বজ্রাঘাতে এক দিনেই প্রাণ গেল ১২ জনের

সুনামগঞ্জ, রংপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, হবিগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে বজ্রপাতে ১২ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বজ্রপাতে আহত হয়েছেন অন্তত ১৯ জন।
সুনামগঞ্জে পাঁচজনের মৃত্যু
সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও দিরাই উপজেলায় বজ্রপাতে পাঁচজন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন সাতজন। শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে পৃথক স্থানে এই হতাহতের ঘটনা ঘটে।
মৃতরা হলেন, জামালগঞ্জ উপজেলার সদর ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামের আমির আলীর ছেলে নূর জামাল, ধর্মপাশা উপজেলার পাইকুরাটি ইউনিয়নের বড়ইহাটি গ্রামের ফজলুর রহমানের ছেলে হবিবুর রহমান, সরস্বতীপুর গ্রামের জয়নাল হকের ছেলে রহমত উল্লাহ, তাহিরপুর উপজেলার গাজিপুর গ্রামের আবু বক্করের ছেলে আবুল কালাম ও দিরাই উপজেলার পেরুয়া হাসনবাজ গ্রামের চান্দু মিয়ার ছেলে লিটন মিয়া।
স্থানীয়রা তাদেরকে উদ্ধার করে জামালগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক নুর জামালকে মৃত ঘোষণা করেন। তোফাজ্জল হোসেনকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।
এদিকে ধর্মপাশা উপজেলার টগার হাওরে চকিয়াচানপুর গ্রামের কাছে ধান কাটার সময় বজ্রপাতে হবিবুর রহমান নামে কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়। দুপুরে ঝড়ের সময় এই ঘটনা ঘটে।
একই উপজেলার জয়শ্রী ইউনিয়নের সরস্বতীপুর গ্রামের কাছে বজ্রপাতে ওই গ্রামের জয়নাল হক, তার ছেলে রহমত উল্লাহ এবং লাল সাধুর স্ত্রী শিখা মনি গুরুতর আহত হয়েছেন। তাদেরকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক রহমত উল্লাহকে মৃত ঘোষণা করেন। জয়নাল হক ও শিখা মনিকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে।
তাহিরপুরে মাটিয়ান হাওরে হালকা বৃষ্টি ও দমকা বাতাসের মধ্যে বজ্রপাতে আবুল কালাম মারা যান। এ সময় নুর মোহাম্মদ গুরুতর আহত হন। নুর মোহাম্মদকে প্রথমে তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তার অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
তাহিরপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ফয়েজ আহমদ নুরী জানান, নুর মোহাম্মদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে সিলেটে পাঠানো হয়েছে।
কালীয়াগোটা হাওরের একটি বিলের পাশে ধান কাটার সময় দিরাই উপজেলার পেরুয়া হাসনবাজ গ্রামের লিটন মিয়া বজ্রপাতে তিনি গুরুতর আহত হন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ডা. প্রশান্ত দাস তালুকদার লিটন মিয়ার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজন সরকার জানান, পৃথক স্থানে বজ্রপাতে পাঁচজনের মুত্যু ও সাতজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এসব ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
রংপুরে মাছ ধরা দেখার সময় দুজনের মৃত্যু
রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায় পুকুরে মাছ ধরার সময় বজ্রপাতে মিলন মিয়া নামে এক যুবক ও আবু তালেব নামে এক বৃদ্ধ মারা গেছেন।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার বড়হযরতপুর ইউনিয়নের সখীপুর গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় এক শিশুসহ অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন।
মৃতরা হলেন, উপজেলার রামেশ্বরপাড়া গ্রামের মাঝিপাড়ার গ্রামের মিলন মিয়া এবং সখীপুর গ্রামের আবু তালেব।
স্থানীয় ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, শনিবার দুপুর ১২টার দিকে সখীপুর গ্রামের একটি মৎস্য খামারে জাল দিয়ে মাছ ধরা হচ্ছিল। এ সময় জেলেরা সেখানে মাছ ধরতে নামেন এবং স্থানীয় কয়েকজন খামারের পাড়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরা দেখছিলেন। বজ্রসহ বৃষ্টি শুরু হলে সবাই ছোটাছুটি শুরু করেন।
মিঠাপুকুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. এম এ হালিম লাভলু জানান, হাসপাতালে আনার আগেই দুইজনের মৃত্যু হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। বাকিরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মিঠাপুকুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নুরুজ্জামান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। বজ্রপাতে নিহতের ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া চলছে।
নেত্রকোনায় কৃষকের মৃত্যু
