ডিজিটাল সংযোগ প্রকল্প /মালামাল ছাড়াই ৯২ কোটি টাকা বিল পরিশোধ, ১৫৫ কোটির অনিয়ম

চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করে কোনো মালামাল সরবরাহ না করেই ‘ডিজিটাল সংযোগ স্থাপন’ (ইডিসি) প্রকল্পে ৯২ কোটি ২৬ লাখ টাকা বিল পরিশোধ করা হয়েছে। রাউটার কেনায় অতিরিক্ত খরচ, আসবাবপত্র ও পরামর্শক ফি-সহ বিভিন্ন খাত মিলিয়ে আর্থিক অনিয়মের পরিমাণ ১৫৫ কোটি টাকারও বেশি।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে এই অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে অপটিক্যাল ফাইবার কেবল কেনাকাটা ঘিরে সংঘটিত অনিয়মকে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় আর্থিক জালিয়াতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নথিপত্র যাচাই না করে বিশাল অঙ্কের অর্থছাড়কে আর্থিক শৃঙ্খলার চরম লঙ্ঘন বলছে আইএমইডি।
তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত উচ্চগতির ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দিতে ৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয় ইডিসি প্রকল্প। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তর প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে।
২০২১ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরে। কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ বাড়ানো হয় ২০২৬ সালের নভেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও অগ্রগতি হতাশাজনক।

চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত সার্বিক বাস্তব অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, আর্থিক অগ্রগতি ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। মূল মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হলেও পাঁচ ভাগের এক ভাগ কাজও শেষ হয়নি। ফলে মেয়াদ আরও বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত দ্বিতীয় সংশোধনীতে মেয়াদ আরও ৩ বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের নভেম্বর পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ চার বছরের কাজ শেষ করতে এখন সময় লাগবে প্রায় আট বছর। এর সঙ্গে প্রকল্পের ব্যয়ও কমিয়ে ৫ হাজার ৯২৩ কোটি টাকা থেকে ২ হাজার ৫৪৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
আইএমইডির পরিবীক্ষণ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তদারকি ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব প্রকল্পের সফলতার পথে বড় বাধা। গুণগত মান বজায় রেখে বাকি কাজ শেষ করতে প্রশাসনিক সংস্কার ও স্বচ্ছতা প্রয়োজন।
রাউটারে সাড়ে ২৪ কোটি টাকার ক্ষতি
মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন প্যাকেজে অসামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ করে রাউটার কেনায় সরকারি তহবিলের ২৪ কোটি ৫৩ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

