আরাভ খানের মতোই বেনজীরের প্রত্যর্পণপ্রক্রিয়া, আইনি হাতিয়ার করদাতার পুরস্কার

দুর্নীতি মামলার আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে নিয়ে দুবাইয়ের আইনিপ্রক্রিয়ায় প্রধান শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়েছে তার সেরা করদাতার পুরস্কার।
জানা গেছে, সরকার তার বিরুদ্ধে যেসব দুর্নীতির অভিযোগ এনেছে, অধিকাংশ সম্পদের কর তিনি পরিশোধ করেছেন বলে দাবি করেন তার আইনজীবী। সেই করদাতার পুরস্কারই এখন হাতিয়ার হিসেবে আইনি লড়াইয়ে ব্যবহার করা হবে।
এ ছাড়া তার কাছে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের পরিচয় বহন করে, এমন কোনো আইডেন্টি বা পাসপোর্ট নেই। ফলে বেনজীর আহমদের প্রত্যর্পণপ্রক্রিয়ার বিষয়টি আরাভ খানের মতোই কয়েক দিন বেশ আলোচনা ও দৌড়ঝাঁপের পর থেমে যেতে পারে।
বাংলাদেশে পুলিশ পরিদর্শক হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত আরাভ খান এখনও ইন্টারপোলের তালিকাভুক্ত আসামি। তিনি দুবাইয়ে অবস্থান করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিয়মিত সরব রয়েছেন। তবু বাংলাদেশ সরকার গত প্রায় তিন বছরেও তাকে ফেরত আনতে পারেনি।
বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করার সঙ্গে সঙ্গে তাকে দেশে ফিরিয়ে এনে আইনের আওতায় আনতে আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুবাইয়ের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে (এনসিবি) দৌড়ঝাঁপ শুরু করছে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দল। তাদের সঙ্গে আছেন সেখানে অবস্থানরত দূতাবাসের কর্মকর্তারা।
তবে বেনজীরকে ফেরত আনতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)সহ একাধিক অভিযোগের আদলে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তর প্রত্যর্পণপ্রক্রিয়ার একটি চিঠি পাঠিয়েছে। সেই চিঠির কপি এই প্রতিবেদকের পক্ষে সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি।
তবে ২০২৩ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) তৎকালীন মতিঝিল বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবির সহকারী মহাপরিদর্শকের মাধ্যমে পুলিশ হত্যা মামলার অভিযুক্ত আসামি আরাভ খানকে ফেরত আনার জন্য যে ইংরেজি আবেদনপত্রটি পাঠিয়েছিল, তা এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে। এই আবেদনটি ইংরেজির পাশাপাশি আরবি ভাষায় অনুবাদ করে দুবাইয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছিল।
এ বিষয়ে একসময় পুলিশ সদর দপ্তরের এনসিবিতে কর্মরত এক এআইজি এশিয়া পোস্টকে বলেন, দুবাই সরকারের প্রচলিত আইন অনুযায়ী বেনজীর আহমেদের প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তদন্তাধীন মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত প্রতিবেদন বা অভিযোগপত্রের অনুলিপি এবং যদি অভিযুক্ত ব্যক্তি ইতোমধ্যে দণ্ডিত হয়ে থাকেন, তাহলে আদালতের রায়, দণ্ডাদেশের সত্যায়িত অনুলিপি, আরোপিত শাস্তির বিবরণ এবং রায় কার্যকরযোগ্য হওয়ার প্রমাণপত্র সংযুক্ত করতে হবে। কিন্তু বেনজীর আহমেদের অধিকাংশ বিষয় এখনও প্রমাণিত নয়।
বাংলাদেশে এখনও যিনি অভিযুক্ত নন, তাকে দুবাই আদালতে কীভাবে অভিযুক্ত করা হবে, এমন প্রশ্ন রেখে ওই কর্মকর্তা বলেন, বেনজীর আহমেদ ও আরাভ খানকে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ একই ধরনের। দুজনই বাংলাদেশের পরিচয় বহন করেন না কিন্তু তারা বাংলাদেশের নাগরিক। বরং বহুল আলোচিত পুলিশ পরিদর্শক হত্যা মামলায় দোষী সাব্যস্ত আরাভ খানকে এখনও দেশে ফিরিয়ে আনতে পারেনি কেউ। এর কারণ তিনি দুবাইয়ে বাংলাদেশের পরিচয়ে থাকেন না এবং দুবাইয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগও ছিল না বলে জানান তিনি।
আরাভ খানের নথিতে যা ছিল
