দ্বিতীয় যমুনা সেতু প্রকল্প শুরু, সম্ভাব্য ব্যয় ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা
• সেতুর সম্ভাব্য দৈর্ঘ ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার
• শুরু হয়েছে ফিজিবিলিটি স্টাডি
• প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুযায়ি ২০৩১ সালের মধ্যে শেষ করার পরিকল্পনা
• বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারকে অগ্রাধিকার

বৃহত্তর রংপুরসহ উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নে দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। যমুনা সেতু নির্মাণ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে এরই মধ্যে শুরু হয়েছে সেতু নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই।
এর আগেই দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের জন্য একটি সম্ভাব্য রূপরেখা বা প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করেছে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ)। দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাবনা সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে বিবিএ।
পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো প্রাথমিক প্রস্তাবনা অনুযায়ী, যমুনা নদীর ওপর দ্বিতীয় যমুনা সেতুর দৈর্ঘ হবে সাড়ে ৬ কিলোমিটার, আর এই সেতু নির্মাণে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এ টাকার প্রস্তাব করা হলেও চলমান ফিজিবিলিটি স্টাডি শেষে ব্যয় চূড়ান্ত করা হবে। প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, এর বাস্তবায়ন মেয়াদ ধরা হয়েছে ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় অগ্রাধিকারভিত্তিক সমন্বিত লজিস্টিকস প্রকল্পের পাইপলাইন তালিকায় ৫৯টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে মাল্টিমোডাল লজিস্টিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের চলমান ও প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পগুলো অন্তর্ভুক্তির সুপারিশ করা হয়েছে।
বিবিএর তথ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবিত ৫৬টি লজিস্টিকস উন্নয়ন প্রকল্পের মধ্যে ছয়টি বর্তমানে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় চলমান রয়েছে। এ ছাড়া আটটি প্রকল্প পরিকল্পনা কমিশনের ‘সবুজ পাতায়’ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে সাতটি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজ সমাপ্ত হয়েছে এবং বিবিএ মাস্টারপ্ল্যান-২০৫০-এর আওতায় বাকি ৩৮টি প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সবুজ পাতায় অন্তর্ভুক্ত আটটি প্রকল্পের মধ্যে শীর্ষ অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প হলো ‘২য় যমুনা সেতু নির্মাণ প্রকল্প’। দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ একটি অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নের জন্য ফিজিবিলিটি স্টাডি বা সম্ভাব্যতা যাচাই বর্তমানে চলমান রয়েছে। সম্ভাব্যতা যাচাই শেষে সেতুর আয়তন ও প্রকল্পের ব্যয় চূড়ান্ত করা হবে।
প্রকল্পের সুবিধা হিসেবে বলা হয়েছে, ১৯৯৮ সালে চালু হওয়া বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুটি (প্রথম যমুনা সেতু) ইতোমধ্যে তার সর্বোচ্চ ধারণক্ষমতার (স্যাচুরেশন ক্যাপাসিটি) কাছাকাছি পরিচালিত হচ্ছে। ফলে স্বাভাবিক সময় ছাড়াও ঈদযাত্রা কিংবা ছুটির দিনগুলোতে যমুনা সেতুর দুই পাড়ে তীব্র যানজট ও দীর্ঘ বিলম্বের সৃষ্টি হয়, যা যাত্রীদের চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের প্রস্তাবিত দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মিত হলে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ কমার পাশাপাশি বছরের পর বছর ধরে চলা দীর্ঘস্থায়ী যানজট দূর হবে।
কৌশলগত দিক থেকে বিচার করলে, ঢাকার সঙ্গে সমগ্র উত্তরাঞ্চলের (রাজশাহী ও রংপুর বিভাগ) যোগাযোগের জন্য একটিমাত্র সেতুর ওপর নির্ভর করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণ হলে এটি বিকল্প হিসেবে কাজ করবে এবং প্রথম সেতুতে কোনো মেরামত বা জরুরি প্রয়োজনে নিরবচ্ছিন্ন পণ্য ও যাত্রী পরিবহন নিশ্চিত করবে। এ ছাড়া উত্তরাঞ্চল বাংলাদেশের মূল খাদ্যভান্ডার (চাল, শাকসবজি, ফলমূল ও দুগ্ধজাত পণ্য)। দ্বিতীয় যমুনা সেতুর মাধ্যমে দ্রুত ও বিলম্বহীন পারাপার-ব্যবস্থার ফলে পচনশীল কৃষিপণ্যের পরিবহন অপচয় ও ফ্রেইট খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
এদিকে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে দেওয়া অঙ্গীকারের ধারাবাহিকতায় এ মেগা প্রকল্পকে শীর্ষ অগ্রাধিকার দিয়ে দ্রুত বাস্তবায়নের প্রশাসনিক তৎপরতা জোরদার করা হয়েছে। কেবল দ্বিতীয় যমুনা সেতুই নয়, একই সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সুবিধার্থে দ্বিতীয় পদ্মা সেতু এবং কৃষি ও পরিবেশ রক্ষায় পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের প্রয়োজনীয় কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার কঠোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গত ৩ নভেম্বর বাংলাদেশ সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে আয়োজিত এক বিশেষ পর্যালোচনা বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করেন এবং প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরুর নির্দেশনা প্রদান করেন।
বৈঠক শেষে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাংবাদিকদের জানান, তিনটি মেগা প্রকল্পই বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। দ্বিতীয় যমুনা সেতু প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারেই দ্বিতীয় যমুনা সেতু নির্মাণের সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি ছিল। বৃহত্তর রংপুরকে যুক্ত করে দ্বিতীয় যমুনা সেতু বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে এবং এ বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রকল্পের কার্যক্রম শুরুর জন্য সরকার ও সংশ্লিষ্ট বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।


