রাশিয়ায় ফ্রি সিমে স্বস্তিতে ইয়ুথ ফেস্টিভ্যালের অতিথিরা

ট্যুরিস্ট ভিসায় রাশিয়ায় ভ্রমণ করা পর্যটকদের জন্য দেশটির কোনো মোবাইল অপারেটরের সিম কিনতে পারা সোনার হরিণ পাওয়ার চেয়েও কম নয়। নিজ দেশ থেকে আন্তর্জাতিক রোমিং সুবিধা চালু করে রাশিয়ায় ব্যবহারেরও সুযোগ নেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নিষেধাজ্ঞার কারণে। সিম পেলেও ভিপিএনের (ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক) মতো বাড়তি ঝামেলা পোহানো ছাড়া ব্যবহার করা যায় না ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস অ্যাপ, টেলিগ্রামের মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্ম।
এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণকারীদের জন্য দুর্বিষহ হয়ে ওঠে রাশিয়া সফর। তবে ‘ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভ্যাল অব ইয়ুথ-২০২৬’-এ অংশ নেওয়া অতিথিদের জন্য বিনামূল্যে সিম দিচ্ছে আয়োজকরা। ভিপিএন বা বাড়তি কোনো জটিলতা ছাড়া সেসব সিমে ব্যবহার করা যাবে সব প্ল্যাটফর্ম। আয়োজকদের পক্ষ থেকে নেওয়া স্বস্তিদায়ক এই উদ্যোগে বেশ উৎফুল্ল ফেস্টিভ্যালের অংশগ্রহণকারীরা।
বিদেশি পর্যটকদের জন্য রাশিয়ায় টেলিযোগাযোগ সেবা পাওয়া বেশ দুরুহ। ‘বন্ধুত্বপূর্ণ’ সম্পর্ক রয়েছে, এমন কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশের মোবাইল অপারেটরের রোমিং সেবা নেই রাশিয়ায়। পশ্চিমা দেশগুলোর দেওয়া নানা নিষেধাজ্ঞার ফলে নিজ থেকে আন্তর্জাতিক রোমিং সেবা চালু করে এলেও রাশিয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করতে পারেন না কোনো বিদেশি পর্যটক।
আবার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে স্থাপিত নির্দিষ্ট এজেন্সির বুথ ছাড়া দেশটির আর কোনো স্থান থেকে সিম কিনতে পারেন না রাশিয়া ভ্রমণকারীরা। বিমানবন্দরে কিনতে পাওয়া সিম ও প্যাকেজের মূল্যও তুলনামূলক কয়েক গুণ বেশি।
অন্যদিকে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটস অ্যাপ, ইউটিউব, গুগল ম্যাপ ও ট্রান্সলেটর, উবারের মতো বহুল ব্যবহৃত এবং অতি প্রয়োজনীয় প্ল্যাটফর্মগুলো রাশিয়ায় স্থগিত রেখেছে দেশটির সরকার। ফলে কোনোমতে সিম কার্ড পাওয়া গেলেও, দৈনন্দিন যোগাযোগব্যবস্থা থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন থাকতে হয় পর্যটকদের। যদিও ভিপিএন ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যায়, তবে ভিপিএন সংযোগও নিয়মিতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

ইংরেজি দক্ষতা না থাকায় রুশ নাগরিকদের সঙ্গে যোগাযোগেও হিমশিম খেতে হয় সাধারণ পর্যটকদের। কোনো ঠিকানার দিকনির্দেশনা জানতে চাওয়া বা গণপরিবহন ব্যবহার করাও প্রায় দুঃসাধ্য রাশিয়ায়। এমন পরিস্থিতিতে ইন্টারনেট সংযোগের অনুপস্থিতি পর্যটকের সফরকে করে তুলতে পারে বিড়ম্বনাময়।
তবে ‘ইন্টারন্যাশনাল ইয়ুথ ফেস্টিভ্যাল-২০২৬’-এ আসা যুব প্রতিনিধি, বক্তা ও বিশেষজ্ঞ পেশাজীবী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য এই বিড়ম্বনা লাঘবে নজিরবিহীন এক উদ্যোগ দেওয়া হয়েছে। ফেস্টিভ্যালের স্বাগতিক শহর ইকাতেরিনবার্গের স্থানীয় সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশি অতিথিদের দেওয়া হচ্ছে ফ্রি সিমকার্ড।
