গাড়িচাপায় শ্রমিকের মৃত্যু: কী লেখা আছে আপসনামায়

রাজধানীর বারিধারার ডিপ্লোমেটির জোনে ফুটপাতে উঠে পড়া গাড়ির চাপায় নির্মাণশ্রমিক মেহেদী নিহত হওয়ার ঘটনায় ৯ লাখ টাকায় আপস করা হয়েছে গ্রেপ্তার সেই কিশোরের পরিবারের সঙ্গে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৮-এর বিচারক মো. আব্দুল মোক্তাদিরের আদালতে হাজির করা হয়। আদালত হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার কিশোর আজান শরীফকে (১৭) গাজীপুরের কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন।
এ বিষয়ে আসামিপক্ষের আইনজীবী আলমগীর হোসেন বলেন, ‘দুই পক্ষের মধ্যে ৯ লাখ টাকায় আপস হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে টাকা দেওয়া হয়ে গেছে। আসামিরা জামিন বা খালাস পেলে কোনো আপত্তি নেই বাদীর।’
একটি জীবনের মূল্য ৯ লাখ টাকা প্রশ্নে আইনজীবী বলেন, ‘নিহত পথচারী প্রতিবন্ধী ছিলেন। বাদীরা মনে করেছেন আপোস করবেন তারা এ আপসে খুশি।’
মামলার পরবর্তী শুনানি ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-৫ এ হবে বলে জানান আইনজীবী।
তবে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গণমাধ্যমকে বলছেন, এ মামলা আপসযোগ্য নয়। আর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, বাদী ও আসামিপক্ষের আপসের ওই সিদ্ধান্ত তাদের তদন্তে কোনো প্রভাব ফেলবে না।
কী লেখা হয়েছে আপসনামায়
আপসনামায় গাড়ির মালিককে বলা হয়েছে ‘প্রথম পক্ষ’। আর মামলার বাদীকে বলা হয়েছে ‘দ্বিতীয় পক্ষ’। তাতে লেখা হয়েছে, গত ২২ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার দিকে গুলশান থানার বারিধারা ডিপ্লোম্যাটিক এলাকার ১ নম্বর সড়কে প্রথম পক্ষের একটি প্রাইভেট কার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সড়কের পাশের ফুটপাতে উঠে গেলে সেখানে বসে থাকা দ্বিতীয় পক্ষের ছোট ভাই মেহেদী হাসান মিম গাড়ির ধাক্কায় গুরুতর আহত হন এবং পরে মারা যান।
‘দুর্ঘটনার সময় প্রথম পক্ষের গাড়িচালক আকাশ মারক গাড়িটি চালাচ্ছিলেন এবং প্রথম পক্ষের আপন ছোট ভাই গাড়িতে ছিলেন। আকস্মিক দুর্ঘটনায় ভুক্তভোগী দ্বিতীয় পক্ষ গুলশান থানায় একটি মামলা দায়ের করেন।’
আপসনামায় বলা হয়, ‘অনাকাঙ্ক্ষিত এ দুর্ঘটনায় প্রাণহানির পর প্রথম পক্ষ ও তার পরিবার ভুক্তভোগী দ্বিতীয় পক্ষের পরিবারের পাশে দাঁড়ায়, সহমর্মিতা প্রকাশ করে এবং সার্বিক সহযোগীর হাত বাড়িয়ে দেয়।
‘প্রকৃতপক্ষে পক্ষদ্বয়ের মাঝে কোনো পূর্ব শত্রুতা, এমকি পূর্ব পরিচয়ও ছিল না। সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি ছিল নিছকই অনিচ্ছাকৃত একটি দুর্ঘটনা, যা মোটেই ইচ্ছাকৃত নয়। দুর্ঘটনায় দ্বিতীয় পক্ষের অপূরণীয় ক্ষতির পাশাপাশি প্রথম পক্ষের গাড়ি চালক এবং ছোট ভাইও আহত হন। এমনকি গাড়িটিও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
‘তথাপি দ্বিতীয় পক্ষের অসহায় পরিবারের বিষয়ে অবগত হয়ে প্রথম পক্ষ মানবিকভাবে তাদের পাশে দাড়াতে উদ্যোগী হন। একইভাবে প্রথম পক্ষের মানবিক উদ্যোগে দ্বিতীয় পক্ষ অভিভূত হন।’
আরও বলা হয়, ‘যেহেতু পক্ষদ্বয়ের মাঝে পূর্ব শত্রুতা ছিল না এবং ঘটনাটি সম্পূর্ণ অনিচ্ছাকৃত একটি দুর্ঘটনা, তাই সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় উভয় পক্ষের ভবিষ্যৎ মঙ্গল কামনায় গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং নিকট আত্মীয়দের মধ্যস্ততায় আটটি সিদ্ধান্তের আলোকে উভয় পক্ষের মধ্যে বিরোধ নিষ্পত্তি ও আপস-মীমাংসা করা হল।’
