‘গুপ্ত’ শক্তি স্বৈরাচারকে আবার সামনে নিয়ে আসার কাজ করছে: তারেক রহমান

বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, স্বৈরাচারী শাসনের সময় দলটি ‘গুপ্ত বেশ’ ধারণ করেছিল এবং পরে তাদের নিজেদের লোকজনই বিষয়টি স্বীকার করেছেন। এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছেন।
তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, বিগত স্বৈরাচারের সময় যারা ‘গুপ্ত’ অবস্থায় লুকিয়ে ছিল, এখন তাদের মধ্যে থেকে স্বৈরাচারীরা দেশে অরাজকতা উসকে দিচ্ছে কি না। বিভ্রান্তি ছড়িয়ে কেউ অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করেছেন তিনি।
একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলকে ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, এর পেছনে কারা রয়েছে, তা জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান এ কথা বলেন।
রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে এ সভার আয়োজন করে বিএনপি। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী।
স্বৈরাচারের সময় যারা ‘গুপ্ত’ অবস্থানে ছিল, তাদের মধ্যেই এখন ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার আশ্রয় নিয়ে অরাজকতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে কি না, সেই প্রশ্ন সামনে এসেছে, এমনটা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এমনটি হলে ওই ‘গুপ্ত’ শক্তি স্বৈরাচারকে আবার সামনে নিয়ে আসার কাজ করছে।
অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না
বিএনপি চেয়ারম্যানের অভিযোগ, ‘এই ভাইস ভার্সা গুপ্ত বাহিনী ১৯৭১ সাল থেকে বিভিন্ন সময় একে অন্যকে আড়াল ও আশ্রয় দিয়ে এসেছে। ১৯৮৬ ও ১৯৯৬—গত এক যুগ এবং বর্তমান সময়েও বিভিন্নভাবে তারা একে অন্যকে আড়াল করেছে।’
দেশে বিভিন্ন সমস্যার কথা স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর আগের স্বৈরাচারী সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যাগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে। তবে এসব সমস্যাকে পুঁজি করে কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা মেনে নেওয়া হবে না।
বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার উল্লেখ করে তারে ক রহমান বলেন, গণতান্ত্রিক ধারা সমুন্নত রাখা এবং গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতা অনুসরণে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। তবে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে দেশের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘একটি নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার।’
জ্বালানি সংকট সবচেয়ে বড় সমস্যা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি সরকার একটি ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি’ উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। ভঙ্গুর অর্থনীতির পাশাপাশি স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগব্যবস্থাসহ বিভিন্ন খাতে সমস্যার বোঝা সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে সামাল দিতে হচ্ছে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবও।

প্রধানমন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ
দেশের বর্তমান সমস্যাগুলোর মধ্যে জ্বালানি সংকটকে সবচেয়ে বড় বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সংকটে দেশের বহু মানুষ ও শিল্পকারখানার মালিক কষ্টে আছেন উল্লেখ করে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
তবে অতীত সরকারের রেখে যাওয়া সমস্যাকে শুধু ‘অজুহাত’ হিসেবে দেখাতে চান না তিনি বলেন, সরকার বাস্তবতা জনগণের সামনে তুলে ধরতে চায় এবং এমন পদক্ষেপ নিতে চায়, যাতে ভবিষ্যতে মানুষ আবার একই ধরনের জ্বালানি সংকটে না পড়ে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম বাড়লেও জনগণের ওপর চাপ কম রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত জ্বালানির দাম কিছুটা বাড়াতে সরকার বাধ্য হয়েছে।
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কাজ শুরু
নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কাজ শুরু করেছেন দাবি করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে। নারীদের স্বাবলম্বী করতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, ইমাম, খতিব ও মুয়াজ্জিনসহ ধর্মীয় ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি।
তারেক রহমান বলেন, গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারের বাজেটে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কম রাখার চেষ্টা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় ৬০টি পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হয়নি; বরং কয়েকটি পণ্যের কর কমানো হয়েছে।
বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারকে ‘সুনির্দিষ্ট’ উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, অন্য রাজনৈতিক দলগুলো সেভাবে ইশতেহার দেয়নি। বরং তারা ‘গায়েবি প্রতিশ্রুতি’ দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
২৪-এর কৃতিত্ব জনগণের
২৪-এর আন্দোলনের সম্পূর্ণ কৃতিত্ব জনগণের উল্লেখ করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, বিএনপি প্রকাশ্যে রাজপথে থেকে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করেছে; কোনো কিছু গোপনে করেনি। ২০২৪ সালের আন্দোলনের সফলতার ‘সম্পূর্ণ কৃতিত্ব’ দেশের জনগণের।
গত ১৬ বছরের শাসনের সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, ওই সময়ে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। তার দাবি, দলের প্রায় ৫০ লাখের বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ‘গায়েবি মামলা’ ছিল। বিএনপির কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল এবং এখনো আছে। তবে সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে দেশের জনগণ দেখেছে, দীর্ঘদিন ধরে তাদের স্বার্থ রক্ষায় বিএনপি কাজ করেছে।
সবাইকে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী করা সম্ভব নয়
নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, শুধু দলীয় পদ-পদবি পাওয়ার জন্য নয়, দেশের জন্য কাজ করতে হবে। সবাইকে সংসদ সদস্য বা মন্ত্রী করা সম্ভব নয়; অধিকাংশ কর্মী হিসেবেই থাকবেন। তবে কাজের মাধ্যমে প্রত্যেকে নিজেকে একজন ‘সাচ্চা জাতীয়তাবাদী কর্মী’ হিসেবে প্রমাণ করতে পারেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী আবদুল মঈন খান, অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান এবং সমাজকল্যাণমন্ত্রী এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা।




