বিপাকে চালডাল: আটকে দিয়েছে বিনিয়োগকারীদের টাকা

আটকে আছে বিনিয়োগকারীদের কয়েক কোটি টাকা। মার্চেন্টদের পাওনা বকেয়া। ঠিকমতো বেতন পাচ্ছেন না কর্মীরা। এমন বহুমুখী সংকটের কবলে পড়েছে অনলাইন গ্রোসারি প্রতিষ্ঠান চালডাল ডটকম। নতুন বিনিয়োগ না এলে পুরোনো পাওনাদারদের অর্থ ফেরত দেওয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ক্রাউড ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে শত শত সাধারণ বিনিয়োগকারীর কাছ থেকে ৪ কোটি টাকা সংগ্রহ করে চালডাল। চুক্তি অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে লাভসহ মোট ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা ফেরত দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেই অর্থ এখনও পরিশোধ হয়নি।
বিনিয়োগকারীদের টাকা আটকা
বিনিয়োগ ডট আইও নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করে চালডাল। প্ল্যাটফর্মটির মূল প্রতিষ্ঠান পিউর ফিনটেক লিমিটেড। পিউর ফিনটেকের পরিচালক মোহাম্মদ সাঈদুল ইসলাম এবং চালডালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াসিম আলীম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিপত্রের একটি কপি এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে।
প্রায় ছয় মাস মেয়াদের এই চুক্তি অনুযায়ী, ৪ কোটি টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে পিউর ফিনটেককে ৪ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধ করবে চালডাল। সেই অর্থ থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মুনাফার অংশ বুঝিয়ে দেবে পিউর ফিনটেক।
প্রথম কিস্তির ১৯ লাখ ৭৮ হাজার ২০০ টাকা গত বছরের ২৫ নভেম্বর পরিশোধ করা হয়। বাকি ৪ কোটি ১৯ লাখ ৮১ হাজার ৮০০ টাকা পরিশোধের নির্ধারিত তারিখ ছিল গত ২৪ ফেব্রুয়ারি। সেই অর্থ এখনও আসেনি।
বিনিয়োগকারীরা পিউর ফিনটেকের দ্বারস্থ হলে চালডালের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ভিন্ন উৎস থেকে নতুন বিনিয়োগ না আসায় পুরোনো বিনিয়োগের অর্থ পরিশোধ করতে পারছে না চালডাল। উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য বিশেষ করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কথা জানায় অনলাইন গ্রোসারি প্রতিষ্ঠানটি।
বিনিয়োগ ডট আইওর মাধ্যমে চালডালে বিনিয়োগ করা ব্যবসায়ী জোবায়ের আল মাহমুদ বলেন, ‘আমাদের টাকা দিয়ে পণ্য কিনেছে চালডাল। প্রমাণ হিসেবে সেগুলোর ছবি আমাদের দিয়েছে। সেই পণ্য বিক্রি করে আমাদের অর্থ পরিশোধের কথা। অন্য বিনিয়োগকারীদের থেকে নতুন বিনিয়োগ আসবে, তারপর আমাদের দেবে; এমন হওয়ার কথা না। এভাবে তো বিনিয়োগ হয় না।’
তিনি জানান, সর্বশেষ গত ২৯ মার্চ মুনাফাসহ মূলধন দেওয়ার কথা ছিল চালডালের। কিন্তু এখনও তারা বিষয়টির সমাধান করছে না।
মার্চেন্টের পণ্যও আটকা
বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি পণ্য সরবরাহকারীরাও তাদের পাওনা টাকা পাচ্ছেন না। রাজশাহীর ব্যবসায়ী শাওন শাহরিয়ার গত বছরের ডিসেম্বরে তার প্রতিষ্ঠান ফিউচার ফারমার্স এগ্রোটেকের মাধ্যমে চালডালকে গুড় সরবরাহ শুরু করেন। প্রথমে সাড়ে চার লাখ টাকার পণ্য দেন তিনি।
চালডাল জানায়, এর মধ্যে ৯২ হাজার টাকার গুড় বিক্রি হয়েছে এবং সেই অর্থ ১০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে পরিশোধ হবে; কিন্তু তা আর হয়নি। এরপর আরও প্রায় আড়াই লাখ টাকার গুড় সরবরাহ করেন শাওন শাহরিয়ার।
গত মার্চে চালডাল জানায়, লাভসহ মোট ২ লাখ ৬২ হাজার টাকার গুড় বিক্রি হয়েছে। বাকি পণ্য ফেরত নিতে বলা হয়। কিন্তু ফেরত নিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ৫ লাখ টাকার গুড় নষ্ট হয়ে গেছে।
শাওন শাহরিয়ার বলেন, ‘পাঁচ লাখের মায়া ছেড়ে দিলাম। যে পণ্য বিক্রি হয়েছে, সেটার দাম তো দেবে। সেটাও তিন মাস যাবৎ দিচ্ছে না। তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় না। অফিসে গেলেও সুরাহা হয় না। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চালডালের কো-ফাউন্ডার জিয়া আশরাফের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি উল্টো ব্লক করে দিয়েছেন।’
অসন্তোষ কর্মীদের
গত ঈদুল ফিতরের আগে চালডালের প্রায় ৮০০ কর্মী বেতন-বোনাসের দাবিতে যশোর হাইটেক পার্কে প্রতিষ্ঠানটির কার্যালয়ে বিক্ষোভ করেন। এক পর্যায়ে পার্ক কর্তৃপক্ষ প্রধান ফটক বন্ধ করে দিলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কর্মীরা ফটক ভাঙচুর করেন। এ ঘটনায় দুই কর্মী আহত হন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
কর্মীদের অভিযোগ, তারা গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসের বেতন পাননি। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, এই জটিলতার এখনো পুরোপুরি অবসান হয়নি।
পঞ্জি স্কিমের পথে চালডাল?
