logo
Advertisement

ছয় মাসে ৪৩ শিশু বলাৎকারের শিকার, সর্বোচ্চ রাজশাহী বিভাগে

হাসান আলী ও মেশকাত মিশু
ছয় মাসে ৪৩ শিশু বলাৎকারের শিকার, সর্বোচ্চ রাজশাহী বিভাগে
প্রতীকী ছবি

সারা দেশে গত ছয় মাসে বলাৎকারের শিকার হয়েছে অন্তত ৪৩ শিশু। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে রাজশাহী বিভাগে, যেখানে নয় শিশু এই নৃশংসতার শিকার হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যমে উঠে আসা তথ্যে শিশু বলাৎকারের এ চিত্র দেখা গেছে।

৪৩টি ঘটনার মধ্যে ২৬টি ঘটেছে বিভিন্ন মাদ্রাসায়। অভিযুক্তদের মধ্যে ২৬ জন মাদ্রাসা শিক্ষক বা মসজিদের ইমাম। অর্থাৎ মোট ঘটনার ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত ব্যক্তি ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে এই ২৬টি ঘটনায় ভুক্তভোগীদের বয়স ৩ বছর থেকে ১৫ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে পরিবারের সদস্য বা নিকট আত্মীয়ের হাতে ঘটেছে পাঁচটি ঘটনা। বাকি ১২টি ঘটনায় অভিযুক্ত ছিলেন অপরিচিত ব্যক্তি।

বনশ্রীর মাদ্রাসায় আত্মহত্যা

রাজধানীর বনশ্রীর ‘আলোকিত কুরআন ইন্টারন্যাশনাল হিফজ মাদরাসা’য় বলাৎকারের শিকার হয় ১০ বছরের শিশু আব্দুল্লাহ। হাফেজ বানানোর স্বপ্ন নিয়ে পরিবার তাকে ওই মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিল। বলাৎকারের পর লজ্জায় গলায় গামছা পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে সে। মাদ্রাসার বাথরুম থেকে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে সুরতহালে পায়ুপথে আঘাত ও জখমের চিহ্ন পাওয়া যায়।

বিভাগভিত্তিক চিত্র

রাজশাহী বিভাগে সর্বোচ্চ নয়জন শিশু বলাৎকারের শিকার হয়েছে। জয়পুরহাট, নাটোর, নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও রাজশাহী সদরে এসব ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘটনা ঘটেছে ঢাকা বিভাগে আটটি। ঢাকা জেলায় সর্বোচ্চ, এরপর নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও গোপালগঞ্জে। চট্টগ্রাম বিভাগে ৬টি ঘটনা ঘটেছে। খুলনা, রংপুর ও বরিশাল বিভাগে পাঁচটি করে, ময়মনসিংহে তিনটি এবং সিলেট বিভাগে দুইটি। জেলাভিত্তিক তালিকায় শীর্ষে রয়েছে ঢাকা, কুড়িগ্রাম, কুমিল্লা, নাটোর ও রাজশাহী সদর।

বিভাগভিত্তিক চিত্র। ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস
বিভাগভিত্তিক চিত্র। ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

বলাৎকারের ঘটনাগুলোর মধ্যে ছয়টিতে কোনো মামলা হয়নি। আর সবকটি ঘটনা মিলিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন মাত্র ২৯ জন। আবার অনেক সময় অপরাধীরা গ্রেপ্তার হলেও শেষ পর্যন্ত আইনের ফাঁকফোকরে বেরিয়ে যায়।

যা বলছেন বিশেষজ্ঞ

বলাৎকারের সামাজিক ও মানসিক প্রভাব নিয়ে এশিয়া পোস্টের সঙ্গে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে মাদ্রাসা বা বিভিন্ন স্থানে শিশুদের ওপর যে বলাৎকার বা ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তা অত্যন্ত গর্হিত ও জঘন্য। মা-বাবা অনেক বিশ্বাস ও নিরাপদ পরিবেশের আশায় সন্তানকে মাদ্রাসা বা হোস্টেলে পাঠান। কিন্তু সেখানে এ ধরনের ঘটনা সেই বিশ্বাসের মূলে আঘাত করে। যারা এই কাজ করে তারা মানসিকভাবে অসুস্থ ও বিকৃত রুচির অধিকারী।’

শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘বলাৎকারের শিকার হয়ে অনেক শিশু শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। ক্ষেত্রবিশেষে মারাও যাচ্ছে। মানসিকভাবে এই শিশুরা চরম ট্রমার মধ্য দিয়ে যায়। তাদের আত্মবিশ্বাস পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায় এবং অন্য মানুষের ওপর থেকে বিশ্বাস উঠে যায়। কাউকে দেখলেই তাদের মনে ভীতি তৈরি হয়, সে বুঝি তাকে আবারও আপত্তিকরভাবে স্পর্শ করবে। এভাবে একটি শিশু সুস্থ মানসিকতা নিয়ে বড় হতে পারে না।’

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সম্পর্কে অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল বলেন, ‘এই তিক্ত অভিজ্ঞতা শিশুদের মনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। ভবিষ্যতে বড় হয়ে ওই শিশু নিজেও এ ধরনের বিকৃত আচরণ শিখতে পারে এবং অন্যকে নির্যাতন করতে পারে। এ ছাড়া শৈশবের এই শারীরিক নির্যাতনের স্মৃতি তাকে পরবর্তী জীবনে বিয়ে করতে বা স্বাভাবিক শারীরিক সম্পর্কে আগ্রহী হতে বাধা দিতে পারে। যা তার জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিশুদের স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশের স্বার্থে এই অপরাধ থামানো অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য দেশে সঠিক ও কঠোর আইন বাস্তবায়ন করতে হবে। পাশাপাশি বাবা-মাকে অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। যে কোনো প্রতিষ্ঠানে সন্তানকে ভর্তি করলেই হবে না বা যে কারও কাছে পড়তে দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যাবে না। সন্তানদের নিরাপত্তার বিষয়ে সবসময় সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, লোকলজ্জা ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে বলাৎকারের বহু ঘটনা এখনও প্রকাশ পায় না। ফলে এ ঘটনার ঘটনায় প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা অনেক বেশি হতে পারে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবে এমন অপরাধ ক্রমাগত বাড়ছে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে এসব ঘটনা ধামাচাপা দিতে হত্যাকাণ্ডও ঘটানো হয়।