গাজীপুরে মার্কেট দখল নিতে বিচারকের মামলাবাজি

মো. আরিফুল ইসলাম সোহেল একজন বিচারক। বর্তমানে কর্মরত আছেন লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ হিসেবে। তার ক্ষমতায় ‘অবিচারের’ শিকার হয়ে ১৮ মামলার ঘানি টানছেন নিজ চাচা শ্বশুরসহ অন্তত ১৫০ ব্যবসায়ী। মার্কেট দখল নিতে বিচারক আরিফুল তাদের নামে দেশের ছয়টি জেলায় ১৮টি মামলা করিয়েছেন। এর মধ্যে চাচা শ্বশুরের নামেই ১০টি। ভাইয়ের মেয়ে জামাইয়ের ক্ষমতায় করা মামলায় ২৩ মাস জেলও খাটতে হয়েছে তাকে।
সিরাজগঞ্জের কামারখন্দের সন্তান আরিফুল বিয়ে করেছেন গাজীপুরে। জেলার চান্দনায় চাচা শ্বশুরের সঙ্গে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ রয়েছে। সেই সম্পত্তির ওপর নির্মিত মার্কেট দখলে নিতে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে গাজীপুর, চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা ও যশোরে এসব মামলা করিয়েছেন। মামলার মধ্যে রয়েছে চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতন, মানব পাচার, ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার অভিযোগ।
আরিফুল ইসলামের চাচা শ্বশুর মার্কেট মালিক তৌহিদুল ইসলাম মজিবর ও মার্কেটের ব্যবসায়ীরা এশিয়া পোস্টের কাছে এসব অভিযোগ করেছেন। অনুসন্ধানে সম্পত্তি নিয়ে চাচা শ্বশুরের সঙ্গে বিরোধ ও মামলার সত্যতা নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বিরোধের সূত্রপাত যেভাবে
গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় বাসন ভূমি অফিস সংলগ্ন হাজী হোসেন পাইকারি মার্কেটের মালিক তৌহিদুল ইসলাম মজিবর। আউটপাড়া মৌজায় পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিতে মার্কেট ও বাড়ি নির্মাণ করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। মার্কেটটিতে প্রায় দেড় শতাধিক কাপড় ব্যবসায়ী দোকান নিয়ে ব্যবসা করছেন।
২০০০ সালে মজিবরের বাবা জমি ভাগ করে দুটি পৃথক দলিল রেজিস্ট্রি করে দেন। ২২৫৭৯ নম্বর দলিলটি মজিবর ও তার পাঁচ বোনের নামে এবং ২২৫৮০ নম্বর দলিলটি রেজিস্ট্রি হয় তার বড় ভাই আবু সাঈদের নামে।
নিজের অংশের জমিতে মজিবর প্রায় ১৫০টি দোকান নিয়ে মার্কেট গড়ে তোলেন। বড় ভাইও তার অংশে আলাদা মার্কেট গড়ে তোলেন। পারিবারিক বিরোধের একপর্যায়ে বড় ভাই বৃদ্ধ বাবাকে ঘর থেকে বের করে দিলে মজিবর ও তার স্ত্রী বাবার দেখভালের দায়িত্ব নেন।

মজিবরের অভিযোগ, ২০১১ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর থেকে বড় ভাই মার্কেট দখলের পাঁয়তারা শুরু করেন। এই বিরোধে নতুন মাত্রা যোগ হয় যখন বড় ভাই তার মেয়েকে বিয়ে দেন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের সঙ্গে। ক্ষমতার এই নতুন জোর পেয়ে বড় ভাই মার্কেট দখলের লড়াইয়ে যুক্ত করেন ম্যাজিস্ট্রেট জামাতাকে। এরপর আরিফুল ইসলাম তার পদ ও প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে মজিবরকে একের পর এক মামলা দিয়ে হয়রানি করতে থাকেন।
২৭ মাস কারাগারে মজিবর
২০১৬ সালে গাজীপুরের তৎকালীন পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ ওরফে ডিবি হারুনের মাধ্যমে মজিবরকে কোনো ওয়ারেন্ট বা মামলা ছাড়াই ধরে নিয়ে একটি মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন তিনি। মজিবরের দাবি, তখন পুলিশ সুপার হারুনকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে তিনি ছাড়া পান।