একই রাউটার ভিন্ন প্যাকেজে ভিন্ন দামে কেনার প্রমাণ মিলেছে। কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ছিল না। যোগসাজশের মাধ্যমে বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছে রাউটারগুলো।
অফিস সংস্কার ও আউটসোর্সিংয়ে অনিয়ম
উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) বরাদ্দ না থাকলেও অফিস সংস্কারের জন্য ২ কোটি ৮৩ লাখ টাকার চুক্তি হয়েছে। ওই অর্থ ব্যয় হয়েছে আসবাবপত্র কেনায়। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের নির্ধারিত হারের বেশি অফিস ভাড়া দেওয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে ১৮ লাখ ১৭ হাজার টাকা।
প্যাচ কর্ড কেনাকাটায় অত্যধিক পরিমাণ দেখিয়ে ৭ কোটি ২৯ লাখ টাকার অনিয়মিত চুক্তি হয়েছে। আউটসোর্সিং জনবল নিয়োগে সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ ছাড়াই পরিশোধ করা হয়েছে ১২ কোটি ২২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা লঙ্ঘন করে ব্যয় হয়েছে আরও ১১ কোটি ৬৭ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৭ টাকা।
ত্রৈমাসিক অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা না দিয়ে স্থানীয় পরামর্শকদের পরিশোধ করা হয়েছে ৩ কোটি ৮ লাখ টাকা। ব্যক্তিগত পরামর্শক নিয়োগে পিপিআর-২০০৮ লঙ্ঘন করে ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা। অভ্যন্তরীণ অডিট ব্যবস্থা কার্যকর না থাকা এবং কেনাকাটায় পিপিআর যথাযথভাবে অনুসরণ না করাই এই ধারাবাহিক অনিয়মের মূল কারণ।
সংযোগ শুধু কাগজে-কলমে
কাগজে-কলমে দাবি করা হয়েছে, প্রায় ৫৫ হাজার প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র এই দাবির সঙ্গে মেলে না।
আইএমইডির জরিপে সংযোগ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোর ৫০ দশমিক ৫২ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের সংযোগ প্রায়ই বিচ্ছিন্ন থাকে। অনেক ক্ষেত্রে সংযোগ দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যেই তা অকেজো হয়ে পড়ে।
অকেজো সরঞ্জাম, বিদ্যুৎ সংকট
মাঠপর্যায়ে সরবরাহ করা আইটি সরঞ্জামের মান ও রক্ষণাবেক্ষণে চরম অব্যবস্থাপনার তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। অনেক প্রতিষ্ঠানে সরঞ্জাম স্থাপনের এক মাসের মধ্যেই কারিগরি ত্রুটি দেখা দিচ্ছে, কিন্তু মেরামতে ভেন্ডর বা আইএসপি প্রতিষ্ঠান থেকে কার্যকর সাড়া মিলছে না। যন্ত্রপাতি নষ্ট হওয়ার খবর জানানো হলেও ভেন্ডররা সময়মতো টেকনিশিয়ান পাঠায় না, ফলে মূল্যবান ডিজিটাল সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় নষ্ট হচ্ছে।

নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের অভাব প্রকল্পের অন্যতম বড় বাধা। ৪২ দশমিক ০৬ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাটে ডিজিটাল যন্ত্রপাতির ব্যবহার মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ইউপিএস বা পাওয়ার ব্যাকআপ ব্যবস্থা নেই; কিছু এলাকায় থাকলেও তা বেশিরভাগ সময় সচল থাকে না।
বিদ্যুতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইন্টারনেটের ধীরগতির সমস্যা। চুক্তি অনুযায়ী ২০ এমবিপিএস গতি দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে তা শূন্য এমবিপিএসে নেমে আসে।
পদ্ধতিগত দুর্বলতা
কেন্দ্রীয় ক্রয় মডেলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে ইন্টারনেট সংযোগ স্থাপনের গড় ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৪ হাজার ৩২৬ টাকা, যা বাজারদরের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি। উপজেলা আইসিটি কর্মকর্তাদের হাতে কোনো আর্থিক বা প্রশাসনিক ক্ষমতা না থাকায় কারিগরি ত্রুটি মেরামতে দীর্ঘ সময় লাগছে।

নথিপত্রে উপজেলা পর্যায়ে ১০০টি আইসিটি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ শেষ হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে ফিনিশিংয়ের কাজে গাফিলতি দেখা গেছে।
দিনাজপুরের বিরামপুরে নতুন ভবনের ছাদ থেকে পানি চুইয়ে পড়ে, খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় ভবনের ফিটিংস ঠিকমতো কাজ করছে না। অনেক জায়গায় আসবাবপত্র সরবরাহ হলেও স্থাপন করা হয়নি। এতে করে সরকারি সম্পদ অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
অদক্ষ ব্যবস্থাপনা
গত ৪ বছরে ৩ বার প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বদল হয়েছে। ৬৪৪টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৬১টি গুরুত্বপূর্ণ পদ এখনও শূন্য, যার বেশিরভাগ কারিগরি ও তদারকি সংশ্লিষ্ট।
অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ৭১ জন সরকারি জনবল নিয়োগের অনুমোদন থাকলেও নিয়োগ পেয়েছেন মাত্র ৭ জন। ঘন ঘন পিডি বদল ও জনবল সংকটে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া স্থবির হয়ে পড়েছে বলে মনে করছে আইএমইডি।
আইএমইডির সুপারিশ
প্রকল্পের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে আইএমইডি। এর মধ্যে রয়েছে ব্যান্ডউইথ বৃদ্ধি, বিকল্প সংযোগ ও নেটওয়ার্ক রিডান্ডেন্সি ব্যবস্থা গ্রহণ, উপজেলা আইসিটি সেন্টারের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিতকরণ, কার্যকর মনিটরিং কাঠামো প্রবর্তন, বাস্তবভিত্তিক ক্রয় পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন।

