দেশের পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে বিএনপি সরকার: আনু মুহাম্মদ

বিএনপি ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিলেও বাস্তবে সরকার যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করছে বলে অভিযোগ করেছেন অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ।
শনিবার (২ মে) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এ অভিযোগ করেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর ১৪ উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির ইঙ্গিত করে আনু মুহাম্মদ বলেন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবসময় বলছেন—সবার আগে বাংলাদেশ। দেশে এসে প্রথম দিনই বলেছেন ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যে চুক্তি, সেই চুক্তিটা দেখাচ্ছে যে সরকার ‘সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র’ নীতিতে অনুযায়ী চলছে।
তিনি অভিযোগ করেন, এসব চুক্তি বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর পূর্ণাঙ্গ সম্পৃক্ততা ছিল না। এলএনজি আমদানির চুক্তির ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গেছে।
আনু মুহাম্মদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তি সইয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের পাশাপাশি উৎসাহী ছিলেন তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী।
এই বাণিজ্যচুক্তিকে ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী’ আখ্যা দিয়ে আনু মুহাম্মদ বলেন, এ চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্তের পরিবর্তে বর্তমান সরকারে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে একটি শ্বেতপত্র প্রকাশের দাবি জানান আনু মুহাম্মদ। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে নীরবতার জন্য সংসদে থাকা বর্তমান দলগুলোর সমালোচনা করেন তিনি।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারে উৎপাদন অংশীদারি চুক্তি কোম্পানির পক্ষে সংশোধন এবং উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের উদ্যোগের মতো প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা ২০০৬ সালের ফুলবাড়ী চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আইন প্রয়োগ ও গ্রেপ্তার ইস্যুতে প্রতিহিংসার আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, হাসিনা আমলে যেভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল, তার থেকে আইন-আদালত কিংবা এসব কোনো ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। পুরো সংস্কৃতির মধ্যে একই ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে যে ক্ষমতায় এলে আমরা যা খুশি করতে পারি। সরকার আইন-আদালতসহ সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করার, একটা কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে।
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত একটি বক্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে আনু মুহাম্মদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধ কোনো গালগল্পের বিষয় নয়, মুক্তিযুদ্ধ হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন। যার যে দায় ইতিহাসে, সেই দায় তাকে পূরণ করতে হবে, সেই দায় তাকে নিতে হবে; দায়মুক্তি দেওয়া যাবে না। একাত্তরের গণহত্যার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল এবং চব্বিশে যে হত্যাকাণ্ড— কেউই দায়মুক্তি পাবে না। সবাইকেই দায় নিতে হবে।
সভায় গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি ১৩ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে—জুলাই হত্যাকাণ্ড ও জুলাই পরবর্তী সহিংসতার দ্রুত বিচার, গণতান্ত্রিক সংস্কার, উপাসনালয় ও স্থাপনায় হামলা বন্ধ, নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ এবং ন্যূনতম মজুরি ঘোষণাসহ কৃষিবান্ধব নীতি গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
এ ছাড়া শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার, পার্বত্য চট্টগ্রামে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত, নারীর সমানাধিকার, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলো প্রকাশ করে জনস্বার্থবিরোধী চুক্তি বাতিলের আহ্বান জানানো হয়।
সভায় অন্যদের মধ্যে লেখক ও গবেষক আলতাফ পারভেজ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা, সহযোগী অধ্যাপক মোশাহিদা সুলতানা, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া ও মানজুর আল মতিন বক্তব্য দেন।