‘টেলি২’ বা ‘টি২’ ব্র্যান্ডের মোবাইল অপারেটরের বিশেষ এই সিমকার্ডে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ এবং গুগলসহ সব ধরনের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যাবে কোনো বাড়তি প্রতিবন্ধকতা ও জটিলতা ছাড়াই। অর্থাৎ এই সিমের ব্যবহারকারীরা বাড়তি ভিপিএন অ্যাপের সাহায্য ছাড়াই বাধাহীনভাবে সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে পারবেন।
ফেস্টিভ্যাল ভেন্যুতে অবস্থিত টি২ বুথে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইকাতেরিনবার্গ নগর কর্তৃপক্ষের আদেশে বিদেশি অতিথিদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে এই সিম দেওয়া হচ্ছে। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত ১০ হাজার অতিথির মাঝে প্রায় ছয় হাজার অতিথি বিদেশি নাগরিক। ফলে টি২ অপারেটরের পক্ষ থেকে প্রায় ছয় হাজার ফ্রি সিম বিতরণ করা হচ্ছে। পাসপোর্টের তথ্য নথিভুক্ত করে প্রতি অতিথি নিজের জন্য একটি করে সিম পাবেন।
তবে ব্যবহারকারী তার মোবাইলের নির্দিষ্ট একটি সিম স্লটেই শুধু এটি ব্যবহার করতে পারবেন। এই সিম ব্যবহারকালে ভিপিএন ব্যবহার করা যাবে। ভিপিএন ব্যবহার করলে সিমটি অকার্যকর হয়ে যাবে। এ ছাড়া ফেস্টিভ্যাল শেষে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে সিমগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে অকার্যকর হবে।
আয়োজকদের এমন স্বস্তিদায়ক উদ্যোগে সন্তোষ প্রকাশ করছেন ফেস্টিভ্যালে আমন্ত্রিত বিদেশি অংশগ্রহণকারীরা। ফেস্টিভ্যালের সংবাদ সংগ্রহে আসা দৈনিক যুগান্তরের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান সাইফ আহমাদ বলেন, ‘রাশিয়ায় আসার পর থেকেই মোবাইল সংযোগ নিয়ে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছি। এখানকার কেউ ইংরেজি বোঝে না। ইন্টারনেট ব্যবহার করা যায় না। ফলে ট্রান্সলেটর অ্যাপ দিয়ে কাউকে কিছু বোঝাতেও পারি না। আবার ইন্টারনেট পেলেও অনেক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা যায় না। অথচ সাংবাদিক হিসেবে যোগাযোগের জন্য প্ল্যাটফর্মগুলো আমাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয়। তবে অনুষ্ঠানস্থলে আসার পর আয়োজকদের পক্ষ থেকে সিম পেলাম। এটায় সহজে সব ধরনের ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগ করা যাচ্ছে। হাজার হাজার মানুষকে এভাবে সিম দেওয়া সহজ বিষয় না। এ জন্য আয়োজক এবং টি২ ধন্যবাদ প্রাপ্য।’
বাংলাদেশ থেকে এই যুব উৎসবে অংশ নেওয়া জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সহযোগী সংগঠন জাতীয় ছাত্রশক্তির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক রেজায়ে রাব্বি জায়েদ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘সিম এখন খুবই অপরিহার্য জিনিস। দেশের বাইরে এলে মোবাইল যোগাযোগ আরও প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।’
দেশটির টেলিযোগাযোগপদ্ধতি নিয়ে জায়েদ বলেন, ‘রাশিয়ায় বিদেশি পর্যটকরা সিম কিনলেও, সেটা চালু হতে প্রায় দুই দিন লাগে। আবার বিভিন্ন পাবলিক প্লেসে ওয়াই-ফাই থাকলেও, সেটি ব্যবহারে রাশিয়ান সিম থাকা বাধ্যতামূলক। কারণ ওয়াই-ফাই ব্যবহার করতে চাইলে রাশিয়ান নম্বরে ‘ওটিপি’ (ওয়ান টাইম পাসওয়ার্ড) যাবে, সিস্টেমকে সেটি দিতে হয়। ফলে সিম ছাড়া রাশিয়ায় টেলিযোগাযোগের কোনো সুযোগ নেই। তবে আয়োজকদের পক্ষ থেকে সিম দেওয়াতে যোগাযোগ সহজ হলো। আমার কাছে বিষয়টিকে ‘লাইফ সেভিং’ (জীবন রক্ষাকারী) মনে হয়েছে।’


