বিনিয়োগকারী ও শ্রমিকদের ৯২ কোটি টাকা লোপাট করেছে আশরাফ টেক্সটাইল

গাজীপুরের টঙ্গীর আশরাফ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিনিয়োগকারী ও প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের অন্তত ৯২ কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিশেষ তদন্ত এবং তার সূত্র ধরে এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই জালিয়াতির চিত্র।
তদন্তে উঠে এসেছে, জমি ও বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রির ৭২ কোটি টাকার কোনো সুস্পষ্ট হিসাব নেই প্রতিষ্ঠানটির কাছে। এ ছাড়াও শ্রমিকদের প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির অন্তত ২০ কোটি টাকা লোপাটের তথ্যও মিলেছে।
পুঁজিবাজারে তালিকাচ্যুত এই কোম্পানির ৬০ দশমিক ৮৩ শতাংশ শেয়ারের মালিক ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। তাদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে টঙ্গীর ৪২ বিঘা জমি ও ৭ বিঘার একটি বাণিজ্যিক ভবন বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
পুরো জালিয়াতির মূলহোতা হিসেবে সামনে এসেছে আশরাফ টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ আলী মৃধা ও তার সিন্ডিকেটের নাম। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে চলতি বছরের মে মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটে (বিএফআইইউ) চিঠি পাঠায় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএসইসির একজন উপপরিচালক এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তদন্তে অর্থ পাচার ও জালিয়াতির অকাট্য প্রমাণ পাওয়ায় আমরা দুদক ও বিএফআইইউকে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছি।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০৬ সালের মার্চে কারখানা অবৈধভাবে লে-অফ (বন্ধ) ঘোষণার পর থেকেই প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন সম্পদ গ্রাস করার ছক তৈরি করে মাহমুদ আলী মৃধার পারিবারিক সিন্ডিকেট। ক্রেতাদের কাছ থেকে নেওয়া অর্থের সিংহভাগ কোম্পানির অফিশিয়াল ব্যাংক হিসাবে জমা না করে গায়েব করে দেওয়া হয়েছে।
সাধারণ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের মূলধন এবং হাজারো শ্রমিকের বকেয়া গ্র্যাচুইটি ও প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা নিজেদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে নিয়েছেন পরিচালকরা। পরিবারের সদস্যরা এই অর্থ অস্ট্রেলিয়া ও কানাডায় পাচার করে ভোগ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুঁজিবাজারের টাকা গায়েব, কারখানা বন্ধ
গাজীপুরের টঙ্গী শিল্প এলাকায় ১৯৬২ সালে ১৬ দশমিক ৬৯ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠা করা হয় আশরাফ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড। তখন ১২ হাজার ৪০০টি স্পিন্ডল নিয়ে দৈনিক প্রায় ৪২০ পাউন্ড মানসম্মত সুতা উৎপাদন করা হতো।
১৯৮৩ সালের মার্চে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তির সময় ৬০ দশমিক ৮৩ শতাংশ শেয়ার ছেড়ে দেওয়া হয় সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের হাতে। বাকি ৩৯ দশমিক ১৭ শতাংশ শেয়ার ছিল মাহমুদ আলী মৃধা ও পরিচালনা পর্ষদের হাতে।

বিএসইসির তদন্তে দেখা গেছে, ১৯৮৪ সালের আইপিও-উত্তর বণ্টনে সাধারণ বিনিয়োগকারী ও পরিচালকদের অংশ ছিল ৫০ শতাংশ করে। ২০১৩ সাল নাগাদ পরিচালকদের হাতে থাকা শেয়ার নেমে আসে মাত্র ২৫ দশমিক ১৫ শতাংশে। অর্থাৎ তারা গোপনে ২৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ শেয়ার বিক্রি করে দেন।
এতে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ অর্ডিন্যান্স, ১৯৬৯-এর একাধিক ধারা লঙ্ঘিত হয়েছে। বিএসইসি এটিকে প্রতারণামূলক হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
