আন্তর্জাতিক নারী দিবস: উদযাপন ও বাস্তবতার ফারাক

দেশে সম্প্রতি নারী ও শিশু ধর্ষণ এবং যৌন হয়রানির ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে। গণপরিবহন, স্কুল-কলেজ ও কর্মস্থলে নারীরা প্রায়ই হয়রানির শিকার হচ্ছেন। শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার ঘটনাও সামনে আসছে। এ পরিস্থিতির মধ্যেই রাজধানীসহ সারা দেশে পালিত হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। সভা, সেমিনার ও মানববন্ধনের মাধ্যমে নারীর অধিকার ও নিরাপত্তার দাবি তুলে ধরা হয়েছে।
১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেন থেকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন শুরু হয়। তখন নারীদের সমান অধিকার, কাজের মর্যাদা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের দাবি ওঠে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ দিনটি বিশ্বব্যাপী পালনের উদ্যোগ নেয়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারী দিবস উদযাপনের ধরন বদলেছে। প্রতি বছর এই দিবসে বিভিন্ন আয়োজনে নারীদের সাফল্য উপস্থাপন করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তাদের সাফল্য নিয়ে আলোচনা হয়।
তবে এ আনন্দের আড়ালে নারীরা এখনও অনেকটাই অবহেলিত ও হয়রানির শিকার। প্রতিবছর প্রকাশিত মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা যায়— বাংলাদেশে ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের বৈষম্য এখনও অব্যাহত।
সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরামের সভাপতি প্রকৌশলী শম্পা বসু বলেন, নারী দিবস এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। নারী দিবস শুরুর অর্ধশতাব্দী পার হলেও দেশে কন্যাশিশু ও নারীর ওপর ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা অব্যাহত। এসব ঘটনার অনেকগুলোরই বিচার হচ্ছে না। আইন থাকলেও তার প্রয়োগ খুব একটা দেখা যায় না।
তিনি বলেন, এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন যেখানে নারীরা মর্যাদা পাবে এবং সমঅধিকার ভোগ করবে। একই সঙ্গে এমন রাষ্ট্রব্যবস্থা দরকার যেখানে নারী কর্মক্ষেত্রে কিংবা ঘরে-বাইরে কোথাও নিপীড়নের শিকার হবে না এবং তার শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত হবে।
নারী অধিকার নিয়ে বাংলাদেশে অনেক সংগঠন কাজ করছে। তবে অধিকাংশ কর্মসূচি শহরকেন্দ্রিক। ফলে শহরের শিক্ষিত ও সচেতন নারীরা অধিকার সম্পর্কে জানলেও প্রান্তিক বা গ্রাম পর্যায়ের নারীরা অংশগ্রহণ করতে পারেন না। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনি ইশতেহারে নারীর ক্ষমতায়নের প্রতিশ্রুতি দিলেও তৃণমূল পর্যায়ে বাস্তবায়ন তেমন চোখে পড়ে না।
এ বিষয়ে বগুড়া জেলা বাসদ সদস্য সচিব ও নারী অধিকার কর্মী দিলরুবা নূরী এশিয়া পোস্টকে বলেন, সারা দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণ, হত্যাকাণ্ড এবং নারীর নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে সবাই উদ্বিগ্ন।
তিনি উল্লেখ করেন, নারীর অধিকার আদায়ের লড়াই চালিয়ে যেতে হলে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য নারীর প্রতি ভোগ্য মনোভাব দূর করা, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা, জটিলতা কমানো, বিচারহীনতার সংস্কৃতি ভেঙে অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এবং গণসচেতনতা ও গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা জরুরি।
তবে প্রতিকূলতার মাঝেও বাংলাদেশের নারীরা থেমে নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখন ছেলেদের প্রায় সমান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও করপোরেট খাতে নারী নেতৃত্বের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়। তবে সামাজিক কিছু দৃষ্টিভঙ্গি তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কর্মস্থলে নারীর পোশাক নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য তাদের অস্বস্তিতে ফেলে। পরিবারের প্রত্যাশা ও পেশা নির্বাচনের টানাপোড়েনে অনেক মেধাবী নারীকে মাঝপথেই থমকে যেতে হয়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ হাসিবউদ্দীন হোসেন বলেন, সামাজিকভাবে নারীরা নানা বাধার সম্মুখীন হন। সমাজে নারীদের ওপর যে চাপ রয়েছে, তা থেকে মুক্ত করতে রাষ্ট্রের পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি নারীদের শিক্ষাক্ষেত্রে সহশিক্ষার বিষয়টি শুরু থেকেই গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করা উচিত।
নারী দিবস আনুষ্ঠানিকতায় না থাকুক। হোক আত্মোপলব্ধি ও পরিবর্তনের অঙ্গীকার। নারী ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হলে কেবল প্রচার নয়, বরং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন জরুরি। কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমানো এবং সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। শুধু নারী দিবসের বক্তৃতা নয়, সমতার সংস্কৃতি বছরের প্রতিটি দিন বজায় রাখা প্রয়োজন।