পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রী কেন

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে এখন একজন পূর্ণ মন্ত্রীর পাশাপাশি রয়েছেন দুজন প্রতিমন্ত্রী। তারা হলেন, ফরিদপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রীর সাবেক পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির।
গতকাল শুক্রবার (২১ আগস্ট) মন্ত্রিসভায় সম্প্রসারণ ও নতুন করে দায়িত্ব বণ্টনের পর হুমায়ুন কবিরকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী করা হলে একই মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যা দাঁড়ায় দুজনে।
কেন দুজন প্রতিমন্ত্রী
একটি মন্ত্রণালয়ে একাধিক প্রতিমন্ত্রী থাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় নজিরবিহীন। এ ছাড়া পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ে একই সময়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পাওয়ায় বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, একই দায়িত্ব দুজনকে দেওয়ার অন্যতম কারণ হতে পারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাজের ব্যাপকতা। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, বহুপক্ষীয় কূটনীতি, জাতিসংঘ, আঞ্চলিক সহযোগিতা, প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, সীমান্ত, রোহিঙ্গা সংকট এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে রাজনৈতিক সম্পর্কসহ বিভিন্ন ইস্যুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বের পরিধি অনেক বিস্তৃত।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন বিন্যাসে কাজ ভাগ করে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একজন প্রতিমন্ত্রীকে নির্দিষ্ট কিছু দ্বিপক্ষীয় বা রাজনৈতিক ইস্যুতে এবং অন্যজনকে বহুপক্ষীয় কূটনীতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা কিংবা বিশেষ কোনো কৌশলগত বিষয়ে দায়িত্ব দেওয়া সম্ভব। তবে কোন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব কোন কোন বিষয়ে নির্দিষ্টভাবে ভাগ হবে, তা প্রশাসনিক আদেশ বা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ কর্মবণ্টনের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়ার বিষয়।
এ বিষয়ে এশিয়া পোস্টে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সাবেক কূটনীতিক হুমায়ুন কবির বলেন, ‘পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের জন্যই নিয়োজিত থাকবেন। আমার ধারণা উনার অনুপস্থিতিতে মন্ত্রণালয়ের কাজ চালাবার জন্যই এই ব্যবস্থাটা নেওয়া হয়েছে’।
একই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রীর ফলে কাজের পরিধি আরও একটু বাড়বে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে হুমায়ুন কবির বলেন, ‘কাজের পরিধি তো ইতোমধ্যেই বেড়েছে। কাজ দুজনের মধ্যে কাজ ভাগ করে দেওয়াও হতে পারে। সেটাও সম্ভব। উনি (হুমায়ুন কবির) তো আগেও উপদেষ্টা ছিলেন, এখন এটাকে ফর্মালাইজ করা হলো।’
আইনি ও সাংবিধানিক বিধান কী
সংবিধানের ৫৬ অনুচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রীদের রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগের বিধান রয়েছে। কোন মন্ত্রণালয়ে কতজন প্রতিমন্ত্রী থাকবেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নিষেধাজ্ঞা বা সীমাবদ্ধতা সংবিধানে নেই।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রশাসনের মতে, কাজের গতি ও পরিধি বাড়াতে একটি মন্ত্রণালয়ে একাধিক প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং এতে কোনো আইনি জটিলতা বা অসংগতি তৈরি হয় না।
এক মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রী থাকা নিয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি জানান, এক মন্ত্রণালয়ে একাধিক প্রতিমন্ত্রী থাকলে কাজের ক্ষেত্রে কোনো আইনি জটিলতা বা অসুবিধা নেই।
শামা ওবায়েদ ও হুমায়ুন কবিরের ভূমিকা
শামা ওবায়েদ ইসলাম চলতি সরকারের শুরু থেকেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। গত কয়েক মাসে তিনি বিভিন্ন বিদেশি কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের নানা ইস্যুতেও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন তিনি।
অন্যদিকে হুমায়ুন কবির এত দিন প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে সরকারের কূটনৈতিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। বিশেষ করে ভারত, ইউরোপীয় দেশসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক এবং সরকারের পররাষ্ট্রনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি সক্রিয় ছিলেন। জুলাই মাসেও তিনি পাঁচ ইউরোপীয় রাষ্ট্রদূত ও জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেন।
নতুন ব্যবস্থায় কী পরিবর্তন
২১ আগস্টের মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পর হুমায়ুন কবির আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন এবং তাকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শামা ওবায়েদ ইসলামও তার আগের পদে বহাল থাকেন। ফলে একই মন্ত্রণালয়ে দুজন প্রতিমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি নিশ্চিত হয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুজন প্রতিমন্ত্রী মানেই দুজনের ক্ষমতা বা দায়িত্ব একেবারে সমান ও অভিন্ন হবে, এমন নয়। সরকারের কর্মবণ্টন অনুযায়ী মন্ত্রী প্রতিমন্ত্রীদের নির্দিষ্ট দায়িত্ব অর্পণ করতে পারেন। ফলে বাস্তবে কে কোন অঞ্চলের বা কোন ধরনের কূটনৈতিক ইস্যু দেখবেন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
সামনে গুরুত্ব বাড়বে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের
কূটনীতি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশের সামনে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের পাশাপাশি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, সীমান্ত পরিস্থিতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অভিবাসন এবং জাতিসংঘকেন্দ্রিক কূটনীতির মতো একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু রয়েছে। বিশেষ করে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন অত্যন্ত সংবেদনশীল পর্যায়ে রয়েছে।
এমন প্রেক্ষাপটে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দুই প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতি সরকারের কূটনৈতিক কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত ও সক্রিয় করার একটি উদ্যোগ হিসেবেই দেখা হচ্ছে। তবে এই ব্যবস্থার কার্যকারিতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে দায়িত্বের সুস্পষ্ট বণ্টন, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মধ্যে সমন্বয় এবং একক পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবায়নের ওপর।