নেত্রকোণার আটপাড়া উপজেলায় হাওরে গরুর জন্য ঘাস কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে আলতু মিয়া নামে এক কৃষকের মৃত্যু।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার সুখারী ইউনিয়নের হাতিয়া গ্রামের সামনের মেষির হাওড়ে এ দুর্ঘটনা ঘটে। আলতু মিয়া হাতিয়া গ্রামের মৃত লাল মিয়ার ছেলে।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, দুপুর ১টার দিকে গ্রামের সামনের মেষি হাওড়ে গরুর জন্য ঘাস কাটতে যান আলু মিয়া। এর কিছুক্ষণ পর আকাশ অন্ধকার করে বৃষ্টিসহ বজ্রপাত শুরু হয়। বজ্রপাত ও বৃষ্টি শেষে স্থানীয়রা হাওরে গিয়ে আলতু মিয়ার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে বাড়িতে নিয়ে আসেন।
আটপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জুবায়দুল আলম বলেন, ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে, মরদেহের সুরতাল প্রতিবেদন তৈরি করা হচ্ছে।
হবিগঞ্জে কৃষকের মৃত্যু
হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলায় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে সুনাম উদ্দিন নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে।
শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরে উপজেলার বড় ভাকৈর (পূর্ব) ইউনিয়নের বিবিয়ানা নদীর তীরবর্তী মমিনা হাওড়ে এ ঘটনা ঘটে।
মৃত সুনাম উদ্দিন ওই ইউনিয়নের রামপুর গ্রামের মৃত সুন্দর আলী সাহেবের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সকালে সুনাম উদ্দিন মমিনা হাওরে ধান কাটতে যান। দুপুরের দিকে শুরু হয় বৃষ্টি ও বজ্রপাত। ধান কাটার কাজে থাকা অবস্থায় বজ্রাঘাতে তার মৃত্যু হয়।
এ বিষয়ে নবীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মোনায়েম মিয়া জানান, বজ্রপাতে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করেছে।
এছাড়া ময়মনসিংহে দুইজন ও কিশোরগঞ্জে বজ্রপাতে একজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওই দুই উপজেলায় এশিয়া পোস্টের সংবাদদাতা। তাৎক্ষনিক তাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
করিমগঞ্জে প্রাণ গেল কৃষকের
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে বড় হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রপাতে হলুদ মিয়া নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুরের দিকে এ ঘটনা ঘটে।
হলুদ মিয়া উপজেলার ৯নং জয়কা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের উত্তর কলাবাগ গ্রামের বাসিন্দা। তিনি নুরুল ইসলামের ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুপুরে বড় হাওরে ধান কাটার সময় হঠাৎ বজ্রপাত হলে ঘটনাস্থলেই গুরুতর আহত হন হলুদ মিয়া। পরে স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে গেলে তার মৃত্যু হয়।
করিমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এমরানুল কবির বলেন, বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ময়মনসিংহে কৃষকসহ দু্ই জনের মৃত্যু
ময়মনসিংহের দুই উপজেলায় বজ্রপাতে দুইজন নিহত হয়েছেন। শনিবার (১৮ এপ্রিল) দুপুর দুইটার দিকে গৌরীপুর ও গফরগাঁও উপজেলায় এ ঘটনা ঘটে।
মৃতরা হলেন, গৌরীপুর উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়নের কোনাপাড়া গ্রামর ওলি মিয়ার ছেলে রহমত আলী উজ্জ্বল এবং গফরগাঁও উপজেলার উস্থি ইউনিয়নের ধাইরগাঁও গ্রামের প্রয়াত সেকান্দর আলী খান মমতাজ আলী খান।
গৌরীপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কামরুল হাসান বলেন, রহমত আলী মুদি দোকানি। দুপুরে বোন জামাইয়ের ধান ক্ষেত দেখতে পূর্বাোনাপাড়া গ্রামে যান তিনি। সেখানে হঠাৎ বজ্রপাতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় উজ্জ্বল। স্থানীয়রা টের পেয়ে মরদেহ উদ্ধার করে বাড়িতে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে।
গফরগাঁও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান বলেন, মমতাজ আলী খান জোহরের নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিলেন। পথে হঠাৎ বজ্রপাতে গুরুতর আহত হন তিনি। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে স্থানীয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
তিনি বলেন, উস্থি ইউনিয়ন গফরগাঁওয়ের পাগলা থানার আওতাধীন। বজ্রপাতে মমতাজ আলী নিহতের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানায় জানানো হয়েছে।
গফরগাঁও থানার ওসি আমিনুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার পর পুলিশের একটি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় থানায় অপমৃত্যু মামলা প্রক্রিয়াধীন।