২০১৯ সালে ফের ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুলের প্ররোচনায় চট্টগ্রামে মজিবরের বিরুদ্ধে দুটি মানব পাচার মামলা দায়ের করে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাগার থেকে বের হওয়ার আগেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আরও দুটি এবং নারায়ণগঞ্জে আরেকটি মানব পাচার মামলা চাপানো হয় তার ঘাড়ে। একের পর এক মামলার জালে জড়িয়ে মজিবরকে দীর্ঘ ২৭ মাস কারাগারে বন্দি থাকতে হয়। ২০২১ সালে জামিনে মুক্তি পেয়ে তিনি দেশের বাইরে যান। পরে আবার দেশের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করলে বিমানবন্দরে তার পাসপোর্ট ব্লক করে দেওয়া হয় এবং পুনরায় আটক করা হয়। এ দফায় এক মাসের বেশি কারাভোগ করতে হয় তাকে।
মার্কেট দখলের তোড়জোড়
মজিবরের কারাবন্দি অবস্থায় মার্কেট দখলের তোড়জোড় শুরু করেন তার বড় ভাই। পরে ব্যবসায়ীরা পুলিশে খবর দেন। মার্কেট থেকে জোরপূর্বক টাকা আদায়ের সময় আবু সাঈদ ও তার লোকজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের প্রভাবে মুচলেকা দিয়ে তারা ছাড়া পান বলে জানা যায়।
এ সময় ব্যবসায়ীরা বাসন থানায় মামলা করেন। ২০১৯ সালের এই মামলার নম্বর ১২(৮)১৯। এতে দণ্ডবিধির ১৪৩, ৪৪৮, ৪২৭, ৩৮০, ১০৯ ও ৫০৬ ধারার অপরাধের উল্লেখ রয়েছে।

মামলায় আরিফুল ইসলাম সোহেল ছাড়াও তার ভাই মেহেদী হাসান, অপর ভাই মো. মঞ্জুরুল ইসলামসহ আরও ১৫-২০ জনকে আসামি করা হয়।
ভাইয়ের মৃত্যুর পর ফের দখলচেষ্টা
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে মজিবরের বড় ভাই মারা যান। এরপর বড় ভাইয়ের স্ত্রী মজিবরের সঙ্গে যৌথভাবে মার্কেটের ভাড়া আদায়ের বিষয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু এই পারিবারিক শান্তির স্থায়িত্ব সংক্ষিপ্ত ছিল। কিছুদিনের মধ্যেই দৃশ্যপটে আসেন বড় ভাইয়ের জামাতা, যিনি একজন যুগ্ম জেলা জজ।
নিজের পদের প্রভাব খাটিয়ে তিনি জবরদস্তিমূলকভাবে ফ্ল্যাট, বাড়ি ও মার্কেটের পুরো অংশ দখল করে নেন বলে অভিযোগ মজিবরের। এমনকি নিজের ছোট বোনকেও দোকান থেকে বের করে দেওয়া হয়।
চলতি বছরের ৮ জুন একটি নোটিশ জারি করে পুরো মার্কেট দখলে নেওয়ার পাঁয়তারা শুরু করেন বিচারক আরিফুল ইসলাম সোহেল। এরপর ১২ জুন তার স্ত্রী মোশারেফা মোহাম্মদ (রীম)-এর নামে আরেকটি নোটিশ দেওয়া হয়।
এতে দাবি করা হয়, তার দাদা (মজিবরের বাবা) দানপত্র বা হেবা সূত্রে পুরো জমি তাকে লিখে দিয়ে গেছেন। তবে এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দাখিল করা হয়নি।
এই নোটিশের সূত্র ধরে মজিবরের পরিবর্তে তাকে ভাড়া দিতে দোকানদারদের ওপর চাপ প্রয়োগ করা হয়। এতেও কাজ না হলে শুরু হয় ফোনে ব্যবসায়ীদের অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করা। এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে মেসেজও পাঠানো হয়।
মজিবর এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘এই বিচারকের একটি লাইসেন্সকৃত পিস্তল রয়েছে, যা উঁচিয়ে তিনি প্রায়ই লোকজনকে ভয়ভীতি দেখান।’
এমপির মধ্যস্থতা, পরদিন ধর্ষণ মামলা
