দস্যুদের ভয়ে সুন্দরবনে যেতে চান না মৌয়ালরা

একদিন পরই এপ্রিল থেকে শুরু হচ্ছে সুন্দরবনের মধু সংগ্রহের মৌসুম। প্রতি বছর মৌসুম এলেই দলবেঁধে সুন্দরবনে যান মৌয়ালরা। তবে সম্প্রতি সুন্দরবনে দাপিয়ে বেড়ানো ২০ দস্যুবাহিনীর ভয়ে সন্ত্রস্ত মৌয়ালরা এবার বনে যেতে অনীহা প্রকাশ করছেন। এ অবস্থার মধ্যে আগামীকাল মঙ্গলবার (৩১ মার্চ) সুন্দরবনে মৌয়ালদের প্রবেশের অনুষ্ঠান করছে সরকার। বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ড. ফরিদুল ইসলাম এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করবেন।
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১ এপ্রিল থেকে সুন্দরবনে মধু আহরণের অনুমতি দেওয়া হবে, যা চলবে টানা দুই মাস। এ বছর খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জে ১ হাজার ৮০০ কুইন্টাল মধু এবং ৯০০ কুইন্টাল মোম আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
কয়েক বছরের পরিসংখ্যানে মধু আহরণে ওঠা-নামা দেখা গেছে। বন বিভাগের তথ্যমতে, ২০২১ সালে ৪ হাজার ৪৬৩ কুইন্টাল মধু সংগ্রহ করা হয়েছিল। ২০২২ ও ২০২৩ সালে তা কমে যথাক্রমে ৩ হাজার ৮ ও ২ হাজার ৮২৫ কুইন্টালে নেমে আসে। ২০২৪ সালে কিছুটা বেড়ে ৩ হাজার ১৮৩ কুইন্টাল হলেও ২০২৫ সালে তা আবার কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৬ কুইন্টালে।
মৌয়ালদের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমছে। ২০২৪ সালে প্রায় ৮ হাজার মৌয়াল বনে গেলেও ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৫ হাজারে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দস্যু-আতঙ্ক না কাটলে এবার এ সংখ্যা আরও কমবে। সেই সঙ্গে ডাকাত নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তারা। এ অবস্থার মধ্যে মঙ্গলবার মৌয়ালদের অনুমতিপত্র (পাস) দেওয়ার অনুষ্ঠান হবে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী ড. ফরিদুল ইসলাম।
সাতক্ষীরার শ্যামনগর এলাকার জুলফিকার আলী ছোটবেলা থেকে জঙ্গলে যান। কখনো বাঘ-কুমিরের ভয় পাননি, কিন্তু এখন দস্যুদের ভয় পাচ্ছেন। জঙ্গল এখন ডাকাতে ভর্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘একবার ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই। তাই ভয়ে এবার মধু কাটা বাদ দিয়ে দিনমজুরি করব।’
একই গ্রামের নেসার আলী গাজী বলেন, ‘আগের তুলনায় এবার অনেক কম মৌয়াল বনে যাবেন। গতবার আমরা একটি নৌকায় ৭ জন মৌয়াল ছিলাম। এবারও সেভাবেই যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু যেভাবে ডাকাতের কথা শুনছি, তাতে আর যাওয়া হবে না।’
২০১৮ সালের নভেম্বরে তৎকালীন সরকার সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করে। সে সময় ৩২টি বাহিনীর ৩২৮ জন দস্যু ৪৬২টি অস্ত্র ও বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেছিলেন। কয়েক বছর জেলেরা নির্বিঘ্নে মাছ ধরলেও ২০২৪ সালের শেষভাগ এবং ২০২৫ সালের শুরু থেকে সুন্দরবনের শান্ত পরিবেশ আবারও বিষিয়ে উঠতে শুরু করে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ১৫ জেলে অপহরণের ঘটনায় পুরোনো দস্যুদের নতুন উত্থানের খবর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
