logo

অজিত দোভালের গোপন ঢাকা সফরের দাবি, সময় নিয়ে যত প্রশ্ন

অজিত দোভালের গোপন ঢাকা সফরের দাবি, সময় নিয়ে যত প্রশ্ন
ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল। ছবি: এএনআই

ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল ১৭ সেপ্টেম্বর গোপনে ঢাকায় এসেছিলেন, গত দুই সপ্তাহ ধরে ভারতীয় গণমাধ্যমে এমন প্রতিবেদন প্রকাশিত হচ্ছে। সময় গড়ানোর সঙ্গে এসব প্রতিবেদনে উড়োজাহাজ, বিমানঘাঁটি, অবস্থানের সময় এবং বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের মতো নানা তথ্য যুক্ত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) ডেইলি ওয়াদা এ সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দোভালের কথিত গোপন ঢাকা সফর নিয়ে ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে একের পর এক নতুন তথ্য সামনে এলেও সেগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের সরকারি নথিভুক্ত সময়সূচির বড় ধরনের অসঙ্গতির বিষয় উল্লেখ করা হয়।

ডেইলি ওয়াদার প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান বাংলাদেশেই ছিলেন না। তিনি আগের দিন চার দিনের সরকারি সফরে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন এবং ২০ সেপ্টেম্বর রাতে দেশে ফেরেন।

‘দ্য কাশ্মীর টাইমস’-এর ১ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে দোভালকে বহনকারী একটি গালফস্ট্রিম উড়োজাহাজ তেজগাঁও বিমানঘাঁটিতে গোপনে অবতরণ করে। উড়োজাহাজটি যাতে প্রকাশ্যে শনাক্ত না হয়, সে জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোভাল প্রায় ১৮ ঘণ্টা ঢাকায় অবস্থান করেন। এ সময় তিনি ওয়াকার-উজ-জামান ও কায়সার রশীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কায়সার রশীদকে নভেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় একটি দক্ষিণ এশীয় গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা বৈঠকে আমন্ত্রণ জানানোর কথাও বলা হয়েছে।

তবে ওই উড়োজাহাজের যাত্রার নথি, বৈঠকের কোনো ছবি কিংবা অন্য কোনো প্রামাণ্য দলিল প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হয়নি।

এর আগে ১৯ সেপ্টেম্বর ‘রেডিফ’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৭ সেপ্টেম্বর দোভাল ঢাকায় ছিলেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফরের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দোভাল ঢাকায় এসেছিলেন।

তবে ওই প্রতিবেদনে তার যাতায়াতের পথ, কোথায় অবতরণ করেছিলেন কিংবা বাংলাদেশের কোন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন এসব বিষয়ে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি।

বাংলাদেশের আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) তথ্য অনুযায়ী, ১৬ সেপ্টেম্বর সকালে জাপানের উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান।

বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে তিনি এশিয়ান গেমসে অংশ নিতে জাপান সফর করেন। সেখানে বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনের পাশাপাশি তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

১৯ সেপ্টেম্বর এশিয়ান গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেও অংশ নেন তিনি। বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদদের বিভিন্ন প্রতিযোগিতা দেখার পাশাপাশি অলিম্পিক কাউন্সিল অব এশিয়ার সভাপতি শেখ জোয়ান বিন হামাদ আল থানির সঙ্গেও বৈঠক করেন।

আইএসপিআর জানিয়েছে, ২০ সেপ্টেম্বর রাতে বাংলাদেশে ফেরেন সেনাপ্রধান।

অর্থাৎ, বাংলাদেশের সরকারি তথ্য অনুযায়ী ১৭ সেপ্টেম্বর ওয়াকার-উজ-জামান জাপানে অবস্থান করছিলেন। ফলে ওই দিন ঢাকায় এসে দোভালের সঙ্গে তার বৈঠকের দাবি নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।

দোভালের কথিত বৈঠকের দ্বিতীয় বাংলাদেশি কর্মকর্তা কায়সার রশীদ চৌধুরীর অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ডেইলি ওয়াদা কয়েকটি সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, ১৭ সেপ্টেম্বর ডিজিএফআইপ্রধানও বাংলাদেশের বাইরে একটি উপসাগরীয় দেশে ছিলেন। তবে তার ওই দিনের আনুষ্ঠানিক ভ্রমণ নথি যাচাই করা হয়নি।

ফলে কায়সার রশীদ ওই দিন দেশের বাইরে ছিলেন এটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তবে দাবি সত্য হলে, ভারতীয় প্রতিবেদনে দোভালের সঙ্গে বৈঠকের কথা বলা দুই বাংলাদেশি কর্মকর্তার কেউই ১৭ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ছিলেন না।

