logo
Advertisement

পুরান ঢাকার ডিআইটি পুকুরে এমপি জসিমের থাবা

• তিন দশকের আইনি লড়াই, বাস্তবায়ন হয়নি রায়

• ভূমি মন্ত্রণালয় ও রাজউকের আইন বিভাগ বলছে, জমি ফিরিয়ে দিতে আইনি কোনো বাধা নেই

• আওয়ামী লীগের কাউন্সিলরের পর এখন ‘পুকুর রক্ষা কমিটির’ নামে দখল

• বিচারাধীন জমি নিয়ে রাজউক কার্যালয়ে তদবির সংসদ সদস্য এম এ জসিম উদ্দিনের

পুরান ঢাকার ডিআইটি পুকুরে এমপি জসিমের থাবা
রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ডিআইটি পুকুর ও সংসদ সদস্য এম এ জসিম উদ্দিন। কোলাজ ছবি: এশিয়া পোস্ট

আড়াই একর জায়গা নিয়ে বিস্তৃত রাজধানীর গেন্ডারিয়ার ডিআইটি পুকুর। রাজউকের আপিল আবেদন খারিজের পর জায়গাটি মূল মালিকের ওয়ারিশদের কাছে ফেরানোর পথ তৈরি হয়। সুপ্রিম কোর্টের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জমি ফিরিয়ে দেওয়ার সুপারিশ করে ভূমি মন্ত্রণালয় ও রাজউক। তারপরও শতবর্ষী এই পুকুরের নিয়ন্ত্রণ পাননি মূল মালিকের ওয়ারিশরা। পুকুর ও সংলগ্ন কোটি কোটি টাকার সরকারি সম্পদে নজর পড়ে কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য এম এ জসিম উদ্দিনের।

পুকুরটি নিজেদের আয়ত্তে নিতে গত মে মাসে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালায় রাজউক। আদালতের আদেশ অমান্য করে এই অভিযান চালানো হয়।

উচ্ছেদের পর পুকুরপাড়ে পার্কিং নির্মাণের জন্য রাজউক কার্যালয়ে গিয়ে চাপ দেন এমপি জসিম উদ্দিন। পুকুরপাড়ে লোকজন জড়ো করে সমাবেশও করেন তিনি।

পুকুর দখলে বিএনপিদলীয় এই সংসদ সদস্যকে সহায়তা করছেন শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইব্রাহিম আহমেদ রিপন। নিজেকে এমপি জসিম উদ্দিনের ভাগনিজামাই পরিচয় দেওয়া রিপন ‘বাংলাদেশ পুকুর রক্ষা কমিটি’ ও ‘গেন্ডারিয়া ডিআইটি পুকুর রক্ষা কমিটি’ নামের দুটি সংগঠনের নেতা বনে গেছেন।

জুলাই অভ্যুত্থানের আগে দেড় যুগ ধরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর দখল করে বালু, ইস্পাতসামগ্রী ও জাহাজের ভাঙারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন রিপন। গত নির্বাচনের পর বিএনপিদলীয় এমপির স্বজন পরিচয়ে এলাকায় নতুন করে প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। পুকুর রক্ষার নামে ভেকু দিয়ে পাড়ের মাটি কেটে বিক্রিও শুরু করেন।

তিন দশকের আইনি লড়াই

১৯৬৪ সালে গেন্ডারিয়া পুনর্বাসন প্রকল্পের জন্য ১৩ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। তবে ২ দশমিক ২৮৬৫ একর জলাশয়সহ কিছু জমি শেষ পর্যন্ত অব্যবহৃত থেকে যায়। পরে জমির মূল মালিকপক্ষ পুকুর ও পাড়ের জমি ফেরত পেতে সরকারের কাছে ভূমি অবমুক্তির আবেদন করে। আবেদন অগ্রাহ্য হলে তারা আদালতে রিট পিটিশন দাখিল করেন।

নথিপত্র অনুযায়ী, ঢাকা জেলার শহর ঢাকা মৌজার সিএস ৭৮, ৭৯, ৮৪, ৮৬ ও ৮৭ দাগের ২ দশমিক ৫০ একর ভূমি নিয়ে ১৯৯৫ সালে হাইকোর্টে রিট পিটিশন (নং-১৪২১/৯৫) দায়ের করা হয়। তৎকালীন ভূমি অধিগ্রহণ মামলার (নং-১৩৭/৬২-৬৩) আওতায় জমিটি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। পুকুরের মালিক মৃত ইউনুস উদ্দিন আহমেদ চৌধুরীর ওয়ারিশ—নৌশাদ আহমেদ চৌধুরী, বায়েজীদ আহমেদ চৌধুরী, তবারক আহমেদ চৌধুরী, দিলশাদ আহমেদ চৌধুরী, দিলরুবা আহমেদ চৌধুরী ও কস্তুরী আহমেদ চৌধুরীর পক্ষে তাদের আম-মোক্তার মো. জাকির হোসেন আদালতের শরণাপন্ন হন।

