logo
Advertisement

এআই ও রোবটিকস শিখবে শিক্ষার্থীরা, মাধ্যমিকে ৩৩৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প

• মাধ্যমিকে বড় পরিবর্তনের লক্ষ্যে এনজিইপি প্রকল্প

• বাস্তবায়ন করবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)

• অগ্রাধিকার পাবে অনগ্রসর ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়

• এক হাজার ৫০ স্কুলে বসবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ল্যাব

• নির্মিত হবে তিন হাজার নতুন ও আধুনিক শ্রেণিকক্ষ

• ১০ হাজার প্রতিষ্ঠানে দেওয়া হবে ল্যাপটপ, রাউটার ও দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড

এশিয়া পোস্ট স্পেশাল
এআই ও রোবটিকস শিখবে শিক্ষার্থীরা, মাধ্যমিকে ৩৩৯৭ কোটি টাকার প্রকল্প
বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে রোবটিকস ও কম্পিউটার ল্যাবে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে শিক্ষার্থীরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে ৩ হাজার ৩৯৭ কোটি ৪৯ লাখ টাকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এর আওতায় নির্বাচিত এক হাজার ৫০টি বিদ্যালয়ে বসছে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ল্যাব। এগুলোতে শিক্ষার্থীরা শিখবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিকস ও কোডিং।

Advertisement

প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে নেক্সটজেন সেকেন্ডারি এডুকেশন প্রোগ্রাম (এনজিইপি)। বাস্তবায়ন করবে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)। মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির প্রসার এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই বিশাল কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্প আগামী বছরের জানুয়ারিতে শুরু হয়ে ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। এর মাধ্যমে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের সংস্কার ও আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হবে। সম্প্রতি এ সংক্রান্ত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে পরিকল্পনা কমিশনে।

অর্থায়নের সিংহভাগ বৈদেশিক সহায়তা

প্রকল্প ব্যয়ের বড় অংশ আসবে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ঋণ হিসেবে মিলবে ২ হাজার ৬৬২ কোটি টাকা। এটি মোট ব্যয়ের প্রায় ৭৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ।

গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর এডুকেশন (জিপিই) থেকে অনুদান হিসেবে আসবে ১৬৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা। বাকি ৫৬৬ কোটি ৯ লাখ টাকা অর্থায়ন করবে বাংলাদেশ সরকার নিজেই। পুরো প্রকল্পটি পরিচালিত হবে ‘ফলাফলভিত্তিক ঋণ’ বা রেজাল্ট বেজড লেন্ডিং পদ্ধতিতে।

মাউশির প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের ওপর গত ৪ আগস্ট মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুন নূর মুহম্মদ আল ফিরোজের সভাপতিত্বে যাচাই কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

সভায় জানানো হয়, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি-৪) অর্জনে এই প্রকল্পটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সিদ্ধান্তে প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য গত ১৩ আগস্ট পরিকল্পনা কমিশনের আর্থসামাজিক অবকাঠামো বিভাগে পাঠানো হয়েছে।

এর আগে চলতি বছরের ১৯ এপ্রিল প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য প্রথমবারের মতো পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়। তবে যাচাই-বাছাই করে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়ায় এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এসডিজি সংক্রান্ত বিশ্লেষণ না থাকায় সেটি ফেরত পাঠায় পরিকল্পনা কমিশন। পরে কমিশনের পর্যবেক্ষণের আলোকে ডিপিপি পুনর্গঠন করে ফের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগে পাঠানো হয়।

প্রকল্পের মূল লক্ষ্য মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত মান ও শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ানো। এর আওতায় আনন্দময় পরিবেশ তৈরি এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিখন জোরদার করা হবে। পাশাপাশি শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সক্ষমতা আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা হবে। জোর দেওয়া হবে মাউশি ও মাঠপর্যায়ের শিক্ষা অফিসগুলোর তদারকি ও ব্যবস্থাপনায়।

যাচাই কমিটির সভায় বলা হয়, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং সরকারের ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ ভিশন বাস্তবায়নে মাধ্যমিক স্তরের উন্নয়ন অপরিহার্য। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর (এসটিইএম) শিক্ষার প্রসার এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় শিক্ষার্থীদের টিকিয়ে রাখতেই এই প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ এবং দুর্গম ও অনগ্রসর এলাকার বিদ্যালয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