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে অতিষ্ঠ দোকানদাররা গাজীপুর-১ আসনের বিএনপি দলীয় এমপি মো. মজিবুর রহমানের দ্বারস্থ হন। তিনি বিষয়টি আমলে নিয়ে গত ৪ জুলাই স্থানীয় প্রশাসন, থানার কর্মকর্তা এবং গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে মার্কেটে বৈঠকের আয়োজন করেন। তবে বিচারক আরিফুল ইসলাম এই সমঝোতা চাননি। তিনি গভীর রাতে এমপিকে ফোন করে বৈঠকে আসতে নিষেধ করেন এবং একে ‘পারিবারিক বিষয়’ বলে চাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে জানা গেছে।
এমপি তাকে কাগজপত্র নিয়ে চাচা শ্বশুরের সঙ্গে বসতে বললেও তিনি স্ত্রীর অসুস্থতার অজুহাতে বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন। শেষে এমপি সিদ্ধান্ত দেন, যে যার পূর্বের অবস্থানে থাকবে এবং যার যার আসল মালিকের কাছেই ভাড়া দেবে।
বৈঠকের পরদিনই ৫ জুলাই চার ব্যবসায়ী ও দোকানদারের বিরুদ্ধে যশোরের কোতোয়ালি থানায় একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলা হয়। মামলার বিবরণে ৪ জুলাই সন্ধ্যা ৬টা থেকে যে সময়ের উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সময় ওই ব্যবসায়ীরা স্থানীয় এমপির সঙ্গে মার্কেটে বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন।
এই ঘটনার পর মার্কেটে এক ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। দোকানদাররা আতঙ্কে আছেন, যে কোনো সময় তাদের দোকানে মাদক বা অবৈধ অস্ত্র রেখে বড় কোনো ঘটনায় ফাঁসিয়ে দেওয়া হতে পারে।
জেলায় জেলায় মামলার জাল
গাজীপুরের বাইরেও বিভিন্ন জেলায় জেলায় মার্কেট মালিক ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলার অভিযোগ রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে—চট্টগ্রামের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে মানব পাচার মামলা নম্বর ১৪/২০১৯; গাজীপুর ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে ১৮৭/২০১৮ নম্বর চাঁদাবাজি মামলা; ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মানব পাচার মামলা নম্বর ৩৪/১৯; চট্টগ্রামের মানব পাচার মামলা নম্বর ১৯/২০১৮; ব্রাহ্মণবাড়িয়া আদালতে কোর্ট পিটিশন মামলা নম্বর ৭৮/১৯; ব্রাহ্মণবাড়িয়া নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মানব পাচার মামলা নম্বর ০৮/১৯; যশোর কোতোয়ালি থানার মামলা নম্বর ১৭ (৫ জুলাই ২০১৬ তারিখের, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(৩) ধারায়)। এ ছাড়া ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ আরও বেশ কিছু অভিযোগে মামলা করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীরা বলছেন, এসব মামলার কারণে মার্কেটের একাধিক ব্যবসায়ী কারাগারে গেছেন। এ ছাড়া তাদের বিপুল আর্থিক ক্ষতি হয়েছে, মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন এবং সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
হুমকি ও নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ
এসব ঘটনায় ব্যবসায়ীরা সুবিচার চেয়ে আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রধান বিচারপতিসহ বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়েছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, মার্কেটের মালিকানা নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে তাদের বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। মামলা, খুন ও গুমের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। রাতের আঁধারে বাসাবাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট হুমকি ও ভাড়ার বিরোধ নিয়ে বাসন থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়, যার নম্বর ৯৫৬। ২০২৬ সালের নতুন বিরোধের বিষয়েও বাসন থানার ওসি, গাজীপুরের জেলা প্রশাসক, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এবং গাজীপুর মহানগর পুলিশের কমিশনারকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