১৯৮৪ সালে আইপিওর মাধ্যমে শেয়ারবাজার থেকে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা তোলা হয়। তবে পুরোনো যন্ত্রপাতি ও ব্যাংকঋণের বোঝা নিয়ে ২০০৬ সালের মার্চে কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে ২০০৯ সালের ৪ অক্টোবর প্রতিষ্ঠানটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত হয়।
ভাগবাঁটোয়ারায় শেষ কারখানা
তালিকাচ্যুত হওয়ার পর কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভার (এজিএম) নামে শুরু হয় নাটকীয়তা ও জালিয়াতি। বছরের পর বছর লোকসান দেখিয়ে হঠাৎ এক পাতানো এজিএম ডাকা হয়।
বিএসইসির তদন্তে বলা হয়েছে, মাহমুদ আলী মৃধা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের বলেন, ‘কারখানাটি প্রাচীন যন্ত্রপাতির কারণে অলাভজনক হয়ে পড়েছে। আমরা যদি এই পরিত্যক্ত জমির একাংশ বিক্রি করে সেই টাকা দিয়ে টঙ্গীর জমিতে একটি আধুনিক বহুতল বাণিজ্যিক শপিং কমপ্লেক্স (আশরাফ সেতু শপিং কমপ্লেক্স) নির্মাণ করি এতে সাধারণ শেয়ারহোল্ডাররা বিপুল পরিমাণ লভ্যাংশ পাবেন এবং তাদের শেয়ারের দাম বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। নতুন করে কাউকে বিনিয়োগ করতে হবে না।’
এরপর ঢাকা-টঙ্গী মহাসড়কের পাশে সেতু করপোরেশনের সঙ্গে মার্কেট নির্মাণে চুক্তি করে আশরাফ টেক্সটাইল। একাধিকবার সরেজমিনে ওই মার্কেট ঘুরে দেখেছেন এই প্রতিবেদক। দোতলা বেজমেন্টের ওপর তিন তলাবিশিষ্ট ভবনে গড়ে উঠেছে পাইকারি ও খুচরা জামাকাপড়ের মার্কেট। সেখানে ১ হাজার ১৫৭টি দোকান, একটি তৈরি পোশাক কারখানা, সেতু করপোরেশনের কার্যালয় ও ডায়াবেটিক সমিতির অফিস চালু রয়েছে।
চুক্তি অনুযায়ী, এই মার্কেটের ২০ শতাংশ স্পেসের মালিক ছিল আশরাফ টেক্সটাইল। তবে বর্তমানে তাদের কোনো অংশীদারত্ব অবশিষ্ট নেই। মাত্র ৩৫০ বর্গফুটের একটি ভাড়া কক্ষে জীর্ণশীর্ণ আসবাবপত্র দিয়ে কোনো রকমে সাজানো হয়েছে কারখানার কার্যালয়।
বাজারদরের চেয়ে কম দামে বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রি
২০০৯ সালের ৩০ জুলাই সেতু করপোরেশনের কাছে ৬৬ হাজার ৮১৮ বর্গফুট বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রি দেখান মাহমুদ আলী মৃধা। প্রতি বর্গফুট মাত্র ১ হাজার ২৭২ টাকা দরে মোট ৮ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্য দেখানো হয়।

এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে অবশ্য ভিন্ন তথ্য মিলেছে। একই সময়ে ওই মার্কেটে ১৫ ফুট বাই ১০ ফুটের (১৫০ বর্গফুট) প্রতিটি দোকান তিন লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি হয়। অর্থাৎ প্রতি বর্গফুটের দাম পড়ে দুই হাজার টাকারও বেশি।
বাজারদরের চেয়ে কম দামে বাণিজ্যিক স্পেস বিক্রির এই সাড়ে ৮ কোটি টাকার কোনো সুস্পষ্ট হিসাব দিতে পারেননি মাহমুদ আলী মৃধা।
১৫০ কোটির জমির দাম দেখানো হয় ৮৫ কোটি
২০০৯ থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে কর্ণফুলী ইন্ডাস্ট্রিজের কাছে ৪২ দশমিক ২২ বিঘা জমি মাত্র ৮৫ কোটি টাকায় বিক্রি দেখায় আশরাফ টেক্সটাইল। চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়িক গ্রুপটির কাছে ধাপে ধাপে এই বিক্রি দেখানো হয়। এই অর্থ থেকে ৬৯ কোটি টাকা ব্যাংকঋণ, বিদ্যুৎ বিল ও বিভিন্ন কোম্পানির দেনা পরিশোধ দেখানো হয়। তবে বাকি ১৫ কোটি ১২ লাখ টাকার কোনো হিসাব দেখাতে পারেননি আশরাফ টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ আলী মৃধা।