আত্মসমর্পণ করা বাহিনীগুলোর মধ্যে ১৪টি পুনরায় সংগঠিত হয়ে আবারও দস্যুতায় নামে। এর মধ্যে বাগেরহাটের শরণখোলা, চাদপাই, দুবলারচর এলাকা সবচেয়ে আতঙ্কের স্থান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্যমতে, সুন্দরবনের বিভিন্ন অঞ্চলজুড়ে ছোট-বড় ২০টি গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে। তবে আলোচনায় রয়েছে ৬টি গ্রুপ। এর মধ্যে জাহাঙ্গীর (বড় জাহাঙ্গীর), সুমন বাহিনী, দুলাভাই বাহিনী, শরীফ এবং করিম বাহিনী সবচেয়ে বেপরোয়া।
জেলেদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১২ থেকে ১৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে অন্তত ৪৬ জেলেকে অপহরণ করা হয়। দস্যুরা জনপ্রতি ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ দাবি করেছিল। এর মধ্যে গত ১২ ফেব্রুয়ারি রাতে বনদস্যু করিম শরীফ বাহিনী পূর্ব সুন্দরবনের শেলার চর শুঁটকিপল্লিতে হানা দিয়ে একটি ট্রলারসহ ৬ জেলেকে অপহরণ করে। এরপর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি রাতে বনদস্যু জাহাঙ্গীর ও সুমন বাহিনী বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার সময় ২০টি ট্রলার থেকে আরও ২০ জেলেকে অপহরণ করে।
এর আগে গত ২২ জানুয়ারি পশ্চিম সুন্দরবনের বিভিন্ন নদী ও খাল থেকে ১৯ জেলেকে অপহরণ করা হয়। মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা জেলেদের মধ্যে সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার হরিণনগর গ্রামের আবু তাহের বলেন, সুন্দরবনের নদ-নদীতে মাছ ধরার সময় ৮-১০ সদস্যের একটি বনদস্যু দল নিজেদের ‘ডন বাহিনী’ পরিচয় দিয়ে জেলেদের নৌকায় তুলে নিয়ে যায়। পরে মাথাপিছু ২৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা করে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
গত ৬ মার্চ রাতে শরণখোলা রেঞ্জের শেলা ও আড়ুয়াগাঙ এলাকা থেকে তিন জেলেকে অপহরণ করে করিম শরীফ বাহিনী। অপহৃত জেলেদের মধ্যে রায়হান ও সুমনের নাম জানা গেছে।
শরণখোলার ইদ্রিস হাওলাদার, বাগেরহাটের রামপালের খোকন, খুলনার দাকোপের সেলিম গাজীসহ কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। তাদের কেউই এ বছর এখনও বনে প্রবেশ করেননি। না যাওয়ার কারণ হিসেবে তারা প্রায় সবাই একই কথা বলেন। তাদের ভাষ্য, অনেক বছর ধরে শান্তিতে বনে গিয়েছি, মাছ ধরছি। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ধীরে ধীরে বনের মধ্যে পুরোনো দস্যুরা ফিরে আসতে শুরু করে। প্রথমদিকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে জনপ্রতি ১০ হাজার ২০০ টাকা করে দেওয়া লাগত। এক ধাক্কায় তা ২০ হাজার ৪০০ টাকায় গিয়ে দাঁড়াল। এই বছরের শুরু থেকে ৫০ হাজার টাকার নিচে কাউকে ছাড়ে না। আমরা বনে গিয়ে ৫০ হাজার টাকা ইনকামও করতে পারি না। কীভাবে এই টাকা দেব।