ঢাকার পক্ষ থেকে সফরের তথ্য নেই

দোভালের কথিত সফর নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও কোনো নিশ্চিত তথ্য দেওয়া হয়নি।

২৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদুর রহমান বলেন, দোভালের বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে সরকারের কাছে কোনো তথ্য নেই।

তিনি বলেন, দোভাল বাংলাদেশে এলে সরকার অবশ্যই বিষয়টি জানত এবং সেটি সরকারি সফর হতো।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যকে তিনি অনুমান ও গুঞ্জন হিসেবেও উল্লেখ করেন।

ভারতের পক্ষ থেকেও সফরটি নিশ্চিত করা হয়নি। ৩০ সেপ্টেম্বর ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দিনেশ ত্রিবেদীকে দোভালের কথিত সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো নিশ্চিত তথ্য দেননি।

দুই দেশের নিরাপত্তা যোগাযোগ রয়েছে

দোভালের কথিত সফরের বিষয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও বাংলাদেশ ও ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের বিষয়টি বাস্তব।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান এবং শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থানের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান, সীমান্ত ইস্যু এবং রাজনৈতিক আস্থার সংকট দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করেছে।

তবে নিরাপত্তা পর্যায়ে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

ফেব্রুয়ারিতে ডিজিএফআইপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়ার পর কায়সার রশীদ চৌধুরী নয়াদিল্লি সফর করেন। সে সময় ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে তার সঙ্গে দোভালের বৈঠকের কথা বলা হয়েছিল। ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধানের সঙ্গেও তার বৈঠকের খবর প্রকাশিত হয়।

এরপর গত আগস্টে ‘র’-এর প্রধান ঢাকায় সফর করেন।

এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য নয়াদিল্লি সফর নিয়েও আলোচনা রয়েছে। তবে এ সফরের কোনো তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।

১৭ সেপ্টেম্বর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানান তারেক রহমান। পরে একই দিনে সেই শুভেচ্ছার জবাব দেন মোদি।

ভারতীয় কিছু প্রতিবেদনে এই প্রকাশ্য শুভেচ্ছা বিনিময়কেও দোভালের কথিত ঢাকা সফরের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। তবে এটি প্রতিবেদকের বিশ্লেষণ, কোনো সরকারি তথ্য নয়।

গোয়েন্দা মামলায় নতুন প্রশ্ন

দোভালের কথিত সফরের আলোচনার মধ্যেই ১ অক্টোবর ভারতীয় নাগরিক রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ।

পশ্চিমবঙ্গের ৪৪ বছর বয়সী রবিউলের বিরুদ্ধে সরকারি গোপনীয়তা আইনে মামলাটি করেন গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক মেজবা উদ্দিন। তার বিরুদ্ধে বিদেশি একটি গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং সংবেদনশীল তথ্য পাচারের চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে।

পরে ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতউল্লাহ তাকে সাত দিনের রিমান্ডে পাঠান। তদন্তকারীরা ১০ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন।

তদন্তকারীদের তথ্য অনুযায়ী, ২২ সেপ্টেম্বর সন্দেহজনক চলাফেরার অভিযোগে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় রবিউলকে প্রথমে আটক করা হয়। এর আগে ১৪ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে তিনি বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, গত ১০ থেকে ১২ বছরে রবিউল বিভিন্ন সময়ে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে এসেছেন এবং ব্যবসাকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে গুপ্তচরবৃত্তিতে যুক্ত ছিলেন।

গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা ও সংরক্ষিত এলাকার ছবি, সরকারি নথি এবং সংবেদনশীল তথ্য বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন বলেও পুলিশের অভিযোগ।

তবে রবিউল ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ব্যবসার কাজে তিনি নিয়মিত বাংলাদেশে যাতায়াত করতেন।

রবিউলের মামলার সঙ্গে দোভালের কথিত সফরের কোনো সরাসরি যোগসূত্র এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে বিষয়টি একই সময়ের নিরাপত্তা ঘটনাপ্রবাহের অংশ হিসেবে আলোচনায় এসেছে।

সব মিলিয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর দোভালের কথিত ঢাকা সফর নিয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভারতীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে গোপন উড়োজাহাজ অবতরণ, ১৮ ঘণ্টা অবস্থান এবং বাংলাদেশের শীর্ষ সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের দাবি করা হলেও এসবের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রামাণ্য নথি নেই।