নতুন শ্রেণিকক্ষ ও প্রযুক্তি ল্যাব

শিক্ষার্থীদের জন্য আধুনিক ও বিশ্বমানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত এক হাজার উপজেলা পর্যায়ের মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তিনটি করে মোট তিন হাজার নতুন ও আধুনিক শ্রেণিকক্ষ নির্মাণ করা হবে। এর ফলে বিদ্যালয়গুলোতে শ্রেণিকক্ষ সংকট দূর হওয়ার পাশাপাশি মানসম্মত পাঠদানের সুযোগ তৈরি হবে। এক হাজার ৫০টি প্রতিষ্ঠানে পাঁচটি করে শ্রেণিকক্ষ মাল্টিমিডিয়া বা অ্যাকটিভ লার্নিং ক্লাসরুমে রূপান্তর করা হবে।

আধুনিক কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরিচয় করে দিতে এক হাজার ৫০টি বিদ্যালয়ে বিশেষ ল্যাব স্থাপন করা হবে। এগুলোতে রোবটিকস, কোডিং ও উন্নত প্রোগ্রামিং শেখার জন্য আধুনিক সরঞ্জাম থাকবে।

বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত শিক্ষার প্রসারে আধুনিক গবেষণাগারের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হবে। যেসব স্কুলে এই ল্যাব স্থাপন করা হবে, সেগুলো যাতে দীর্ঘমেয়াদে সচল থাকে, সে জন্য প্রয়োজনীয় জনবল—ল্যাব সহকারী বা টেকনিশিয়ান নিয়োগের ব্যবস্থা করা হবে।

ডিজিটাল বৈষম্য কমাতে ১০ হাজার মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ল্যাপটপ, রাউটার ও দ্রুতগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ নিশ্চিত করা হবে।

শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি

শুধু অবকাঠামো নয়, শিক্ষকদের মানোন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধিরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর আওতায় তিন লাখ ৬৯ হাজার ৬৪৩ জন শিক্ষককে আধুনিক পাঠদান পদ্ধতির ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। এ ছাড়া শিক্ষা খাতের প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে ১৩১ জনকে বিদেশে উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া হবে।

শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাইয়ের জন্য একটি অভিন্ন মূল্যায়ন পদ্ধতি বা ইউনিফায়েড অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম (ইউএএস) চালু করা হবে। ইউনিফায়েড অ্যাসেসমেন্ট সিস্টেম, ই-কনটেন্ট ও রূপান্তর বিষয়ক ১২১টি কর্মশালার আয়োজন করা হবে। জাতীয় পর্যায়ে প্রযুক্তিসক্ষম রিয়েল-টাইম মনিটরিং এবং ইউএএস চালু করা হবে। এ ছাড়া মাউশি ও মাঠপর্যায়ের শিক্ষা অফিসগুলোর তদারকি, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

অগ্রাধিকার পাবে অনগ্রসর এলাকা

এনজিইপি প্রকল্প নিয়ে যাচাই কমিটি বিস্তারিত পর্যবেক্ষণ দিয়েছে। তাদের মতে, প্রকল্পটি মানসম্মত শিক্ষা ও এডু-আইডি প্রবর্তনে ভূমিকা রাখবে। এটি চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের দক্ষতা, শিক্ষকের উন্নয়ন ও আনন্দময় শিক্ষা নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে কর্মমুখী ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা, বৈষম্য হ্রাস এবং ঝরে পড়া রোধে সহায়তা করবে। ফলে সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও এসডিজির লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে।

যাচাই কমিটির সভায় বিদ্যালয় নির্বাচনে স্বচ্ছতা নিশ্চিতের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রান্তিক শিক্ষার্থীরা যাতে সুফল পায়, সে জন্য মানা হবে কঠোর নীতিমালা। ভৌগোলিক ঝুঁকি, জলবায়ু প্রভাব ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলো অগ্রাধিকার পাবে। মাউশি ইতোমধ্যেই নির্দিষ্ট মানদণ্ডে বিদ্যালয় নির্বাচনের প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে।

আগস্টেই ঋণ আলোচনা সম্পন্ন হওয়ার কথা

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সঙ্গে ঋণের বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা বা ‘লোন নেগোশিয়েশন’ চলতি আগস্টেই সম্পন্ন হওয়ার কথা ছিল। এ ছাড়া অনুদানদাতা সংস্থা জিপিই-এর অনুমোদিত অর্থ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ব্যবহারের জন্য সব প্রস্তুতি শেষ করার ওপর সভায় গুরুত্বারোপ করা হয়।

প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলে আগামী বছরই এনজিইপির কার্যক্রম শুরু হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সফলভাবে এটি বাস্তবায়িত হলে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার মানে আমূল পরিবর্তন আসবে। এটি শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বরং দক্ষ শিক্ষক তৈরি এবং আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর কারিগরি শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে দেশকে একটি শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যাবে।