বিএনপি করায় ‘জঙ্গি নাটক’ সাজিয়ে দুই ভাইকে গুম, খোঁজ মেলেনি ১০ বছরেও

চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার পারদিলালপুর গ্রামের ৮০ বছর বয়সি কৃষক আইনাল হক। তার চার ছেলে সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। ছোট ছেলে সেতাউর রহমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক। তাকে ধরতে ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট রাতে পারদিলালপুরের বাড়িতে অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সেতাউরকে না পেয়ে তার বড় ভাই ইউনিয়ন যুবদলের সদস্যসচিব মিজানুর রহমানকে ধরে নিয়ে যায় শিবগঞ্জ থানা পুলিশ।
২০ লাখ টাকা দিলে মিজানুরকে ছেড়ে দেওয়া হবে, এমন শর্ত দেয় পুলিশ। স্বজনরা ধারদেনা করে কোনোমতে ৯ লাখ টাকা জোগাড় করেন। ওই টাকা শিবগঞ্জ থানার তৎকালীন এসআই মোয়াজ্জেম হোসেনের হাতে তুলে দেন মিজানুরের আরেক ভাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল কর্মী রেজাউল রহমান।

টাকা নেওয়ার পর এসআই মোয়াজ্জেম জানান, ঠিক সাত দিন পর রাজশাহী সাহেব বাজার মোড়ের ওভারব্রিজ এলাকায় মিজানুরকে ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু সাত দিন পার হলেও মিজানুরকে ফেরায়নি পুলিশ; উল্টো আরও ১১ লাখ টাকা দাবি করেন এসআই মোয়াজ্জেম। এ নিয়ে এসআই মোয়াজ্জেম ও রেজাউলের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা হয়।
ওই ঘটনার জেরে একই বছরের ২৭ ডিসেম্বর রাজশাহী শহরের একটি মেস থেকে রেজাউলকেও তুলে নিয়ে যায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অর্থাৎ চার মাসের ব্যবধানে দুই ভাইকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর তাদের আর কখনোই গ্রেপ্তার দেখানো হয়নি; খাতায়-কলমে তারা এখনও ‘নিখোঁজ’।

দীর্ঘ ১০ বছরেও ফেরা হয়নি দুই ভাইয়ের। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর নিখোঁজ দুই সন্তানকে ফিরে পাওয়ার শেষ আশায় বাবা আইনাল হক আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুম ও হত্যার অভিযোগ এনে মামলা করেছেন।

বিএনপি পরিবার বলেই কি এই দুর্গতি?
ছেলেরা বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয়; এমন কারণেই রাজশাহীর সীমান্তবর্তী পারদিলালপুর গ্রামের কৃষক আইনাল হকের পরিবারের ওপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের খড়্গ নেমে আসে বলে জানান জেলা বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আইনাল হকের চার ছেলেই দলীয় পদে সক্রিয়। এর মধ্যে ছোট ছেলে সেতাউর রহমান চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক, নিখোঁজ বড় ভাই মিজানুর রহমান শাহবাজপুর ইউনিয়ন যুবদলের সদস্যসচিব এবং ছোট ভাই নিখোঁজ রেজাউল রহমান রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সক্রিয় কর্মী ছিলেন। অপর ভাই আরিফুল ইসলাম ২ নম্বর শাহবাজপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। এ ছাড়া আইনাল হকের তিন জামাই দুরুল হুদা ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি, আনারুল ইসলাম ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি এবং ছমিরুদ্দিন স্থানীয় বিএনপি নেতা।
দেড় যুগের আওয়ামী শাসনামলে পরিবারটির ওপর দিয়েই শুধু মামলা-হামলা আর পুলিশি হয়রানির ঝড় বয়ে যায়নি, অন্তত ১৭টি রাজনৈতিক মামলায় বছরের পর বছর আদালতে চক্কর দিতে হয়েছে স্বজনদের। জেল খেটেছেন পরিবারের একাধিক সদস্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর গত দুই বছরে ১৬টি রাজনৈতিক মামলা থেকে তারা খালাস পান।
অভিযুক্ত তৎকালীন ডিআইজিসহ পুলিশের ১২ কর্মকর্তা
দুই ছেলেকে উদ্ধারের আশায় ট্রাইব্যুনালে করা মামলায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তৎকালীন পুলিশের অন্তত ১২ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়।
মামলায় আসামিরা হলেন—শিবগঞ্জ থানার তৎকালীন এসআই মোয়াজ্জেম হোসেন (বর্তমানে সিলেট পুলিশ ফাঁড়িতে সংযুক্ত), এসআই শাহ আলম (বর্তমানে রাঙ্গামাটিতে কর্মরত), ওসি রমজান আলী (অবসরপ্রাপ্ত), অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম (পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত) এবং রাজশাহী রেঞ্জের তৎকালীন ডিআইজি খুরশিদ হোসেন (অবসরপ্রাপ্ত)। অভিযুক্তদের মধ্যে মাহবুব আলম গুম ও হত্যার অভিযোগ সত্ত্বে পদোন্নতি পেয়ে ফেনীর এসপি পদে যোগ দিয়েছিলেন। পরে তীব্র সমালোচনার মুখে তাকে পদ থেকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়।