মজিবরের বক্তব্য
তৌহিদুল ইসলাম মজিবর এশিয়া পোস্টকে জানান, ২০০০ সালে বাবার কাছ থেকে হেবা সূত্রে জমি পেয়ে ২০০৪ সালে নিজের খরচে তিনি মার্কেট নির্মাণ করেন।
তার অভিযোগ, ২০১১ সালে বাবার মৃত্যুর পর থেকে তার বড় ভাই মার্কেট দখলের চেষ্টা চালান। বড় ভাইয়ের ম্যাজিস্ট্রেট জামাতা আরিফুল ইসলাম ক্ষমতার অপব্যবহার করে তার বিরুদ্ধে ১০টি মিথ্যা মামলা দিয়ে দীর্ঘ ২৭ মাস জেল খাটান। ২০২৩ সালে তার ভাই মারা গেলে ভাতিজি-জামাতা আরিফুল ইসলাম মার্কেট দখলের জন্য নানা পাঁয়তারা করতে থাকেন। অবৈধভাবে মার্কেটের মালিকানা দাবি করে ব্যবসায়ীদের হোয়াটসঅ্যাপে হুমকি দেওয়া, বাসাবাড়িতে গিয়ে হুমকি দেওয়া এবং একের পর এক মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা দায়ের করা হয়।
ব্যবসায়ীদের ভাষ্য
মার্কেট সমিতির সভাপতি আবুল কালাম আজাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আরিফুল ইসলাম সোহেল সাহেবের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও ষড়যন্ত্রে আমি এবং আমার মার্কেটের ব্যবসায়ীরা চরম নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদাহানির সম্মুখীন হয়েছি। বিচারকের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো আমাদের ঐতিহ্যবাহী মার্কেটটি অবৈধভাবে দখল করা। তিনি ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে আমাদের বিরুদ্ধে একের পর এক ভিত্তিহীন ও বানোয়াট মামলা করছেন।’
তিনি বলেন, ‘গত ৫ জুলাই যশোরের একটি থানায় আমার ও মার্কেটের ১০ ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে কাল্পনিক সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলা দায়ের করা হয়। বাদী দাবি করেছেন, তিনি আমাদের সঙ্গে কাপড়ের ব্যবসা করতেন, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা। ওই নারীর সঙ্গে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিল না। মোবাইল ফোনের কল রেকর্ড ও ইনভেস্টিগেশন করলেই এর প্রমাণ মিলবে। এ ছাড়া আমার নামে চাঁদাবাজি ও মানব পাচারের মিথ্যা মামলাসহ আরও ৬-৭টি মামলা করা হয়েছে।’
আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘জজ সাহেব রাতের আঁধারে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে ব্যবসায়ীদের বাসায় গিয়ে হুমকি দিচ্ছেন। তিনি বিভিন্ন উগ্র ও অশালীন ভাষা প্রয়োগ করে কাশিমপুর কারাগারে ২০ বছর আটকে রাখার ভয় দেখাচ্ছেন। লাইসেন্সকৃত পিস্তল উঁচিয়ে মার্কেটের সামনে ফাঁকা গুলিবর্ষণ করে ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছেন। নিজের পদমর্যাদা ব্যবহার করে সহকর্মী ও ভাড়াটে ক্যাডারদের মাধ্যমে মামলা সাজাচ্ছেন।’
