logo

ধর্মীয় বক্তা মিসবাহর ষষ্ঠ স্ত্রী দাবি করে প্রকাশ্যে এলেন রোহিঙ্গা নারী

ধর্মীয় বক্তা মিসবাহর ষষ্ঠ স্ত্রী দাবি করে প্রকাশ্যে এলেন রোহিঙ্গা নারী
ষষ্ঠ স্ত্রী দাবি করা মেহের আফরিন ও মাওলানা হাবিবুর রহমান মিসবাহ। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

ইসলামী বক্তা ও ৩১৩ প্রোপার্টিজের চেয়ারম্যান মাওলানা হাবিবুর রহমান মিসবাহর ব্যক্তিগত জীবন ও কর্মকাণ্ড নিয়ে নতুন অভিযোগ সামনে এসেছে। নিজেকে মিসবাহর ষষ্ঠ স্ত্রী দাবি করে প্রকাশ্যে এসেছেন মেহের আফরিন নামের এক রোহিঙ্গা নারী।

তার অভিযোগ, বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র ও পাসপোর্ট তৈরি করে দেওয়ার আশ্বাসে তাকে রোহিঙ্গা শিবির থেকে বের করে আনা হয়। পরে বিয়ের আশ্বাসে শারীরিক সম্পর্ক, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি এবং জোরপূর্বক গর্ভপাত করানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে।

অনলাইন সংবাদমাধ্যম ফেস দ্য পিপল-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব অভিযোগের পাশাপাশি অডিও-ভিডিও, আর্থিক লেনদেনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেহের আফরিন ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে মাওলানা হাবিবুর রহমান মিসবাহর সঙ্গে তার পরিচয় হয়।

মেহেরের দাবি, শুরুতে তাকে দ্বিতীয় স্ত্রী করার কথা বলেছিলেন মিসবাহ। তবে পরে তিনি জানতে পারেন, মিসবাহর স্ত্রীর সংখ্যা প্রায় ১০ জন।

মেহেরের অভিযোগ, বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), পাসপোর্ট তৈরি এবং সৌদি আরবে পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে তাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প থেকে বের করে আনা হয়। পরে মিসবাহ তাকে একটি ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে দেন। ওই পরিচয়পত্র ব্যবহার করে পাসপোর্টের জন্যও আবেদন করা হয়েছিল বলে দাবি তার। একজন রোহিঙ্গা নারীর নামে কীভাবে বাংলাদেশি পরিচয়পত্র তৈরি হলো, এ ঘটনায় কারা জড়িত তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

মেহেরের ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ এপ্রিল ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে বড় মাদরাসা-সংলগ্ন একটি স্টিল ভবনের পঞ্চম তলায় মিসবাহর ভাড়া বাসায় তারিকুল ও আল আমিন নামের দুই ব্যক্তির উপস্থিতিতে তাদের মৌখিক বিয়ে হয়। তবে কোনো কাবিননামা করা হয়নি।

ফেস দ্য পিপল-এর প্রতিবেদনে এ সম্পর্কিত আর্থিক লেনদেনের তথ্যও পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ৭ এপ্রিল মিসবাহর ব্যক্তিগত বিকাশ অ্যাকাউন্ট থেকে মেহেরের কাছে প্রথমে ৫০ হাজার এবং পরে আরও ৩০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। বাসাভাড়া ও আনুষঙ্গিক খরচের জন্য এসব টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে জানান মেহের।

প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট জান্নাতুল ফেরদৌসের সঙ্গে মিসবাহর একটি কথোপকথনের অডিও প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে কাবিননামা ছাড়া রোহিঙ্গা নারীকে মৌখিকভাবে বিয়ে এবং পরবর্তী সময়ে ওই নারীর পরিচয়পত্র ভুয়া প্রমাণিত হলে সম্ভাব্য আইনি জটিলতা নিয়ে আলোচনা করতে শোনা যায় মিসবাহকে।

উল্লেখ্য, ওই আইনজীবী প্রথমে বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে যুক্ত থাকলেও পরে মিসবাহর পক্ষে অবস্থান নেন বলে অভিযোগ করেছেন মিসবাহর সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আল ইমরান।