২০১৮ সালে দস্যুবাহিনীগুলোর আত্মসমর্পণে ভূমিকা রাখেন গণমাধ্যমকর্মী মোহসীন-উল হাকিম। তিনি বলেন ‘বনদস্যুদের আগের পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, একদমই হয়নি। আগে র্যাব-৮ এবং র্যাব-৬ সুন্দরবনে দুস্যতা নির্মূলে নিবিড়ভাবে কাজ করত। এ ক্ষেত্রে তাদের গোয়েন্দা সহায়তা দেওয়া হতো ঢাকা র্যাবের হেড কোয়ার্টার থেকে। ওই জায়গায় বড় একটা গ্যাপ তৈরি হয়েছে। র্যাবের নিষ্ক্রিয়তায় কোস্টগার্ড যে অভিযান চালাচ্ছে, তা দিয়ে কাভার হয়নি। দস্যুদের ওপর চাপ তৈরির যে বিষয়টি আমাদের দেখানো হচ্ছে, এর সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই।’
মোহসীন-উল হাকিম বলেন, ‘এ অভিযানে গোয়েন্দা তথ্যের ব্যাপক ঘাটতি আছে বলে মনে করা হয়। তারা চেষ্টা করছেন, যাতে চেষ্টাটা ফলপ্রসূ হয়। এখন দুটি কাজ করতে হবে, হয় তীব্র অভিযান চালিয়ে তাদের লক করতে হবে। অন্যথায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে।’
এদিকে সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে অভিযান শুরু করেছে যৌথবাহিনী। তবে চলমান এ অভিযানে এখন পর্যন্ত সুন্দরবন থেকে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর সদস্য আফজাল সরদারকে আটক করতে পেরেছে যৌথবাহিনী। ৩ মার্চ সকালে সুন্দরবন সংলগ্ন নারায়ণপুর এলাকায় একটি বিশেষ যৌথ অভিযান চালিয়ে তাকে আটক করা হয়।
পরের দিন দুপুরের দিকে আফজাল সরদারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মোংলার পাশাখালী ফরেস্ট অফিস সংলগ্ন এলাকায় তল্লাশি চালিয়ে একটি শটগান, একটি একনলা বন্দুক, ২১টি কার্তুজ এবং একটি ওয়াকিটকি সেট উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কোস্টগার্ড পশ্চিম জোন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এসব তথ্য জানায়।
এ ছাড়া সুন্দরবনে ‘ছোট সুমন’ বাহিনীর একটি আস্তানা ধ্বংস করে গুরুত্বপূর্ণ মালামাল জব্দ করেছে বাংলাদেশ কোস্টগার্ড। আজ সোমবার (৩০ মার্চ) সকালে কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।
তিনি জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে জানা যায়, ছোট সুমন বাহিনীর সদস্যরা বাগেরহাটের মোংলা থানার সীমান্ত খাল সংলগ্ন এলাকায় অবস্থান করছেন। এ তথ্যের ভিত্তিতে সোমবার ভোর ৬টার দিকে কোস্টগার্ড বেইস মোংলা ও স্টেশন হারবারিয়া যৌথভাবে একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানের একপর্যায়ে বাহিনীর একটি আস্তানা শনাক্ত করে তা সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয়। এ সময় ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত একটি ওয়াকিটকি এবং রান্নার কাজে ব্যবহৃত নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীসহ বিভিন্ন আনুষঙ্গিক মালামাল জব্দ করা হয়।
তবে অভিযান চলাকালে কোস্টগার্ডের উপস্থিতি টের পেয়ে ছোট সুমন বাহিনীর সদস্যরা সুন্দরবনের গভীরে পালিয়ে যাওয়ায় কাউকে আটক করা সম্ভব হয়নি।
এর আগে ১৭ মার্চ সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ বনদস্যু ‘নানাভাই’ বাহিনীর হাতে জিম্মি থাকা ছয় জেলেকে উদ্ধার করে কোস্টগার্ড। ৭ মার্চ মাছও কাঁকড়া ধরতে সুন্দরবনে গেলে ওই জেলেদের অপহরণ করেন নানাভাই বাহিনীর সদস্যরা। পরে তাদের জিম্মি রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়।