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ রাসেল বলেন, ‘২০১৬ সাল থেকে এই মার্কেটে ভাড়াটিয়া হিসেবে ব্যবসা করছি। আমি একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী। লালমনিরহাটের যুগ্ম জেলা জজ আরিফুল ইসলাম সোহেল মার্কেটটি দখলের জন্য ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করছেন। তিনি ২০১৮ সালে প্রথম আমার বিরুদ্ধে মারধরের মিথ্যা মামলা দেন। পরে কোরবানির নামে ৫ হাজার টাকা চাঁদা না দেওয়ায় এবং তার দাবি করা অনৈতিক ভাড়া দিতে রাজি না হওয়ায় আমাদের ওপর আরও চড়াও হন। এমনকি গাজীপুরের এমপির সঙ্গে আমরা যখন মিটিংয়ে ছিলাম, ঠিক সেই সময়ের ঘটনা দেখিয়ে তিনি যশোরে আমাদের নামে একটি সাজানো সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলা করিয়েছেন। এ ছাড়াও তিনি গভীর রাতে আমাদের বাসায় এসে লাইসেন্সকৃত রিভলবার উঁচিয়ে হুমকি দিচ্ছেন এবং রাত ৩টায় আমাদের স্ত্রীদের ফোনে কল দিয়ে অনবরত হয়রানি করছেন। একজন বিচারকের এমন বেআইনি কর্মকাণ্ডের হাত থেকে বাঁচতে আইনমন্ত্রী ও গণমাধ্যমকর্মীদের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করছি।’
আব্দুল হালিম নামের আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার দোকানের নাম অন্বেষা বস্ত্রালয়। এখানে ব্যবসা করি ২০১৩ সাল থেকে। তৌহিদুল ইসলাম মুজিবরের কাছ থেকে ডিড কইরা দোকানটা নিছি। ভাড়া দেই প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা। এখন আমাদের এই মার্কেটে আরিফুল ইসলাম সোহেল, সে একজন ম্যাজিস্ট্রেট। সে আসছিল একবার দখল করার জন্য, পরে আমরা প্রতিবাদ করায় আমাদের নামে বিভিন্ন জেলায় জেলায় মামলা দেয়। আমার নামে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় মানব পাচার মামলা দিছে, নারায়ণগঞ্জ জেলায় মানব পাচার মামলা দিছে, ঢাকা জেলায় মানব পাচার মামলা দিছে, ইভেন যশোরে গণধর্ষণ মামলা দিছে, তারপরে জয়দেবপুর থানায় চাঁদাবাজি মামলা দিছে, ছিনতাই মামলা দিছে। একটাই অপরাধ, আমরা তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছিলাম যে, আমরা কয়জনকে ভাড়া দিব?’
এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার দোকানের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ আছে। সে নিজে আইসা আমারে হুমকি দিছে এবং হোয়াটসঅ্যাপে আমারে হুমকি দিছে, সেই ডকুমেন্টস আমি স্ক্রিনশট দিয়া রাখছি। আমি যখন মানব পাচার মামলায় জেল খাটি তখন আমার বাবা মারা গেছে। তখন আমি এই কষ্টটা... তারপরে আমার ব্যবসার ক্ষতি হচ্ছে, আমার ফ্যামিলির সমস্ত কিছু... আমি সবার বড় ছেলে আমার ফ্যামিলির মধ্যে, আমার এইটাই ইনকাম সোর্স। এখন আমারে বিভিন্ন ধরনের মামলা দিয়া, আমারে জেলায় জেলায় মামলা দিয়া হয়রানি করছে। আমার কী অপরাধ, সেটাও জানি না।’
যা বলছেন বিচারক দম্পতি
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে বিচারক আরিফুল ইসলাম সোহেলের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা পারিবারিক ব্যাপার, কোর্টে মামলা চলছে। এখানে বিচারকের হাত দেওয়ার কোনো ব্যাপার নেই। কোর্টে যা ফায়সালা হবে, মামলা অনুযায়ী সেভাবে পরে সিদ্ধান্ত হবে।’
আরিফুল ইসলাম সোহেলের স্ত্রী মোশাররেফা মোহাম্মদ (রীম) এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ওয়ারিশসূত্রে জমির মালিক আমি। মার্কেটের মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান।’
তিনি বলেন, ‘কিছু জায়গায় আমার সৎ চাচা আমাদের অংশ বুঝিয়ে না দিয়ে বেদখল করে আছে। আপনি সাংবাদিক কি সমাধান দিতে পারবেন? কিছু দোকানদার, মাস্তান ধরে এসব অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। আমাদের হক বুঝিয়ে দিচ্ছে না।
