এমপি নজরুলের বাসায় মিলল কয়েকটি চিঠি

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামের বাসা থেকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় উদ্ধার হওয়া কয়েকটি চিঠিতে উঠে এসেছে দাম্পত্য ও সম্পর্কের নানা টানাপোড়েনের কথা। এসব চিঠিতে ভালোবাসা, বিশ্বাসভঙ্গ, প্রতারণার অভিযোগ এবং মানসিক কষ্টের পাশাপাশি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসার দৃঢ়তার কথাও লিখেছেন মরিয়ম।
একটি চিঠিতে লেখ ছিল, ‘আমি অতি বিশ্বাস করে যুদ্ধে নেমেছিলাম তার সাথে, কিন্তু জিততে পারিনি হেরে গেলাম ময়দানে। জিতবোই বা কেমনে যুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে দেখি তুমিই তো ছিলে বিপক্ষ দলের সেনাপতি।’
আরেকটি পাতায় সম্পর্কের জটিলতা ও নিজের অবস্থান তুলে ধরে লেখা হয়েছে, ‘সে ছিল অন্য নারীর স্বামী- কাগজে কলমে অধিকার ছিল তার বউ-এর। আর আমি ছিলাম বোকা...!!! অন্য কারো স্বামীকে বানিয়েছিলাম নিজের শখের পুরুষ...!!! কাউকে অর্ধেক পাওয়ার চেয়ে হারিয়ে ফেলা বেশি সম্মানের কারণ... ভালোবাসা কখনোই ভাগ করে নেওয়ার বিষয় নয়... ভালোবাসা হয় সম্পূর্ণ, না হয় অপূর্ণ!’
অন্য একটি চিঠিতে বিশ্বাস করে প্রতারিত হওয়ার অনুভূতি প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে লেখা ছিল, ‘সে বলেছিল- আজ থেকে আমরা বন্ধু--চলো একটা গেমস খেলি। আমিও সরল মনে বিশ্বাস করে রাজি হয়েছিলাম। কিন্তু কে জানতো— আমিই ছিলাম তোমার গেমসের দাবার এক গুটি।’
জাতীয় সংসদের প্যাডে লেখা আরেকটি পাতায়ও ক্ষোভ ও পরিণতির কথা উঠে এসেছে। সেখানে লেখা, ‘আমি হেরেছি--- তুমি জিতেছো-- কারণ, আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম বলেই তো ঠকিয়ে জিততে পেরেছো।’
আরেকটি লেখা ছিল, ‘আমি, শৃঙ্গের শেষ বাড়িয়ে ও হাসতে হাসতে মুখে হাসি রেখেছি-- দেখে নাও এই হাসির কারণই হবে তোমার ধ্বংসের কারণ।’
চিঠিগুলোর বিভিন্ন অংশে আবেগ, সম্পর্ক নিয়ে হতাশা এবং বিশ্বাসভঙ্গের অনুভূতির প্রকাশ ছিল। একই সঙ্গে কোথাও কোথাও নিজেকে পরিস্থিতির শিকার বা ‘দাবার গুটি’ হিসেবে দেখার কথাও উঠে এসেছে।

তবে চিঠিগুলো এমপি গাজী নজরুলের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের কি না তা নিশ্চিত করেনি পুলিশ।
এ বিষয়ে তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ফজলুল করিম গণমাধ্যমকে বলেন, প্রাথমিকভাবে পুলিশ ধারণা করছে, চিরকুটটি মরিয়মের হতে পারে। তবে লেখাটি মরিয়মের কি না, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের ফরেনসিক প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত করে বলা যাবে।
এ দিকে, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনকে আত্মহত্যার প্ররোচনার ঘটনায় তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহ। এমপি, তার স্ত্রী ও বাদীর শ্যালক সেই গাড়িচালক ওবায়দুর রহমানকে এতে আসামি করা হয়েছে। ওই মামলায় এমপি গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা বেগমকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
মামলার এজহারেও চিঠির বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়, শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশের সহায়তায় ও উপস্থিত লোকজনের মাধ্যমে দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে মরিয়মকে ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। এ সময় মরিয়মের বিছানার ওপর থেকে একটি ‘সুইসাইড নোট’ উদ্ধার করে পুলিশ।
এর আগে রোববার রাতে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানাধীন ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের তৃতীয় তলায় ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে। তখন বাসায় থাকা নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। একই সময়ে নিহত মরিয়মের বাবাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি মামলা করার পর এমপি ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখায় পুলিশ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনয়নে সাতক্ষীরা-৪ আসন থেকে গাজী নজরুল ইসলাম তৃতীয়বারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। চলতি বছরে তার ব্যক্তিগত মুহূর্তের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে এক তরুণীর সঙ্গে তাকে দেখা যায়। পরে গাজী নজরুল ইসলাম জানান, ওই তরুণী তার দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুন।
এরপর গত ২২ জুলাই জামায়াতে ইসলামী গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করে। দলটির পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য স্পিকার ও নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে চিঠি দেওয়া হয়। যদিও তার সংসদ সদস্য পদ এখনও বহাল আছে।

