শাহজালালে ১১ মাসেও হয়নি কার্গো শেড, নষ্ট হচ্ছে হাজার কোটির পণ্য
• বিমানবন্দরের একমাত্র কার্গো ভিলেজ ও স্থায়ী শেড গত বছর আগুনে পুড়ে যায়
• ১১ মাস পেরিয়ে গেলেও নির্মাণ হয়নি নতুন স্থায়ী শেড
• খোলা আকাশের নিচে নষ্ট হচ্ছে ওষুধের কাঁচামাল, ইলেকট্রনিকসসহ নানা পণসামগ্রী
• দিনে গড়ে ৬০০ টনের বেশি আমদানি পণ্য আসে, সার্বক্ষণিক মজুত থাকে দুই থেকে আড়াই হাজার টন

ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে আমদানি করা হাজার কোটি টাকার পণ্য। গত বছর একমাত্র কার্গো ভিলেজ ও স্থায়ী শেড পুড়ে যাওয়ার পর নতুন স্থায়ী শেড নির্মাণ করেনি কর্তৃপক্ষ। ফলে বিদেশ থেকে আসা পণ্যসামগ্রী খোলা আকাশের নিচে ফেলে রাখতে হচ্ছে। স্থায়ী শেড না থাকলেও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে স্টোর চার্জ। দ্রুত সমাধানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো পদক্ষেপ।
বিমানবন্দরের একমাত্র কার্গো ভিলেজ এবং সামনে থাকা ১ লাখ ৫৮ হাজার বর্গফুটের স্থায়ী শেডটি গত বছরের ১৮ অক্টোবর পুড়ে যায়। পরে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নতুন কার্গো শেড নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। তবে ১১ মাসেও সেই প্রতিশ্রুতি আলোর মুখ দেখেনি।
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রতিদিন গড়ে ৫০টি ফ্লাইট অবতরণ করে। এর মধ্যে ৮ থেকে ১০টি চার্টার কার্গো ফ্লাইট। বাকি ৪০ থেকে ৪৫টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট। এসব ফ্লাইটে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিদিন আমদানি পণ্য আসে ৬০০ টনের বেশি।

চার্টার কার্গো থেকে পণ্য খালাস হতে গড়ে ৩ থেকে ৪ দিন সময় লাগে। ফলে বিমানবন্দরে সার্বক্ষণিক মজুত থাকে দুই থেকে আড়াই হাজার টন পণ্য। এই তিন-চার দিন ব্যবসায়ীদের গড়ে ২০ থেকে ৬০ হাজার টাকা স্টোর চার্জ গুনতে হয়। অথচ পণ্য রাখা হয় খোলা আকাশের নিচে।
বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে পণ্য, ত্রিপল দিয়ে ঢাকতেও দিতে হয় ঘুষ
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাইয়ে ঢাকায় ২০ দিন এবং আগস্টে ১৫ দিন বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে রানওয়েতে পড়ে থাকা অনেক পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত বা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়েছে।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন নতুন উদ্যোক্তারা। সীমিত পুঁজি নিয়ে চীন ও বিভিন্ন দেশ থেকে আনা মোবাইল এক্সেসরিজ ও ইলেকট্রনিকস পণ্য পানি ঢুকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিপাকে পড়ছেন গার্মেন্টস ও ওষুধশিল্পের আমদানিকারকরা। বাইরের তাপমাত্রায় রোদ-বৃষ্টিতে তাদের আনা বিভিন্ন কাঁচামালের মান ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না।
নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য চীন থেকে পণ্যসামগ্রী আমদানি করে স্কাইবাই বিডি। প্রতিষ্ঠানটির প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রাসেল বিন আহাদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘গত বছর যখন কার্গো শেডে আগুন লাগে তখন আমাদের আড়াই কোটি টাকার ক্ষতি হয়। রাজস্ব বোর্ডের সফটওয়্যারে আমদানি দেখানোয় ওই আড়াই কোটি টাকার শুল্কও দিতে হয়। সব মেনে নিয়েছি। কিন্তু গত ১১ মাসে একটি শেড নির্মাণ করতে পারল না। কোটি কোটি টাকার পণ্য আমদানির পর খোলা আকাশের নিচে রোদ-বৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে। অথচ দেখার কেউ নেই।’

এই ব্যবসায়ী বলেন, ‘প্রত্যেক পণ্যে স্টোর চার্জ কাটা হচ্ছে, অথচ স্টোরই নেই। সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ তরুণ উদ্যোক্তাদের পণ্য আমরা যারা নিয়ে আসি, পণ্য নষ্ট হওয়ায় আমাদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবসায়িক সুনাম নষ্ট হচ্ছে। এয়ারপোর্টে এই অবস্থা দেখে বিদেশিদেরও আমাদের দেশে বিনিয়োগের আগ্রহ নষ্ট হয়ে যায়।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেক উদ্যোক্তা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অল্প টাকা মূলধন আমার। গ্যাজেট আমদানি করি। বৃষ্টিতে চোখের সামনে ভিজে যাচ্ছে। কিছুই করতে পারছি না। তারা একটা ত্রিপলও দিচ্ছে না। নিজের টাকায় বাইরে থেকে ত্রিপল নিয়ে ভেতরে আমার পণ্য ঢেকে রাখতে যাওয়ার জন্য ১০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। এভাবে ব্যবসা করা কীভাবে সম্ভব? আমাদের মতো তরুণ উদ্যোক্তাদের যদি এভাবে ধ্বংস করে দেয় তাহলে দেশ কীভাবে এগোবে! আমাদের বলুক। আমরা ব্যবসায়ীরা মিলে নিজেরা টাকা দিয়ে শেড তৈরি করে দিচ্ছি, তাও দেবে না।’
এই ব্যবসায়ী আক্ষেপ করে বলেন, ‘পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের জীবনও ধ্বংস করে দিচ্ছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ। নাম বললে খুঁজে বের করে পরে আমদানির সাধই মিটিয়ে দেবে। পদে পদে হয়রানি করবে। আমরা ব্যবসায়ীরা বিমানবন্দরে এসে অসহায় বোধ করি।’
ঢাকা কাস্টমস এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সহসভাপতি খায়রুল কবির ভূঁইয়া মিঠু এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘খোলা আকাশের নিচে মাটিতে পণ্য পড়ে থাকলে বৃষ্টির পানি পড়বে, নিচ থেকে পানি উঠবে; এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত কার্গো শেডের সংস্কারকাজ ৯ মাসেও শেষ না হওয়া বড় ধরনের ব্যর্থতা।’
বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন রাগীব সামাদ বলেন, ‘যে পরিমাণ কার্গো আসছে, সে পরিমাণ পণ্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও আমদানিকারকরা খালাস করছেন না। ফলে জায়গার সংকট হচ্ছে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামত করে নতুনভাবে চালু করা সহজ কাজ নয়। আমরা জানি, বর্ষায় বৃষ্টিতে পণ্য ভিজেছে। কিন্তু যারা কনসাইনমেন্ট আনছেন তারা দ্রুত পণ্য নিয়ে গেলে এ পরিস্থিতি তৈরি হতো না। আমাদের সীমাবদ্ধতা আছে। সমাধানের জন্য থার্ড টার্মিনাল চালু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