১৯৯৭ সালের ৩০ জানুয়ারি হাইকোর্ট বিভাগ রিট পিটিশনটি অ্যাবসলিউট (স্বীকৃত) ঘোষণা করে ৩০ দিনের মধ্যে ২ দশমিক ৫০ একর জমি অধিগ্রহণ থেকে অবমুক্ত করার নির্দেশ দেন। এই আদেশের বিরুদ্ধে রাজউক আপিল বিভাগে সিভিল আপিল (নং ৭৪/১৯৯৯) করে, যা ২০০৬ সালের ২৭ জানুয়ারি শর্তসাপেক্ষে খারিজ হয়ে যায়।

প্রায় ১২ বছর পর রাজউকের দায়ের করা সিভিল রিভিউ পিটিশনও (নং ৯৫/২০১৫) দীর্ঘ বিলম্বের কারণে ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল আদালত খারিজ করে দেন। ২০২২ সালের ১২ জুন ভূমি মন্ত্রণালয়ের অধিগ্রহণ শাখা-১ থেকে জেলা প্রশাসকের কাছে আদালতের রায় বাস্তবায়নের নির্দেশনা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়।

এতে বলা হয়, জমিসংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে এবং আপিলের সম্ভাবনা বা জটিলতা না থাকলে সংশ্লিষ্ট সংস্থার মতামতের ভিত্তিতে আদালতের আদেশ যথাযথ প্রক্রিয়ায় বাস্তবায়ন করতে হবে।

ভূমি মন্ত্রণালয়ের চিঠির পর ২০২২ সালের ১১ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত রাজউকের লিগ্যাল অ্যাডভাইজার ও আইন পরিচালকের কার্যালয়ের নথি পর্যালোচনায়ও দেখা যায়, জমিটি অবমুক্ত করতে আইনি বাধা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। শুধু অতীতে কোনো ক্ষতিপূরণ নেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাইয়ের কথা বলা হয় নথিতে।

উচ্চ আদালতের রায় সত্ত্বেও জমি হস্তান্তর না করে রাজউক উল্টো ২০২৩ সালে সেখানে সীমানাপ্রাচীর ও ওয়াকওয়ে নির্মাণের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়। এর প্রতিবাদে মূল মালিকপক্ষ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে আবেদন করলে চেম্বার জজ গত বছরের ১০ সেপ্টেম্বর জমিতে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার নির্দেশ দেন।

আদালতের আদেশ অমান্য করে ফের উচ্ছেদ

আদালতের সুস্পষ্ট আদেশ অমান্য করে গত ১৪ মে রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও কর্মকর্তারা বুলডোজার ও এক্সকাভেটর দিয়ে জমির বিদ্যমান স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেন।

আদালতের আদেশ অবজ্ঞার অভিযোগে রাজউক চেয়ারম্যান মো. রিয়াজুল ইসলাম, এস্টেট ও আইন শাখার কর্মকর্তা, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শান্তা রহমান, ওয়ারী জোনের উপপুলিশ কমিশনার এবং শ্যামপুর থানার ওসিসহ সাত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যারিস্টার তাজুল ইসলাম চৌধুরীর মাধ্যমে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠানো হয়। পাশাপাশি সুপ্রিম কোর্টে আদালত অবমাননার পিটিশনও দাখিল করা হয়েছে।

আওয়ামী আমলে কাউন্সিলরের দখল, এখন এমপির কব্জায়

আইনি নথির জটিলতার সুযোগ নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গেন্ডারিয়ার এই শতবর্ষী পুকুর ও তার পাড় দখল করে রাজত্ব গড়ে তোলেন সাবেক কাউন্সিলর সাইদুর রহমান সহিদ এবং তার মেয়ে ডিএসসিসির ৪৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর সাহানা আক্তার। পুকুরপাড়ে তারা গড়ে তোলেন ড্রিম নাইট গার্ডেন সিট রেস্টুরেন্ট, একটি বড় এমব্রয়ডারি কারখানা, ডাইং ফ্যাক্টরি, শতাধিক দোকানের ফুলদানি মার্কেট, ছয়টি রিকশা-ভ্যান গ্যারেজ, ৪৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলরের অস্থায়ী কার্যালয়, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের কার্যালয় এবং শ্যামপুর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নাফিস হাসানের কার্যালয়।

জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর 'গেন্ডারিয়া ডিআইটি পুকুর রক্ষা কমিটি' নামের সংগঠনের ব্যানারে শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ইব্রাহিম আহমেদ রিপন, যুবলীগ নেতা আশিক ইকবাল আলমগীর ও বাদশা মিয়া পুকুরপাড়ের স্থাপনা দখলে নেন। পরে রাজউক সেখানে উচ্ছেদ অভিযান চালালে ইব্রাহিম আহমেদ রিপন সংসদ সদস্য এম এ জসিম উদ্দিনকে সঙ্গে নিয়ে পুকুর রক্ষার নামে নিজেরাই পুকুরটি দখলে নেন।

স্থানীয়দের দাবি, সংসদ সদস্য এম এ জসিম উদ্দিন পুকুরপাড়ে গিয়ে সবার সামনে গণপূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলেন।

এদিকে পুকুরের চারপাশে ভেকু (এক্সকাভেটর) বসিয়ে মাটি তুলে তা বিক্রি করে দিয়েছেন রিপন। এ সময় পুকুরপাড়ের চারদিকের গাছও কেটে ফেলা হয়েছে। পুকুরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম চালিয়েছে ডিএনসিসির সাবেক আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র আতিকুল ইসলামের একান্ত সচিব (এপিএস) ফরিদ উদ্দিনের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বিডি ক্লিন।

পুকুর করায়ত্ত করার পর নিজের প্রভাব জাহির করতে পুকুরপাড়ে উপস্থিত হয়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের সঙ্গে ভিডিও কলে কথা বলে পুকুর রক্ষায় সহযোগিতার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানান রিপন।

গত ৩১ জুলাই সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরের আশপাশের সব গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। চারদিকে ফেন্সিং জালের বেড়া দিয়ে নতুন গাছ লাগানো এবং অস্থায়ীভাবে একটি ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে।

প্রতিদিন বিকেল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত পুকুরপাড়ে লোকজন নিয়ে আড্ডা দেন ইব্রাহিম আহমেদ রিপন। পুকুরপাড়ে যে কোনো গাড়ি প্রবেশ নিষিদ্ধ লেখা থাকলেও রিপন নিজে টয়োটা ল্যান্ড ক্রুজার গাড়ি (নম্বর: ঢাকা মেট্রো-ঘ ১৫-৯১৭৭) নিয়ে পুকুরপাড়ে ঘুরে বেড়ান।

রাজউকে এমপি জসিমের চাপ

গত ১৪ জুলাই দুপুরে রাজউক চেয়ারম্যানের দপ্তরে সরাসরি উপস্থিত হয়ে গেন্ডারিয়ার ডিআইটি পুকুর ও আড়াই একর জমিসংক্রান্ত মামলায় দ্রুত ফয়সালা আদায়ে চাপ সৃষ্টি করেন কুমিল্লা-৫ আসনের এমপি এম এ জসিম উদ্দিন।

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে রাজউক চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেন, ‘গণপূর্তমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। ডিআইটি পুকুরের পাড়ের সৌন্দর্যবর্ধন করে চারদিকে পার্কিং তৈরি করে দেন।’

নদীখেকো আ.লীগ নেতা থেকে পুকুর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সদস্য ও ঢাকা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সানজিদা খানমের ঘনিষ্ঠ শ্যামপুর থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছিলেন ইব্রাহিম আহমেদ রিপন। শ্যামবাজার থেকে পোস্তগোলা পর্যন্ত এলাকা দখল ও চাঁদাবাজির নেতৃত্বে ছিলেন রিপন ও তার দুই ভাই।

বুড়িগঙ্গা নদীর কোলঘেঁষে পোস্তগোলা শ্মশানঘাট এলাকায় নদীর সীমানা খুঁটির প্রায় তিন একর জায়গা দেড় যুগ ধরে দখল করে বালু, ইস্পাতসামগ্রী ও জাহাজের ভাঙারি ব্যবসা পরিচালনা করেন তিনি।

২০১৯ সালের ১১ জুলাই এই অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করতে গেলে ইব্রাহিম আহমেদ রিপনের নেতৃত্বে তার অনুসারীরা বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমানসহ কর্মকর্তাদের ওপর হামলা চালান। এ সময় পুলিশ রিপনের ছোট ভাই বাপ্পীসহ তিনজনকে আটক করলেও রিপন পালিয়ে যান। জুলাই অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত জায়গাটি এই আওয়ামী লীগ নেতার দখলে ছিল। তার দখলদারত্বের কারণে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে সেখানে পরিকল্পিত নৌ-টার্মিনাল নির্মাণকাজও দীর্ঘদিন আটকে ছিল।