ফেস দ্য পিপলের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নারী একটি রুমে একটি ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করছেন। পেছনের বিছানায় ঘুমিয়ে আছেন একজন ব্যক্তি। ওই কক্ষটিতে ঘুমন্ত ব্যক্তিকে মিসবাহ শনাক্ত করেছেন মিসবাহর পঞ্চম স্ত্রী নাঈমা জান্নাত এবং তার সাবেক ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আল ইমরান। তারা ওই রুমটিকে মিসবাহর যাত্রাবাড়ীর শয়নকক্ষ হিসেবে দাবি করেছেন।

মিসবাহর সঙ্গে প্রায় ছয় বছর কাজ করা সাবেক পিএস আল ইমরানও এ ঘটনায় বেশ কিছু অভিযোগ তুলেছেন। তার দাবি, রোহিঙ্গা নারীকে ঢাকায় এনে নিরাপদে রাখার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় তাকে ষড়যন্ত্রকারী আখ্যা দিয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া ভুয়া ফেসবুক আইডি ব্যবহার করে তার স্ত্রীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং ভিডিও কলে অশালীন আচরণের অভিযোগও করেছেন তিনি।

এ বিষয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন বলেন, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি বা তৈরিতে সহায়তা করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০২৩-এর ২৩ ধারায় জাতীয় পরিচয়পত্র জাল করা কিংবা এ কাজে সহায়তার জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

তিনি বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ৯খ ধারায় দৈহিক বলপ্রয়োগ ছাড়া বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ১৬ বছরের বেশি বয়সী কোনো নারীর সঙ্গে যৌনকর্ম এবং ওই সময় উভয়ের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক থাকলে অনধিক সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।

যা বললেন মিসবাহ

এসব অভিযোগ অস্বীকার করে মাওলানা মিসবাহ জানান, রোহিঙ্গা নারীকে তিনি চেনেন না। কোনো প্রমাণ বা নথি ছাড়াই তাকে হেনস্তা করা হচ্ছে। এর পেছনে রাজনৈতিক বা ব্যবসায়িক প্রতিহিংসা থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন তিনি।

তার ভেরিফাইড ফেসবুক থেকে দেওয়া এক পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন, ‘নাটক দেখে করিসনে ভয় আড়ালে তার সত্য হাসে’।

তিনি লিখেছেন, ‘৯/১০ বিয়ের গল্প উপভোগ (!) করতে প্রস্তুত থাকুন! আপাতত হাতের তালুতে গরম ঝোল চেটে দেখুন তরকারীর স্বাদটা কেমন হতে পারে। লবণ কম বেশি! অডিওর এই মেয়েই রোহিঙ্গা কি না জানি না। তবে ওরা যে মেয়েকে রোহিঙ্গা বলে ভিডিও বানিয়েছে, এই অডিও তারই।’

মিসবাহ লেখেন, ‘আর ঘোমটা রেখে লাভ কী? ধৈর্যই তো ধরেছিলাম, ওরা সেটাকে দুর্বলতা ভেবেছে। এবার সত্যিই সাংবাদিকতা শেখাব ইনশাআল্লাহ। চাঞ্চল্যকর কত প্রকার ও কী কী সব শেখাব।’

তার অভিযোগ, ‘প্রত্যেক নাটকের পেছনে বাস্তব একটা চিত্র থাকে যা সহজে সামনে আসে না। এবার আসবে। আমাকে এতটা হেনস্তা করার পরও বলার মতো কোনো পদক্ষেপই নিইনি। অথচ আমার কাছে কত তথ্য আছে তার হিসাব নাই। ধৈর্য ধরেছি। ওদের ষড়যন্ত্র এবং মিথ্যাচার প্রমাণ করার মতো সব ডকুমেন্টস থাকার পরও আমি নীরব থাকার ইখতিয়ারই করেছিলাম।’

শেষতক আর দিল না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পরকীয়াবাজগুলা চোরের মনে পুলিশ পুলিশ থেকে তাড়াহুড়া করে ফেলেছে বেশি। ভেবেছে আমি কিনা কী প্রকাশ করে বসি, তাই নতুন নাটকটা সাজিয়েছে। আমার কোম্পানির পেছনে যেভাবে লেগেছে তাতে মনে হচ্ছে, ওদের ইহকালীন পরকালীন সাধনাই হলো আমার কোম্পানির ক্ষতি করা। চরিত্রহীনগুলার এমন কিছু সামনে আসতেছে যা দেখে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারবেন না। আজ এতটুকুই, এরপরও ধৈর্যের সবকের চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। দেখি পারি কি না। ’