বিএসইসির তদন্তে দেখা গেছে, সরকারি সর্বনিম্ন মৌজা দর অনুযায়ী এই জমির দাম ছিল ১৩৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। অর্থাৎ তার চেয়েও ৫১ কোটি ৫৪ লাখ টাকা কমে জমিটি হস্তান্তর করা হয়।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০০৯ সালে সেখানে শতকপ্রতি সরকারি মৌজা দর ছিল ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৯৯৭ টাকা। স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০১০ সালে সেখানে শতকপ্রতি প্রকৃত বাজারদর ছিল ১৪ থেকে ১৭ লাখ টাকা। সেই হিসাবে জমিটির প্রকৃত বাজারমূল্য ১৫০ কোটি টাকারও বেশি। অর্থাৎ, আশরাফ টেক্সটাইলের জালিয়াতি বা আত্মসাৎকৃত অর্থের পরিমাণ বিএসইসির তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে আসা অঙ্কের চেয়েও ঢের বেশি।
সব মিলিয়ে জমি ও স্পেস বিক্রির মোট ৭২ কোটি ১ লাখ টাকার কোনো স্বচ্ছ হিসাব মেলাতে পারেননি বিএসইসির তদন্তকারীরা। এর মধ্যে জমি বিক্রির দলিলে ৫১ দশমিক ৫৪ কোটি টাকার গরমিল, ব্যবহারের ১৫ দশমিক ২ কোটি টাকা এবং স্পেস বিক্রির ৫ দশমিক ৩৫ কোটি টাকার কোনো হিসাব না থাকার মতো বিষয়গুলোও রয়েছে।
কর্মীদের ২০ কোটি টাকাও গায়েব
বিএসইসির বিশেষ তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে প্রভিডেন্ট ফান্ড ও শ্রমিক-কর্মচারীদের বকেয়া গ্র্যাচুইটি পরিশোধের নামে জালিয়াতির প্রমাণ মিলেছে। কমিশনের কাছে লিখিত প্রতিবেদনে আশরাফ টেক্সটাইলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ আলী মৃধা দাবি করেন, শ্রমিকদের বকেয়া মেটাতে কর্ণফুলী ইন্ডাস্ট্রিজ থেকে ৮ কোটি ৭৬ লাখ এবং সেতু করপোরেশন থেকে ৫ কোটি ৩৫ লাখ টাকাসহ মোট ১৪ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০৪-০৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ছুটি ও গ্র্যাচুইটি বাবদ প্রতিষ্ঠানটির মোট দায় ছিল মাত্র ৫৬ লাখ টাকা। কারখানা বন্ধ হওয়ার পর ২০০৬-০৭ অর্থবছরে এটি ২ কোটি ৮৬ লাখ টাকায় উন্নীত হয়।
২০১৪ সালের পর আশরাফ টেক্সটাইল আর কোনো নিরীক্ষা করায়নি। বিএসইসির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটির যত নিরীক্ষা হয়েছে তার কোনোটিতেই শ্রমিকদের কাছে প্রতিষ্ঠানের দায়ের পরিমাণ দুই কোটি ৬০ লাখ টাকার বেশি ছিল না।
টঙ্গীর চেরাগ আলী মোড়ে টং দোকানি মো. ইব্রাহিমের বাবা আব্দুল জলিল মীর ছিলেন আশরাফ টেক্সটাইলের কর্মচারী। মো. ইব্রাহিম এশিয়া পোস্টকে জানান, ঠিকমতো বেতন দিতে না পারায় তার বাবা চাকরি ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু অবসর সুবিধা মেলেনি। টাকার অভাবে শেষ পর্যন্ত বিনা চিকিৎসায় মারা যান আব্দুল জলিল মীর।
২০১৪ সালের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে শ্রমিকদের ছুটি ও গ্র্যাচুইটি বাবদ ৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং প্রভিডেন্ট ফান্ড বাবদ ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা পরিশোধের দাবি করা হয়। তবে এর সপক্ষে কোনো নথি বা ব্যাংকিং প্রমাণ দেখাতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি।
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধান বলছে, কর্মীদের পাওনা অন্তত ২০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন মাহমুদ আলী মৃধা ও পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা।
অভিযোগ অস্বীকার মাহমুদ আলী মৃধার
সামগ্রিক বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে মাহমুদ আলী মৃধা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা ওই সময় ব্যাপকভাবে ঋণে জর্জরিত ছিলাম। টাকা পরিশোধ না করলে শিল্পঋণ সংস্থা সম্পত্তি বিক্রি করে টাকা নিয়ে যেত। ফলে আমরা ভালো দামে বিক্রি করতে পারিনি। এ ছাড়া ব্যাংক তখনও অনলাইন হয়নি। তাই শ্রমিকদের যে অর্থ পরিশোধ করেছি তার সব ডকুমেন্ট রাখা সম্ভব হয়নি। আমরা হাইকোর্টের অনুমতি নিয়ে ২০২৩ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক অবস্থান টিকিয়ে রেখেছি। পাশাপাশি শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গেও আমাদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। কোনো ধরনের অনিয়ম করিনি।’
.png)