নতুন বিনিয়োগকারীর অর্থ দিয়ে পুরনো বিনিয়োগকারীর দেনা শোধের ধারাকে ইভ্যালি স্টাইলের পঞ্জি স্কিম বলছেন দেশীয় স্টার্টআপ খাতের উদ্যোক্তারা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি লাভজনক স্টার্টআপের প্রতিষ্ঠাতা বলেন, ‘নতুন করে ১০০ বাইক বিক্রির ঘোষণা দিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে আগের ১০ জনের বাইক ডেলিভারি দিত ইভ্যালি। আগের ৯০ জন আর নতুন ১০০ জন বাইক পাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। এভাবে নতুন করে একজন থেকে টাকা নিয়ে আগের জনকে পণ্য দেওয়ার নাম পঞ্জি স্কিম। এই স্কিম একসময় ভেঙে পড়ে। তখন কোম্পানি পালায় আর রাস্তায় নামতে হয় বিনিয়োগকারীদের। চালডালের বর্তমান কার্যক্রমও অনেকটা সে ধরনের।’
নতুন বিনিয়োগ এলেও পুরোনো পাওনাদাররা অর্থ পাবেন কি না, সেই প্রশ্ন তুলছেন তিনি। তার বক্তব্য, স্টার্টআপে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টরা বিনিয়োগ করেন ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য। বিনিয়োগের অর্থ কোথায় ব্যবহার করা যাবে, তার নির্দিষ্ট শর্ত থাকে। আগের দেনা পরিশোধে নতুন বিনিয়োগ প্রয়োজন হলে কোনো ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টের রাজি হওয়ার কথা নয়। ফলে নতুন বিনিয়োগ এলেও বিনিয়োগ ডট আইওর মতো প্ল্যাটফর্মের বিনিয়োগকারীরা অর্থ ফেরত পাবেন কি না, তা অনিশ্চিত। তার মতে, চালডাল যদি ব্যবসার মাধ্যমে লাভ করতে না পারে, তাহলে একসময় এই স্কিম ভেঙে পড়বে।
চালডালের বক্তব্য
চালডালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াসিম আলীম বলেন, ‘বিনিয়োগ সংক্রান্ত জটিলতায় আছি। তবে বিনিয়োগের বিষয়টি প্রায় চূড়ান্ত। একটু সময় লাগছে। এর সমাধান হলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে।’
মার্চেন্টদের বকেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মার্চেন্টদের এখন যে পাওনা আছে, সেটা গত বছরের তুলনায় কম। অনেকে আতঙ্কিত হচ্ছেন, তবে সবার সঙ্গেই আমাদের যোগাযোগ রয়েছে। তারা বিষয়টি বোঝেন।’
পঞ্জি স্কিমের অভিযোগ সম্পর্কে ওয়াসিম আলীম বলেন, ‘একটা ব্যবসা পরিচালনা করতে ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল লাগে। এখন আমাদের ওয়ার্কিং ক্যাপিটালের পরিমাণ একটু কম। পুরোটা যদি দিয়ে দেই বিপদে পড়ে যাবো, এজন্য বিনিয়োগকারীদের থেকে বর্ধিত সময় চেয়েছি।’
মার্চেন্ট, বিনিয়োগকারী ও কর্মীদের বেতনসহ মোট দেনার পরিমাণ জানতে চাইলে তা প্রকাশে অস্বীকৃতি জানান ওয়াসিম আলীম। তবে তার দাবি, প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের তুলনায় দেনার অনুপাত কম।






