথা হয় শহীদের বাবা শফিউল আলমের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমাদেরকে সবাই বলির পাঁঠা বানিয়েছে। কতজন কতভাবে যে আমাদের নিয়ে ব্যবসা করেছে। কতভাবে প্রতারণা করেছে। এগুলো নিয়ে আর কথা বলতে চাই না। শুধু এটুকু বলব, আমার ছেলের হত্যার বিচারটা যেন ঠিকভাবে হয়। যারা দোষী না তাদের হয়রানি যেন না করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘একবার ঢাকা যাওয়ার পর একজন পথে এনসিপির অফিস দেখাল। ভাবলাম আমার ছেলের জন্য তারা এত কিছু করেছে। একটু দেখা করে আসি। সেটার ভিডিও করে তারা প্রচার করেছে আমি এনসিপিতে যোগ দিয়েছি। অথচ আমি কোনো দলের বিষয়ে আগ্রহী না। এলাকার সন্তান হিসেবে সালাউদ্দিন আহমেদের প্রতি ভালোবাসা আছে। এর বেশি কিছু না। ওদের নিয়ে কিছু বলতে চাই না।’

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক জহির উদ্দিন বাবর বলেন, ‘রাজপথে জুলাইয়ের প্রথম দিকের একজন শহীদ ছাত্রদলের ওয়াসিম। সেই হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে জেল খাটা একজনকে দলীয় পদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে এনসিপি জুলাইয়ের সঙ্গে গাদ্দারি করল। অথচ তারা দাবি করে জুলাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্টেকহোল্ডার তারা। এনসিপির শীর্ষ নেতারা এই বিষয়ে জাতিকে ব্যাখ্যা দেবে এটাই আমাদের দাবি।’

জুলাইয়ের একজন শহীদের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি চট্টগ্রাম এনসিপিতে পদ পাওয়ার বিষয়ে কথা হয় দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সুজা উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ওই মামলায় তার (জিয়াউদ্দিন) নামে কোনো চার্জশিট হয়নি। তবে এ বিষয়ে বারবার নানা কথা আসছে, দলের মহানগর কমিটি এবং তার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে বিস্তারিত জানানো যাবে।’

তিনি বলেন, ‘আগের কিছু ব্যবসার সুবাদে অনেকের সঙ্গে তার ছবি থাকতে পারে। তবে এ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য এখনো হাতে আসেনি। দীর্ঘদিন ধরে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন লোকজন তাকে হেনস্তা করার চেষ্টা করেছে।’