২০২৩ সালে আরাভ খানকে ফেরত আনার আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছিল আসামির সাত কপি ছবি, ২৪ পৃষ্ঠার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার অনুলিপি, এফআইআরের কপি, জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, ভারতীয় পাসপোর্টের অনুলিপি এবং পরিচয় শনাক্তে সহায়ক অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নথি। পাশাপাশি আদালতের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, তদন্তে পাওয়া তথ্য এবং আসামিকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের মুখোমুখি করার প্রয়োজনীয়তা বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছিল।
বিদেশ থেকে পলাতক আসামিকে গ্রেপ্তার বিষয় উল্লেখ করে সেই চিঠিতে বলা হয়েছিল, ‘পুলিশ পরিদর্শক হত্যা মামলাটি সেই সময় (২০১৮) অন্যতম চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলায় পরিণত হয়েছিল। অপরাধীদের শনাক্ত করার জন্য বাংলাদেশ পুলিশের বিভিন্ন সংস্থা তাদের প্রাথমিক ও গোপন তদন্ত শুরু করে। অন্যান্য তদন্তকারী সংস্থার মতো ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখাও এই মামলার তদন্তে তাদের গোপন তদন্ত শুরু করে।’
‘তদন্ত চলাকালে ডিবির খিলগাঁও জোনাল টিম জানতে পারে, স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন পুলিশ পরিদর্শক ২০১৮ সালের ৯ জুলাই নিখোঁজ রয়েছেন। এই ব্যাপারে পুলিশ পরিদর্শকের পরিবার সবুজবাগ থানায় একটি নিখোঁজ ডায়েরি (সাধারণ ডায়েরি নম্বর-৩৬৯) করে। যেহেতু তিনি স্পেশাল ব্রাঞ্চের একজন কর্মকর্তা ছিলেন, তাই বাংলাদেশ পুলিশ স্পেশাল ব্রাঞ্চ ও ডিবির সহযোগিতায় এই বিষয়ে তদন্ত শুরু করে।’
‘প্রযুক্তির সাহায্যে ডিবির খিলগাঁও জোনাল টিম রহমত উল্লাহ নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে। অভিযুক্ত ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করে ডিবি জানতে পারে, পুলিশ পরিদর্শক আরাভ খানের পলাতক কয়েকজন বন্ধুর সহায়তায় বনানীতে খুন হয়েছেন। এরপর বনানী থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়।’
‘পরে আপন ওরফে রবিউল ওরফে আরাভ খানের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা শাখা অভিযোগপত্র দাখিল করে। এর মধ্যে তিনি দীর্ঘ সময়ের জন্য পলাতক হয়ে যান। পরে ওই পুলিশ পরিদর্শক হত্যা মামলায় বাংলাদেশের আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন।’
‘উল্লেখ্য, গোয়েন্দা শাখা এই মামলায় ৯ জন খুনির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। এই মামলা ছাড়াও আরাভ খানের বিরুদ্ধে আরও আটটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এ কারণেই আমরা তাকে যথাযথ বিচার নিশ্চিত করার জন্য আদালতে হাজির করতে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনতে চাই।’
এদিকে বেনজীর আহমেদের আইনজীবী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পক্ষে দুবাই আদালতে করা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে বেনজীর আহমেদকে রক্ষা করতে তাকে দেওয়া রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘দীর্ঘমেয়াদি সেরা করদাতা’ পুরস্কারের কাগজপত্র জমা দিয়ে আইনি লড়াই করবেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে তার আইনজীবী এশিয়া পোস্টকে বলেন, বেনজীর আহমেদ চাকরিজীবনের শুরু (কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থাকা অবস্থায়) থেকে টানা ২৮ বছর ধরে নিয়মিত কর প্রদান করেন। এ জন্য ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর ময়মনসিংহ কর অঞ্চলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়। এই করের কাগজপত্র দুবাই আদালতে দাখিল করা হবে। তখন জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন মামলা, মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচার মামলা, অবৈধ ভূমি দখল ও ক্ষমতার অপব্যবহারজনিত দুর্নীতি মামলার কোনো ভিত্তি থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, তার বিরুদ্ধে যে মামলাগুলো আছে, সেগুলোয়, তিনি পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে কোন প্রেক্ষাপটে কী ভূমিকা রেখেছেন, সে বিষয় অবশ্যই দুবাই আদালত বিবেচনা করবেন। সেখানকার আদালতে এসব নথিপত্র ও প্রমাণ দেখেই বিচার হবে বলে দাবি করেন এই আইনজীবী।