এর পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার, সাইবার নিরাপত্তা ও ডাটা সংরক্ষণ নিশ্চিতের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
প্রকল্প পরিচালকের বক্তব্য
সামগ্রিক বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে প্রকল্প পরিচালক তানজিনা ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘অডিট কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নিয়োজিত নিরীক্ষা কর্মকর্তা কর্তৃক মাঠপর্যায়ে দেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে শুধু দুটি জেলার ছয়টি প্রতিষ্ঠানে যাচাই-বাছাই করেছেন। সেখানে দুটি প্রতিষ্ঠানে রাউটার ও মিডিয়া কনভার্টারের মধ্যকার সংযোগটি চার কোরের পরিবর্তে দুই কোরের অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের মাধ্যমে দেওয়া হয়েছিল।’
তিনি বলেন, ‘এর পরিপ্রেক্ষিতে জুন ২০২৫ পর্যন্ত দেওয়া সংযোগের গাণিতিক হারের বিবেচনায় মোট ৯২ কোটি ২৬ লাখ টাকার অডিট আপত্তি দিয়েছে। পরে যেসব প্রতিষ্ঠানে চার কোরের পরিবর্তে দুই কোরের অপটিক্যাল ফাইবার কেবলের মাধ্যমে সংযোগ দেওয়া হয়েছে সেগুলোতে চার কোরের অপটিক্যাল ফাইবার কেবল প্রতিস্থাপন করা হয়। উত্থাপিত অডিট আপত্তি নিষ্পত্তির বিষয়টি বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’
রাউটারের ভিন্ন ভিন্ন দামের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘উন্মুক্ত পদ্ধতিতে প্রস্তাব আহ্বান করা হয় এবং প্রায় ১৫০টি আইএসপি প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশগ্রহণ করে। প্রতিষ্ঠানগুলো একই আইটেমের জন্য বিভিন্ন দরে আর্থিক প্রস্তাব দাখিল করে। রাউটারের দাম একেক প্রতিষ্ঠান দাখিল করলেও সব আইটেমের মোট দাম প্রকল্প দপ্তর কর্তৃক প্রস্তুতকৃত দাপ্তরিক প্রাক্কলিত ব্যয়ের মধ্যেই ছিল। এতে কোনো আর্থিক ক্ষতি হয়নি।’

দায়িত্ব নির্ধারণ ছাড়াই আউটসোর্সিং জনবলকে ১২ কোটির বেশি টাকা পরিশোধের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আউটসোর্সিং জনবলের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। তার পরিপ্রেক্ষিতেই সর্বনিম্ন দরদাতার সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।’
৫২ ভাগ ব্যবহারকারীর ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথের দাম গ্রাহক কর্তৃক আইএসপি প্রতিষ্ঠানকে পরিশোধ না করায় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যান্ডউইথ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। নিরবচ্ছিন্ন সেবা অব্যাহত রাখতে ব্যান্ডউইথের দাম গ্রাহক কর্তৃক পরিশোধের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে।’
সরঞ্জাম নষ্ট হওয়ার পর যথাসময়ে ভেন্ডরদের সাড়া না পাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আইএসপি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক সরবরাহকৃত সব সরঞ্জামের সংযোগ প্রদানের সময় থেকে ১ বছরের ওয়ারেন্টি। এই সময়ের মধ্যে যেসব সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে, সেগুলো সংশ্লিষ্ট আইএসপি প্রতিষ্ঠান বদলে দিয়েছে। এরপর কারও ইকুইপমেন্ট হলে সেটা নিজ খরচে ঠিক করতে হবে। এ ছাড়া ইন্টারনেট সংক্রান্ত যে কোনো প্রয়োজনে অবশ্যই আইএসপি প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যথাসময়ে সাড়া দিতে হবে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
.png)