এখন এমপি জসিম উদ্দিনের ভাগনিজামাই পরিচয়ে রিপন বাংলাদেশ পুকুর রক্ষা কমিটি ও গেন্ডারিয়া পুকুর রক্ষা কমিটির আহ্বায়ক বনে গেছেন। জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার ওপর হামলার অভিযোগে একাধিক মামলায় ২০২৫ সালের ২৯ অক্টোবর অন্যান্য আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর সঙ্গে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) রিপনকেও আটক করেছিল। তারপরও দৃশ্যত তিনি এখন বিএনপি সরকারের একাধিক একাধিক এমপি-মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ।

মুনিয়া হত্যা মামলায়ও নাম আসে রিপনের

২০২১ সালে রাজধানীর গুলশানে ইব্রাহিম আহমেদ রিপনের ফ্ল্যাটে বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সায়েম সোবহান আনভীরের বান্ধবী কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়াকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগ উঠে।

ওই মামলায় আনভীরের সঙ্গে ইব্রাহিম আহমেদ রিপনকেও আসামি করা হয়। রাজধানীর ভাটারা ও শ্যামপুর থানায়ও তার বিরুদ্ধে একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে। এ ছাড়া বনানী থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯-এর (ধারা: ৮/৯(২)/১০/১১/১২) বিভিন্ন ধারায়ও মামলার আসামি তিনি।

বক্তব্য ও পাল্টা বক্তব্য সংশ্লিষ্টদের

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শ্যামপুর বিএনপি ও যুবদলের কয়েকজন পদধারী নেতা এশিয়া পোস্টকে বলেন, 'রিপন এক সময় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করত। সে সময় স্থানীয় এমপির মদদে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর দখল করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনা করত। এখন সেই পুকুর রক্ষার নামে সরকারি জমি দখলে নিয়েছে। আর এই কাজে তাকে কুমিল্লার সংসদ সদস্য, কয়েকজন মন্ত্রী আশকারা দিচ্ছেন। দীর্ঘদিন জেল-জুলমের শিকার হয়ে এখন রিপনের দাপটে এলাকায় আমাদের রাজনীতি করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে।'

ইব্রাহিম আহমেদ রিপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি পুকুর রক্ষা করাটা ভালো কাজ নাকি খারাপ কাজ—এই পাল্টা প্রশ্ন রেখে আর কিছু বলতে চাননি।

কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য এম এ জসিম উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন কল ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়েও সাড়া মেলেনি।

গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের মোবাইলে যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। পরে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য অফিসার মো. আলমগীর হোসেনের মাধ্যমে বক্তব্য জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ‘এই সম্পত্তি নিয়ে রাজউক চেয়ারম্যান কথা বলবেন।’

রাজউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম বলেন, ‘তৃতীয় পক্ষের কোনো তদবিরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না। পুকুরটি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। আইন বিভাগকে নির্দেশনা দিয়েছি, মামলাটি যেন দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হয়। এরপর আদালতের রায় বাস্তবায়ন করা হবে।’

মালিকপক্ষের আম-মোক্তার মো. জাকির হোসেন বলেন, 'দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় পুকুরসহ পাড়ের জমি নিয়ে আদালত আমাদের পক্ষে রায় দিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ আমলে কাউন্সিলর সহিদ ও শাহানা আক্তারের কারণে দখলে যেতে পারিনি। সে সময় রাজউকের আইন শাখা ও ভূমি মন্ত্রণালয় আমাদের জমি বুঝিয়ে দিতে সুপারিশ করেছিল। তবে রাজউক এত দিনেও বুঝিয়ে দেয়নি। যে আওয়ামী লীগ নেতা দেড় যুগ নদী দখল করেছিলেন, তিনিই এখন পুকুর রক্ষার নামে সরকারদলীয় এমপি ও মন্ত্রীদের ব্যবহার করে পুকুর দখলে নিয়েছেন। পুকুরের মাটি কেটে বিক্রি করে দিচ্ছেন। আমরা ফের আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার পাশাপাশি গত ১৩ জুলাই জেলা প্রশাসকের কাছে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য আবেদন করেছি।'

মানবাধিকার ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ (এইচআরপিবি)-এর পক্ষে সিনিয়র অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ বলেন, আদালত যেভাবে রাজউককে নির্দেশনা দিয়েছে, সেভাবেই রাজউক ব্যবস্থা নেবে। অন্য কারও নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সুযোগ নেই। এখানে নতুন করে পার্কিং বা অন্য কোনো কিছু করা যাবে না। পুকুর রক্ষার বিষয়টি আমরা বিভিন্ন সময় আদালতের নজরে এনেছি। এখন যদি কিছু হয়, আবার আদালতের নজরে আনব।