logo

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বিজেপি, কী ভাবছেন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বিজেপি, কী ভাবছেন বাংলাদেশের রাজনীতিবিদরা
ছবি : সংগৃহীত

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে নানা আলোচনা ও বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। প্রায় দেড় দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিদায় এবং প্রথমবারের মতো নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির রাজ্যে ক্ষমতায় আসার ফলে কী প্রভাব পড়তে পারে, তা নিয়ে আগ্রহ ও কৌতূহল বাড়ছে।

বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা, পুশ-ইন ও পুশ-ব্যাকের মতো দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত দ্বিপাক্ষিক ইস্যুতে পশ্চিমবঙ্গের নতুন সরকারের অবস্থান কী হবে—তা নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে বিভিন্ন মহলে।

নির্বাচনের আগে ভারতের কয়েকজন বিজেপি নেতার বাংলাদেশবিষয়ক মন্তব্য ইতোমধ্যেই ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, এসব বক্তব্য ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ককে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে ‘বাংলাদেশি’ তকমা দিয়ে ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে বলেও শঙ্কা রয়েছে।

তবে সরকারের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।

বেসরকারি ফলাফলে দেখা গেছে, বিজেপি বড় ব্যবধানে তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করেছে। এমনকি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেও বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন— যা এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনার একটি।

২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়, যার প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। এর আগেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ভারতের বিরুদ্ধে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তুলে এসেছে।

ঢাকার রাজপথে ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা ঢাকা’ স্লোগান, ভারতীয় পণ্য বয়কটের ডাক, ভিসা কার্যক্রমে স্থবিরতা, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ও কূটনৈতিক মিশনে উত্তেজনা— এসব ঘটনাই সম্পর্কের অবনতির চিত্র তুলে ধরে।

যদিও চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে সাধারণ নির্বাচনের পর সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে দুই দেশই কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়িয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফর করেছেন। একে ‘নতুন সম্পর্কের সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ থাকলেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি হয়নি মূলত পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণে। ফলে নতুন সরকার এ বিষয়ে কী অবস্থান নেয়, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ বলেছেন, নির্বাচনের আগে কিছু ভারতীয় নেতার মন্তব্য “উদ্বেগজনক” এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের বক্তব্য অব্যাহত থাকলে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিজেপির আদর্শিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না। তবে তাদের হিন্দুত্ববাদীতা, সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ভারতের রাষ্ট্র ও সরকারের সহায়তা নিয়েই তো আওয়ামী লীগ শক্তি সঞ্চয় করেছিল এবং শেখ হাসিনা তাদের প্রশ্রয়েই আছেন। বিজেপি সরকার তো তাকে সহায়তা করছে। এখন তারা আরও শেল্টার পেয়ে ষড়যন্ত্র বাড়াতে পারে।

বিএনপির সিনিয়র নেতা রুহুল কবির রিজভী তুলনামূলক সংযত প্রতিক্রিয়া দিয়ে বলেন, পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় হলেও প্রতিবেশী হিসেবে সুসম্পর্ক বজায় রাখা দুই দেশের জন্যই জরুরি। নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা মনে করি যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে মানুষ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেবে।

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এটিকে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংকটের অংশ হিসেবে দেখছেন। তিনি বলেন, সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নেবে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে যে সরকারই থাকুক না কেন, তিস্তা, সীমান্ত ও অন্যান্য অমীমাংসিত ইস্যুতে আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা