আট হাসপাতাল ঘোরা সেই দুলালী মারা গেছেন

রাজধানীর সরকারি ও বেসরকারি আটটি হাসপাতাল ঘুরেও বাঁচানো গেল না মানসিক ভারসাম্যহীন নারী দুলালীকে। রোববার (৩১ মে) সকাল সাড়ে ৭টার সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
গত ২২ মে রাজধানীর মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকা থেকে ওই নারীকে উদ্ধার করেন মুসা করিম রিপন নামে এক যুবক। পরে দুজন নারীর সহযোগিতায় আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে প্রথমে শ্যামলীর মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে নেওয়া হয়। আইনগত অভিভাবক ও জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় সেখানে তাকে ভর্তি করানো যায়নি। সেখান থেকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। এরপর নেওয়া হয় ফার্মগেটের মডার্ন সাইকিয়াট্রিক হাসপাতালে, এক্সিম ব্যাংক হাসপাতাল, মোহাম্মদপুরের নিরাময় ক্লিনিকে এবং ধানমন্ডির সুপারম্যাক্স হসপাতালে। সব জায়গা থেকেই নানা অজুহাতে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
নিরুপায় হয়ে দুলালীকে জেনেটিক প্লাজার পাশের রাস্তায় রেখে যান রিপন। এভাবে কয়েক দিন যাওয়ার পর উপায় না পেয়ে গুলশানে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে যান তিনি। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দারের নজরে আসে। তার হস্তক্ষেপে ২৯ মে সম্পূর্ণ সরকারি ব্যবস্থাপনায় দুলালীকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। অবস্থা খারাপ হলে ওইদিন রাতেই তাকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানেই আজ সকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
মুসা করিম রিপন বলেন, সাত দিন দুলালী চিকিৎসা ছাড়া ছিল, এটা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন না? একটা মানুষ পাগল হলেও তার চিকিৎসা পাওয়ার কি অধিকার নেই? এনআইডি বা লিগ্যাল গার্ডিয়ান না থাকলে চিকিৎসা পাবে না?
তিনি আরও বলেন, কয়েকটি থানায় গিয়ে জিডিও করতে পারলাম না। ওই নারীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে আমি পদে পদে হয়রানির শিকার হয়েছি।
মুসা করিম রিপন বলেন, একজন দুলালীকে বাঁচাতে না পারলেও ভবিষ্যতে এমন অসহায় মানুষের পাশে থাকব। সমাজে দুলালীদের মতো অবহেলিতদের চিকিৎসা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তার এই সংগ্রাম অব্যাহত থাকবে।
সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক অধ্যাপক ডা. রেহান উদ্দিন খান বলেন, মানসিক হাসপাতাল থেকে আনার পর দুলালীর সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। হাসপাতাল থেকে সব ধরনের সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও তাকে বাঁচানো যায়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, সব ধরনের চেষ্টা করেও দুলালীকে বাঁচানো যায়নি। তবে, ওই নারীকে আরও আগে চিকিৎসার আওতায় আনতে পারলে ভালো হতো। ভবিষ্যতে এ ধরনের অসহায় মানসিক ভারসাম্যহীন রোগীদের চিকিৎসার ব্যাপারে সরকার উদ্দ্যোগ নেবে।
তিনি আরও বলেন, পরিচয়হীন এমন ভারসাম্যহীন রোগীদের চিকিৎসার জন্য অভিভাবকের প্রয়োজন হয়, চিকিৎসার ক্ষেত্রে এটি ভালো ভূমিকা রাখে। কারণ আমরা হয়তো একটি কাঠামোর মধ্যে থেকে চিকিৎসা সেবা দেই, কিন্তু পরিবার-পরিজনের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। মুসা সাহেব আজকে দুলালীকে সাহায্য করায় অনেক কিছু সহজ হয়ে গেছে, কিন্তু অনেক সময় এ ধরনের রোগীদের ক্ষেত্রে সহায়তাকারী পাওয়া যায় না। এছাড়া আমাদের বর্তমানে যে কাঠামো আছে—সেখানে এ ধরনের রোগীকে সত্যিকার অর্থে সহায়তা করার কোনো ব্যবস্থা নেই। আমাদের যে জনবল আছে তার মাধ্যমে আমরা পরিচয়হীন রোগীদের সীমিত সামর্থ্য অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করি।
স্বাস্থ্যের ডিজি আরও বলেন, দুলালীর পরিচয় শনাক্ত করতে পিবিআই ফিঙ্গারপ্রিন্ট নিবেন এবং প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষা করবেন। পরিচয় জানার পর তার অভিভাবকের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। পরিচয় পাওয়া না গেলে তার দাফনের ব্যবস্থা করতে হবে।