মোশাররেফা মোহাম্মদ বলেন, ‘এটা আমার পৈতৃক সম্পত্তি, আমার স্বামী কেউ না। আপনার কিছু জিজ্ঞাসার থাকলে আমাকে বলবেন, আমার স্বামীকে না।’
একে একে ১৮ মামলা
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে মোট ১৮টি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৫টির সুনির্দিষ্ট বিবরণ (মামলা নম্বর, বাদী, থানা) এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে।
১. গণধর্ষণ মামলা, যশোরের কোতোয়ালি থানা। মামলা নম্বর ৫৬৬, তারিখ ৫ জুলাই ২০২৬। বাদী জাহেদা খাতুন মিম। গ্রাম সানারপাড়, উপজেলা/থানা সিদ্ধিরগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
২. হত্যাচেষ্টা মামলা। বাদী যুগ্ম জেলা জজ আরিফুল ইসলাম। বাসন থানায় জিডি নম্বর ৩৫৪ সূত্রে মামলা নম্বর ৪৩।
৩. নারী ও শিশু নির্যাতন ও মানব পাচার মামলা, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল। ২৮ মার্চ ২০১৯ তারিখের ১৪৮২ নম্বর স্মারকে পিটিশন মামলা নম্বর ৭/২০১৯। বাদী জামাল হোসেন, ঠিকানা সাং উত্তর মোড়াইল, শাহ আলমের বাড়ির ভাড়াটিয়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর; স্থায়ী ঠিকানা গ্রাম নাঙল বিল, টেকনাফ, কক্সবাজার।
৪. নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল মামলা, চট্টগ্রাম। মানব পাচার মামলা নম্বর ৯৪/২০১৯, তারিখ ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৯। বাদী মোজাফফর উদ্দীন, সাং আধার মানিক, সালাউদ্দীনের বাড়ি, থানা লোহাগড়া, জেলা চট্টগ্রাম।
৫. নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা, কোর্ট পিটিশন নম্বর ৭৮/১৯, নারায়ণগঞ্জ।
৬. নারী ও শিশু নির্যাতন মামলা, চট্টগ্রাম। মানব পাচার মামলা নম্বর ১৯/২০১৮। বাদী মো. হারুন অর রশিদ, থানা রামু, জেলা কক্সবাজার; বর্তমানে সরাইপাড়া, ভেলুয়া দিঘিরপাড়, আনোয়ার হোসেনের বাড়ির ভাড়াটিয়া, থানা পাহাড়তলী, জেলা চট্টগ্রাম।
৭. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, চট্টগ্রাম। বাদী রাষ্ট্র, মামলা নম্বর ১৯/১৮।
৮. নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, ব্রাহ্মণবাড়িয়া। বাদী রুনা আক্তার, সাং ঘেড়াগাঁও, থানা বিজয়নগর, জেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়া।
৯. কোর্ট পিটিশন মামলা নম্বর ৭৮/২০১৯, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, নারায়ণগঞ্জ। বাদী নাসরিন আক্তার।
১০. শিশু ও নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল, নারায়ণগঞ্জ। মানব পাচার মামলা নম্বর ৮/২০১৯। বাদী রাষ্ট্র।
১১. জয়দেবপুর থানায় চাঁদাবাজি মামলা নম্বর ৫৭, তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। বাদী আবু সাইদ।
১২. গাজীপুরে চাঁদাবাজির সিআর মামলা নম্বর ১৮৭/২০১৮।
১৩. মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল আদালত, ঢাকা। মানব পাচার মামলা নম্বর ৩১৮/২০২০। বাদী ওমর ফারুক।
১৪. গাজীপুরে চাঁদাবাজির সিআর মামলা নম্বর ৩৭৯/২০২৬। বাদী মঞ্জুরুল ইসলাম, সাং তেঁতুলিয়া, থানা উল্লাপাড়া, জেলা সিরাজগঞ্জ; বর্তমানে সাং গাজীপুর চৌরাস্তা, আউটপাড়া, থানা বাসন। এই বাদী যুগ্ম জজ আরিফুলের ম্যানেজার বা ক্যাডার বলে দাবি করা হয়েছে।
১৫. নারী ও শিশু নির্যাতন ট্রাইব্যুনাল মামলা, চট্টগ্রাম। মানব পাচার মামলা নম্বর ১৪/১৯।