পরিবারের সদস্য ও এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালের ১৭ আগস্ট বিকেলে ছাত্রদল নেতা সেতাউরকে ধরতে পারদিলালপুরে যায় পুলিশ ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। সেতাউরকে না পেয়ে তার ভাই যুবদল নেতা মিজানুরকে তুলে নিয়ে যান শিবগঞ্জ থানার তৎকালীন এসআই মোয়াজ্জেম হোসেন, এসআই শাহ আলম ও ওসি রমজান আলীসহ একটি দল। এই অভিযানে সহায়তা করেন স্থানীয় ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ নেতা আব্দুস সালাম, রোকন আলী, ইসতিয়াক আলী, আবুল কালাম আজাদ ও তৌহিদুল ইসলাম।
অভিযানের সময় গ্রামবাসী বাধা দিলে তাদের মামলা ও গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো হয়। এরপর পরিবার ও গ্রামবাসী তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলমের সঙ্গে দেখা করলে তিনি পরদিন শিবগঞ্জ থানায় যেতে বলেন। কিন্তু পরদিন থানায় গেলে তৎকালীন ওসি জানান, মিজানুরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রাজশাহীর তৎকালীন ডিআইজি খুরশিদ হোসেনের কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। স্বজনরা ডিআইজি অফিসে গেলে ডিআইজি খুরশিদ হোসেন পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে তাড়িয়ে দেন।
পরে এসআই মোয়াজ্জেমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি মিজানুরকে ছাড়ানোর বিনিময়ে ২০ লাখ টাকা দাবি করেন। টাকা না দিলে মিজানুরকে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়। এ নিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে দলীয় তহবিল ও ব্যক্তিগত জমাকৃত অর্থ মিলিয়ে ৯ লাখ টাকা এসআই মোয়াজ্জেমের কাছে দেন ভাই রেজাউল। কিন্তু নির্ধারিত সাত দিন পর মোয়াজ্জেম বাকি ১১ লাখ টাকা দাবি করেন। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার জেরে ২০১৬ সালের ২৭ ডিসেম্বর রাজশাহী শহরের একটি মেস থেকে রেজাউলকেও তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
পরদিন রেজাউলকে হাতকড়া পরিয়ে গ্রামের বাড়িতে এনে তল্লাশি চালায় পুলিশ। সেতাউরকে ধরিয়ে দিলে দুই ভাইকে ছেড়ে দেওয়া হবে এমন হুমকি দিয়ে মারধর করতে করতে রেজাউলকে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এরপর আর তাদের খোঁজ মেলেনি।
স্বজনদের কান্না আর অজানা পরিণতি
সেতাউর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি, আমার ভাই মিজানুরকে “অপারেশন ঈগল হান্ট” নামে তথাকথিত জঙ্গি আস্তানার নাটকে “ক্রসফায়ারে” হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু তার লাশটি পর্যন্ত আমাদের দেওয়া হয়নি। আর ছোট ভাই রেজাউলের কী পরিণতি হয়েছে, আজ পর্যন্ত জানতে পারিনি। ভাইকে বাঁচাতে পুলিশকে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিলাম, অথচ তারা টাকা নিয়েও ভাইদের ফিরিয়ে দিল না। অভিযুক্ত এসআই মোয়াজ্জেমসহ পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা এখনও বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন।’
-e82879.jpeg)
জানা গেছে, বিচার ও নিখোঁজ ভাইদের সন্ধানের দাবিতে ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে দেখা করেছেন সেতাউর। তিনি বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য তার ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি আতিকুর রহমান রুমনকে নির্দেশ দিয়েছেন এবং পরিবারটিকে সহায়তার আশ্বাস দিয়েছেন।

দুই ছেলেকে হারিয়ে বাবা আইনাল হক আজ মানসিক ও শারীরিকভাবে বিধ্বস্ত। সন্তানের নাম তুললেই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন বৃদ্ধ বাবা। আজও তিনি পথ চেয়ে বসে আছেন কখন ফিরবে তার দুই সন্তান।
তথ্য-প্রমাণ যা বলছে
এশিয়া পোস্টের অনুসন্ধানে জানা যায়, দুই ভাই গুম হওয়ার ঘটনায় এসআই গাজী মোয়াজ্জেম ও এসআই শাহ আলম সরাসরি জড়িত ছিলেন। এই অভিযানে ঢাকা থেকে আসা কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্র্যান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের একটি দলও অংশ নেয়। তৎকালীন সিটিটিসির পরিদর্শক আজিজুল হক মিয়া এবং এসআই কাওছার মিয়ার উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযানটির ভিডিওচিত্র ধারণ করার চেষ্টা করলে এসআই মোয়াজ্জেম তা কেটে মুছে দেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, ‘অপারেশন ঈগল হান্ট’ নামের কথিত জঙ্গি অভিযানের সময় সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মাহবুব আলম সামনের সারিতে ছিলেন। সেই অভিযানে মিজানুরসহ কয়েকজনকে ঠান্ডা মাথায় হত্যার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্তদের দাবি ও বর্তমান অবস্থা
মামলায় অভিযুক্ত তৎকালীন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বর্তমানে এসপি) মাহবুব আলম এশিয়া পোস্টের কাছে সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘এই অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ঘটনার যে তারিখ উল্লেখ করা হয়েছে, সেই সময়ে আমি ১৫ দিনের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণে ঢাকায় ছিলাম। চাঁপাইনবাবগঞ্জে আমার উপস্থিতিই ছিল না। তা ছাড়া আমি তখন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) হিসেবে দায়িত্বে ছিলাম। অপারেশনের বিষয়ে তৎকালীন এসপি ও ওসি বলতে পারবেন।’
দ্রুত বিচারে ট্রাইব্যুনালের দৃশ্যমান পদক্ষেপের দাবি
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক গোলাম জাকারিয়া বলেন, ‘২০১৬ সালে দুই ভাইকে গুম করার ঘটনার শোকে তাদের মা স্ট্রোক করে মারা যান। গুমের ঘটনাটি নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল ঘটনাস্থলে এসে সশরীরে তদন্ত করে গেছে। আমরা চাই, এই গুম ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত সব পুলিশ কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতার দ্রুত বিচার হোক।’