‘মেহেদী হাসান মিমের দাফন-কাফনসহ ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা সারতে প্রথম পক্ষ সহায়তা হিসেবে তাৎক্ষণিক নগদ এক লাখ টাকা দেয়। এ ছাড়া দ্বিতীয় পক্ষের বৃদ্ধ পিতা-মাতার ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে আরও নগদ ৮ লাখ টাকা দেওয়া হয়।’
‘দ্বিতীয় পক্ষের নিকট আত্মীয়-স্বজন এবং সাক্ষীদের উপস্থিতিতে প্রথম পক্ষ ৯ টাকা দেয়।’
‘অঙ্গীকার অনুযায়ী দ্বিতীয় পক্ষ দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারে কার্যকর ব্যবস্থা নেবে। মামলা প্রত্যাহারের লক্ষ্যে ১৭ বছরের ওই কিশোর ও গাড়ি চালক আকাশ মারকের জামিনে অনাপত্তি তথা সুপারিশ জানাতে দ্বিতীয় পক্ষ আদালতে উপস্থিত থাকবে।’
‘মামলা প্রত্যাহারের যাবতীয় ব্যয়ভার প্রথম পক্ষ বহন করবে, কিন্তু দ্বিতীয় পক্ষ সার্বিক সহায়তা করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী হাজির থাকিবে।’
‘প্রথম পক্ষ দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত তার গাড়ি মেরামত কিংবা আহত গাড়ি চালক ও ভাইয়ের চিকিৎসা বাবদ দ্বিতীয় পক্ষের কাছে কোনো ক্ষতিপূরণ দাবি করবে না।’
‘প্রথম পক্ষের ওই ড্রাইভারের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় পক্ষ আর কোনো অভিযোগ-আপত্তি রাখতে পারবে না এবং ভবিষ্যতে এই বিষয় নিয়ে কোনো আদালত কিংবা সালিশে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করলে তা সর্বতভাবে অগ্রাহ্য হবে।’
‘এর বাইরে তাদের মধ্যে কোনো আর্থিক লেনদেন কিংবা লেনদেনের অঙ্গীকার অবশিষ্ট থাকল না। উভয় পক্ষ একে অপরের ভুল ত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে পরস্পরের শুভাকাঙ্খী হিসেবে বসবাস করবে। কেউ কারো ক্ষতি সাধনের চিন্তা কিংবা হয়রানি করবে না। উভয় পক্ষ সর্বদা উভয়ের মঙ্গল কামনা করিবে।’
‘কোনো পক্ষ এই চুক্তিনামার কোনো শর্ত লঙ্ঘন করলে তা অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গ ও প্রতারণা বলে গণ্য হবে।’
আপসের বিষয়ে প্রশ্ন করলে মেহেদীর ভাই মামলার বাদী মোক্তাদির ইসলাম বলেন, ‘মামলার বিষয়ে আপস হয়েছে। কত টাকায় আপোস হয়েছে জানি না। আমার মামা জানেন।’
এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) আরেফীন ইসলাম বলেছেন, ‘আপসের বিষয়টি তার জানা নেই।’ তদন্তে এর প্রভাবে পড়বে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না, আমরা আমাদের মত তদন্ত করে যাব।’
এ ধরনের মামলায় আপসরফার সুযোগ আছে কি না, জানতে চাইলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন-অর-রশীদ বলেন, ‘সড়ক পরিবহন আইনে দায়ের করা মামলা আপসযোগ্য না। বাদী বা আসামিপক্ষের মধ্যে আপস হলে আদালত সেটা গ্রহণ করতে বাধ্য না। মানুষ মারা যায়, সেই মামলায় আপস হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।’
মেহেদী হাসানের মৃত্যুর মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সিসিটিভ ভিডিওতে দেখা গেছে ওই কিশোর গাড়িতে ছিল। জানা যাচ্ছে, সে গাড়ি চালাচ্ছিল। অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোর গাড়ি নিয়ে বের হয়ে একটা প্রাণ কেড়ে নিল। মামলার তদন্ত হবে। যারা জড়িত তারা আইনের আওতায় আসবে।’

