
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আসলাম খান। বিভিন্ন দপ্তরে তিনি চিঠি পাঠান ভারত সরকারের নাম ব্যবহার করে। তার পাঠানো বিভিন্ন সরকারি চিঠির ওপরের অংশে লেখা থাকে ‘গভর্নমেন্ট অব দ্য পিপলস রিপাবলিক অব ইন্ডিয়া সাবকন্টিনেন্ট’।
১০টি বিভাগীয় মামলা থাকা এই কর্মকর্তা তার কর্মজীবনে বদলি হয়েছেন ৩২ বার। তবে মামলা বা বদলিতে পরোয়া নেই তার।
ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই করতে চান না আসলাম। অধীনস্থ কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বেতনের শিটেও স্বাক্ষর করেন না তিনি। ফলে ছয় মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা।
বর্তমানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কর্মসম্পাদন ব্যবস্থাপনা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিবের দায়িত্ব পালন করা ইয়াসমিন নাহার রুমা একসময় বিজয়নগরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ছিলেন। সেই সুবাদে বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি সরাসরি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি) মৌখিক অভিযোগ দেন তিনি।
ইয়াসমিন নাহার রুমা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমি আগে সেখানে ইউএনও ছিলাম। যার কারণে অনেকের সঙ্গে এখনও ভালো সম্পর্ক আছে। যেহেতু এখন কেবিনেটে আছি, ফলে তারা আমার কাছে এর একটা প্রতিকার চেয়েছে। লোকগুলোর অসহায়ত্বের কথা ভেবে একটা সমাধান হবে, এই আশায় এখানে এসেছি।’
শিক্ষার্থীপ্রতি ২০ টাকা চাঁদা দাবি
২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর বিজয়নগর উপজেলায় ২০২৪ শিক্ষাবর্ষের পাঠ্যপুস্তক বিতরণসংক্রান্ত এক সভায় অংশ নেন আসলাম খান। সেখানে তিনি মাধ্যমিক পর্যায়ের প্রত্যেক শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ২০ টাকা হারে চাঁদা দাবি করেন।
উপস্থিত প্রধান শিক্ষকরা এর প্রতিবাদ জানালে তিনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সামনেই চরম অসৌজন্যমূলক আচরণ করে সভা ত্যাগ করেন।
এক পর্যায়ে উপজেলার ২২টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধানরাও যৌথভাবে ইউএনও বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন এবং আসলাম খানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, ইউএনও তাকে দ্রুত প্রত্যাহারের সুপারিশ করে জেলা প্রশাসকের কাছে চিঠি পাঠাতে বাধ্য হন।
তারিখ হিসাব করে ঘুষ আদায় করেন এই কর্মকর্তা। এখন ২০২৬ সাল চলছে, তাই কম গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজে স্বাক্ষর নিতে হলে তাকে দিতে হবে ২৬ টাকা। বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলে ২০২৬ বা ২৬০০ টাকা।
মাদকসেবনের স্বীকারোক্তি
বিজয়নগরে আসার আগে চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে কর্মরত অবস্থায় আসলাম খানের বেশ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিনি নিজের কার্যালয়ের সামনে অর্ধনগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে ইউএনওকে উদ্দেশ করে চিৎকার ও অসংলগ্ন কথাবার্তা বলছেন।
আরেকটি ভিডিওতে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে গানের সুরে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘মা ছাড়া তো মাদক হয় না, যে ভাত খায় সে মাদকসেবন করে।’
গানের ছলে তিনি ফেনসিডিল সেবনের কথা স্বীকার করেন এবং দাবি করেন, কাউকে হত্যা করতে তার মাত্র এক সেকেন্ড সময় লাগে।
যুগ্ম সচিবকে গালমন্দ
বান্দরবানের থানচিতে কর্মরত অবস্থায় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে একটি অনলাইন প্রশিক্ষণে অংশ নেন আসলাম খান। সেখানে ভিডিও চালু রাখতে বলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব নূর-ই-আলমকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন। পরে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয়।
‘শাস্তিই আমার পরম বন্ধু’
নিজের এই দীর্ঘ ‘আমলনামা’ নিয়ে কোনো অনুশোচনা নেই আসলাম খানের। সংবাদমাধ্যমকে নিজেই জানিয়েছেন, কর্মজীবনে ৩২ বার বদলি এবং ৮ থেকে ১০ বার বিভাগীয় মামলার মুখোমুখি হয়েছেন।
তার ভাষায়, ‘এখন এসবই আমার পরম বন্ধু। শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে থানচিতেও পাঠানো হয়েছিল।’
নারী কর্মকর্তাকে গালমন্দ
নানা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি মাসের প্রথম দিকে আসলাম খানকে মাউশিতে ডাকা হয়। সেখানে তিনি সংশ্লিষ্ট নারী কর্মকর্তাকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ শুরু করেন। থামাতে গেলে আরও কয়েকজন কর্মকর্তাকে হুমকি দেন এবং মারতে উদ্যত হন।
পুলিশে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলেও মানবিক বিবেচনায় ভুক্তভোগী কর্মকর্তারা শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে আসেন।
মাউশির সহকারী পরিচালক কামরুন্নাহার রীমা এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তিনি কক্ষে ঢুকে আমাকে গালমন্দ করতে থাকেন। দেখেই মনে হচ্ছিল তিনি স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। তার কথাবার্তা অসংলগ্ন এবং আচরণ অস্বাভাবিক ছিল।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. শাহজাহান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘তাকে যেখানে বদলি করা হয়, সেখানেই এ ধরনের কাণ্ড করেন। তাকে নিয়ে কী করব বুঝে উঠতে পারছি না। মন্ত্রণালয়ে আরও অনেক আগেই তার ব্যাপারে জানিয়েছি। দেখি তারা কী ব্যবস্থা নেয়।’
মাউশিকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
বিষয়গুলো নজরে আসার পর আসলাম খানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাউশিকে নির্দেশ দেন শিক্ষামন্ত্রী। এরপর তার বিরুদ্ধে আসা সব অভিযোগ নিয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) ফের শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে মাউশি।
চিঠিতে তার বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে আসলাম খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে ফোনে পাওয়া যায়নি।






