logo

একনজরে বাংলাদেশের ‘নির্বাচন ও নেতৃত্বের ইতিহাস’

একনজরে বাংলাদেশের ‘নির্বাচন ও নেতৃত্বের ইতিহাস’

ছাত্রদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর প্রায় ১৮ মাস পর বাংলাদেশ আবার জাতীয় নির্বাচনের পথে এগোচ্ছে। ২০২৪ সালে আন্দোলন দমনে সহিংসতার অভিযোগের পর তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন।

সে ঘটনার পর এই প্রথম বৃহস্পতিবার ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

এই নির্বাচনে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭০ লাখেরও বেশি। একে চলতি বছরের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক আয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হলেও এরই সঙ্গে সম্ভাব্য অস্থিরতা নিয়ে উদ্বেগও আছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশি এবার প্রথমবারের মতো ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। দেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এই উদ্যোগ তাৎপর্যপূর্ণ।

বর্তমানে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের নির্বাচন ইতিহাস বরাবরই তীব্র রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নির্বাচন বর্জন এবং কারচুপির অভিযোগে আলোচিত। দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনীতিতে প্রধান দুই শক্তি হিসেবে সক্রিয় ছিল আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

২০২৪ সালের আন্দোলন দমনে সহিংসতার অভিযোগে শেখ হাসিনা ও তার দলের অনেক নেতা বিচার প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন। এ প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগকে রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা হয়। শেখ হাসিনাকে অনুপস্থিত অবস্থায় মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হলেও তিনি বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন এবং ভারত সরকার তাকে প্রত্যর্পণে সম্মত হয়নি।

সংবিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশে একক কক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা বর্তমান। জাতীয় সংসদের মোট ৩৫০ আসনের বিপক্ষে এবারের নির্বাচনে ১ হাজার ৯৮১ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী দুটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। সাধারণত প্রতি পাঁচ বছর পরপর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ১১টি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে, যদিও মাঝেমধ্যে সামরিক শাসনের সময়ও ছিল বাংলাদেশে।

নিচে বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

১৯৭০ সালে স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের নির্বাচন
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়লাভ করে। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি জাতীয় পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও তাকে সরকার গঠন করতে দেওয়া হয়নি। এর ফলে রাজনৈতিক সংকট তীব্র হয় এবং ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়। ৯ মাসের যুদ্ধে ব্যাপক প্রাণহানি ও মানবিক বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে।

১৯৭৩ সালে স্বাধীনতার পর প্রথম নির্বাচন
স্বাধীনতার পর অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বড় জয় পায়। তবে বিরোধী দলগুলো কারচুপি ও দমন-পীড়নের অভিযোগ তোলে। পরবর্তীতে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা চালু হয়।

১৯৭৫ থেকে ১৯৮৬, সামরিক শাসনের অস্থির সময়
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হন। এরপর একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় রাজনীতি পুনরায় চালু করেন এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের উদ্যোগ নেন।

১৯৭৯ সালে বহুদলীয় নির্বাচন
এই নির্বাচনে বিএনপি প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসে। তবে আওয়ামী লীগ ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

১৯৮৬ ও ১৯৮৮ সালে বিতর্কিত নির্বাচন
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো বিরোধী দলের বর্জন ও কারচুপির অভিযোগে বিতর্কিত হয়। এর বিরুদ্ধে দেশজুড়ে গণআন্দোলন গড়ে ওঠে।

১৯৯১ সালের গ্রহণযোগ্য নির্বাচন
গণআন্দোলনের মুখে এরশাদ সরকারের পতনের পর নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন।

১৯৯৬ সালের নির্বাচন
এ সময় শেখ হাসিনার প্রথম ক্ষমতায় আসা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আন্দোলনের পর নতুন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।

২০০১ সালে বিএনপির প্রত্যাবর্তন
বিএনপি আবার ক্ষমতায় আসে। নির্বাচনের পর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতার অভিযোগ ওঠে।

২০০৬ থেকে ২০০৮ সাল
এ সময়টি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সময়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে বিরোধের জেরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। জরুরি অবস্থা জারি হয় এবং সেনা সমর্থিত সরকার দায়িত্ব নেয়।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের বড় জয়
উচ্চ ভোটার উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট বিপুল জয় পায়। শেখ হাসিনা পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হন।

২০১৪ সালে বিরোধী দলের বর্জন
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পর বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। আওয়ামী লীগ একতরফাভাবে ক্ষমতায় থাকে। নির্বাচন দেশ ও বিদেশে ব্যাপক সমালোচিত হয়।

২০১৮ সালে একতরফা আধিপত্য
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সংসদের প্রায় সব আসনে জয় পায়। ব্যাপক কারচুপি ও বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়নের অভিযোগ ওঠে।

২০২৪ সাল শেখ হাসিনার পতনকাল
বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে। আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে। পরে কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের নেতৃত্বে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয়। সহিংস দমন অভিযানে অন্তত ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। এর পরই শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছাড়েন। ৮ আগস্ট মুহাম্মদ ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন।

বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক ইতিহাস সংকট, সংঘাত এবং পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছে। সামরিক শাসন, একদলীয় প্রবণতা ও বিতর্কিত নির্বাচন বারবার গণতন্ত্রকে বাধাগ্রস্ত করেছে। তবে একই সঙ্গে জনগণের আন্দোলন ও সক্রিয় অংশগ্রহণ রাজনীতিকে নতুন পথে ফেরানোর সুযোগ তৈরি করেছে। আসন্ন নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ। এই নির্বাচন কতটা শান্তিপূর্ণ, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা।